সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ব্যক্তিত্ব মুক্তিযোদ্ধা শাহাবউদ্দীন মজুমদার স্মরণে

তাসলিমা আকতার বাঁধন | শনিবার , ১৫ আগস্ট, ২০২৬ at ১০:৫৭ পূর্বাহ্ণ

বাবাকে নিয়ে কিছু লিখতে হলে কোথা থেকে শুরু করবো আর কোথায় গিয়ে শেষ হবে জানা নেই। আমার বাবা শাহাবউদ্দীন মজুমদার। জন্ম পঞ্চাশের দশকের ১৯৫৫ সালের ২৫ মার্চ। তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছেন১৯৭১ এ ১৬ বছর বয়সী এক তেজী তরুণ মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধের গল্প, ইতিহাস বাবার কাছেই প্রথম শুনেছি। এদেশের যে কোন দুঃসময়ে দেখেছি তাঁর সাহসিকতা ও আন্তরিকতার সাথে ঝাঁপিয়ে পড়ার মানসিকতা। বিনামূল্যে বই বিতরণ, লায়ন্সের সহায়তায় নিজ গ্রামে চোখের হাসপাতাল নির্মাণ, গ্রন্থাগার নির্মাণ, ঘূর্ণিঝড়, বন্যাদূর্গতদের পাশে দাঁড়ানো, গরীবদুঃখীদের শীতবস্ত্র বিতরণ, রক্তদান করা সন্ধানীর আজীবন সদস্য, করোনা মহামারীতে সহায়তা প্রদান, মে দিবসে শ্রমিকদের আস্থার কবি, চট্টগ্রামের মঞ্চ, বেতার, টেলিভিশনের বজ্রকণ্ঠ উপস্থাপক, মঞ্চনাটকের জনপ্রিয় অভিনেতা, ‘ইতিহাস কথা কয়’ সিরিজের লেখক ও আলোকচিত্র সংগ্রাহক সর্বোপরি ‘দেশ একটি সম্মিলিত উচ্চারণ’এর মহানায়ক সাহাবউদ্দীন মজুমদার আমার বাবার আসলে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেবার কিছু নেই, এত ব্যস্ততা, নানান চারিত্রিক গুণাবলীর মাঝেও তিনি পরিবার ও সন্তানদের মাঝে কাটাতেন গুণমান সময়, ছিলেন অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব।

সাধারণত আমাদের দেশে সব বাবা মার ই ইচ্ছে থাকে তাদের সন্তানদের ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার বানানোর কিন্তু আবার বাবার ইচ্ছে ছিল আমি শিল্পী হব। ছবি আঁকা, গান, আবৃত্তি, উপস্থাপনা সংস্কৃতির জগতে হাতেখড়ি করিয়ে দেয় আমার বাবা। পরিষ্কার মনে আছে আমি তখন ক্লাস টু তে পড়ি, বাড়িতে প্রথম ক্যাসেট প্লেয়ার কিনে আনে বাবা সেই সাথে ছিল তিনটি ক্যাসেট। এক. কোলকাতার শিল্পী অন্তরা চৌধুরীর ছোটদের গান, দুই. রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা আর সাদী মোহাম্মদের রবীন্দ্রসংগীতের ক্যাসেট আর ভূপেন হাজারিকার ‘মানুষ মানুষের জন্য’ একটা শিক্ষামূলক রুচিবোধের সাথে পরিচিত করে দিয়েছিল। এরপর যখন নিজে গান শিখছিলাম একপর্যায়ে বাবা বললেন, জীবন গড়ার লক্ষ্যে যে কোন একটা দিক বেছে নিতে, আমি তখন পড়া ফাঁকি দিয়ে, রাতের ঘুম নষ্ট করে প্রচুর ছবি আঁকতাম আর চারুকলা নিয়ে উচ্চতর ডিগ্রি করব বলে সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিই। যেইনা বলা তেমনি সঙ্গে সঙ্গে বাবা দেশের বাইরে ভারতের শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে খোঁজ খবর নেন এবং আমি প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে পরিবারের কারো কথায় কান না দিয়ে ২০০২ সালে বাবার একক সিদ্ধান্তে আমাকে শান্তিনিকেতনের কলাভবনে ভর্তি করিয়ে দিয়ে আসেন। অতঃপর চিত্রকলায় অনার্সমাস্টার্স সম্পন্ন করার ৭ বছর পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১০ সালে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করি। এর মাঝে ঢাকা ও চট্টগ্রামে আমার দুটি একক প্রদর্শনী ও বাবা নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সম্পন্ন করে। তাই আমি মনে করি, জন্মদান থেকে আজ ২০২৬ সালে চারুকলার পরিচালনার দায়িত্ব পালন পর্যন্ত সবটুকুই আমার বাবার অবদান এবং আজীবন আমি তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ। এরই মাঝে ২০২৪ সালের ১৫ আগষ্ট বাবাকে জীবন থেকে হারানো এক অবিশ্বাস্য অনুভূতি। এদেশবাসী এবং পরিবারবর্গ তোমাকে পেয়ে গর্বিত বাবা। এমন সৎ , সাহসী, প্রগতিশীল আর মমতাময় বাবা পাওয়া পরম সৌভাগ্য।

নয়নে তোমারে পায়না দেখিতে রয়েছ নয়নে নয়নে/ হৃদয় তোমারে পায়না জানিতে রয়েছ হৃদয়ে গোপনে”।

লেখক : মরহুমের বড় সন্তান; সহযোগী অধ্যাপক ও পরিচালক, চারুকলা ইনস্টিটিউট, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।

পূর্ববর্তী নিবন্ধআত্মার বন্ধনে সুদৃঢ় থাকুক আত্মীয়তার সম্পর্ক
পরবর্তী নিবন্ধঅসম্মানের সংস্কৃতি পরিহার করা প্রয়োজন