কলেজ জীবনে থাকতে আমার লেখা আজাদীতে প্রকাশিত হয়েছিল। সেটি এক রচনা প্রতিযোগিতায় প্রথম হওয়া আমার রচনা তৎকালীন আজাদী সম্পাদক শ্রদ্ধেয় খালেদ সাহেবের স্নেহ সিক্ত হয়ে। তবে আজাদীর বর্তমান সম্পাদক শ্রদ্ধেয় জনাব এম এ মালেকের আস্থাভাজন হয়ে ৩১ জানুয়ারী ২০২৩ দৈনিক আজাদী’তে প্রকাশিত ‘কঠিনেরে ভালবাসিলাম’ লেখার মাধ্যমে আজাদীর সাথে আমার লেখালেখির পথ চলা। দেখতে দেখতে এ চলা আজ শততম মাইল ফলকে। আজাদীর সাথে এ দীর্ঘ পথ পরিক্রমণের সময়ে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে অনেক চড়াই উৎরাই এর আমরা প্রত্যক্ষদর্শী। সেইসব অভিজ্ঞানের আলোকে আমি আমার মাঝে যে আলোড়ন অনুভব করেছি তা আমার পাঠকদের সামনে উপস্থাপনের প্রয়াস পেয়েছি। কালের যাত্রায় পিছনে ফেলে বা রেখে আসা সেই সব মুহূর্ত কখনো আমাকে রোমাঞ্চিত করেছে। এইসব সময় কখনো আমাকে বেদনায় নিমজ্জনের অতলান্তিকে ঠেলে দিয়েছে, আবার কখনো বিমূর্ত সময় আমাকে মহাজাগতিকতায় বিলীন করেছে। মানুষের অসহায়ত্ব, মানুষের প্রতি অন্য মানুষের অবহেলা তুচ্ছতাচ্ছিল্যও আমার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটিয়েছে এই পথ পরিক্রমণে। পৃথিবীর দেশে দেশে মানুষের জীবিকার পথ অবারিত হওয়ার চেয়েও অস্ত্রের বিস্তার ঘটেছে বিপুল এ বিষয়টি আমাকে ভাবিয়েছে অহর্নিশ, বিষণ্নতায় ডুবিয়েছে নিরন্তর। স্বদেশে আশান্বিত মানুষদের আশাহীন অনিশ্চয়তার পথ চলায় আমিও সঙ্গী হয়েছি।
দৈনিক আজাদীর প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা অশেষ–আমাকে এইসব অনুভূতি প্রকাশের একটি প্রান্তর অবারিত করে দেওয়ার জন্য বিশেষ করে আজাদী সম্পাদক জনাব এম এ মালেকের প্রতি।
আজ আমার ব্যক্তিজীবনের অনন্য এই অর্জন মুহূর্তে ঐ সব অভিজ্ঞান প্রসূত লেখালেখির কিছু খণ্ডচিত্রের কিছু কিছু পাঠকদের জন্য এখানে তুলে ধরছি।
‘কঠিনেরে ভালবাসিলাম’ থেকে ‘এ উপমহাদেশের কিংবদন্তী পুরুষ এ পি জে আবদুল কালাম ভারতের রাষ্ট্রপতি হয়ে যখন নয়াদিল্লীর রাষ্ট্রপতি ভবনে প্রবেশ করছিলেন তখন তার সাথে ছিল একটি ভরা স্যুইটকেইস। পাঁচবছরের রাষ্ট্রপতির জীবন শেষান্তে যখন বেরিয়ে যাচ্ছিলেন তখন স্যুইটকেস খালি। সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে তার উত্তর ছিল ‘আসার সময় স্যুইটকেস ভরে যেসব কাপড় চোপর নিয়ে এসেছিলাম তা পুরান হয়ে যাওয়াতে মানুষজনদের দিয়ে দিয়েছি। এখন নেবার মত তেমন কিছু নাই তাই স্যুইটকেসটি খালী নিয়ে যাচ্ছি। এ পি জে আবদুল কালাম সেদিন খালী স্যুইটকেস নিয়ে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে বেরিয়ে গেলেও শতকোটি ভারত বাসীর ভালবাসায় শ্রদ্ধায় আপ্লুত হয়েছিলেন’।
‘নতুন আওয়ামী লীগ সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জসমূহ’ থেকে ‘ব্যাংক খাতের দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং লাগামহীনতা আওয়ামী লীগের সেইসব অর্জনকে ম্লান করেছে। ব্যাংক খাতের অপছায়ার করালগ্রাস শিল্প কারখানায় ব্যাপক বিরূপ প্রভাব ফেলে। এ দুষ্টুচক্র আওয়ামী লীগের আর্থিক ব্যবস্থাপনার সক্ষমতাকে যেমন প্রশ্নবিদ্ধ করেছে তেমনিভাবে তা আওয়ামী লীগকে ব্যাপকভাবে সমালোচনার মুখামুখিও দাঁড় করিয়েছে’।
‘রাজনীতির তামাশার গল্প’ থেকে ‘রিডার ডাইজেস্টের জোকসটা দিয়ে লেখাটা শেষ করি:
As a Russian citizen, I am confused about why it takes American so long to get a definitive result from their election – we know our results months in advance!
‘রাশিয়ান হিসাবে আমি বুঝে উঠতে পারছি না
আমেরিকানরা তাদের দেশের ভোটের ফলাফল জানতে এত সময় নেয় কেন
আমরা ত আমাদের দেশের ভোটের ফলাফল কয়েক মাস আগেই জেনে যাই’।
‘ধর্ম– ভারতীয় রাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপট’ থেকে ‘২২ জানুয়ারী ২০২৪ অযোধ্যায় বাবরী মসজিদের ভগ্ন স্ত্তূপের উপর র্নিমিত রাম মন্দির উদ্বোধন করতে গিয়ে শ্রী নরেন্দ্র মোদি ভগবান রামের কাছে করজোড়ে ক্ষমা চাইলেন প্রায় ৫০০ বছর তাকে আশ্রয় দানে অপারগতার জন্য। ভগবান বা স্রষ্টা কি এতই দুর্বল যে মানুষকে তাকে আশ্রয় দিতে হবে। স্্রষ্টা কখনো আশ্রয়হীন হতে পারে না। সব মানুষের মাঝেই ত স্্রষ্টার বাস। যে মানুষের মাঝে স্রষ্টার বাস সেই মানুষেরা বাবরী মসজিদ – রাম মন্দির দাঙ্গায় নিহত হন হাজারে হাজারে সেই মানুষদের পরিবারের কাছে এদিন নরেন্দ্র মোদি একবারও ক্ষমা চান নি’।
‘আমাদের শিক্ষার্থী এবং শিক্ষাঙ্গন’ থেকে ‘আমাদের রাজনীতির অপ–সংস্কৃতির ছায়া, শিক্ষা ব্যবস্থার সৃষ্টি বিমুখতা, শিক্ষকদের অধিকাংশেরই প্রজ্ঞাহীনতা আমাদের শিক্ষাঙ্গন এবং শিক্ষার্থীদের অরাজকতা আর হানাহানির পথে ঠেলে দিচ্ছে। শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাসী সৃষ্টিতে রাজনীতির অপ–সংস্কৃতির ছায়া যেভাবে পড়ছে, রাজনীতিতে আমাদের যে চলমান অবস্থা তাতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মেধার চেয়ে পেশী শক্তিই প্রাধান্য বিস্তার করে চলেছে’।
‘ফিলিস্তিনে গণহত্যা– বুশনেলের আত্মাহুতি’ থেকে ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’, ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’, বেশ কয়েকবার শ্লোগানে শ্লোগানে, আগুনের জ্বলন্ত শিখার মাঝে লুটিয়ে পড়েন বুশনেল। এর আট ঘণ্টা পর বুশনেল বিদায় নেন এই নশ্বর পৃথিবী থেকে। আত্মাহুতি পুর্ব উইলে বুশনেল তার সম্পদের উত্তরাধিকারী করে গেছেন ফিলিস্তিনের অসহায় শিশুদের’।
‘অপার বিস্ময়ের নাম শেখ মুজিবর রহমান’ থেকে ‘হাজার বছরের রাষ্ট্র কাঠমোর অভিধাবিহীন শতধা বিভক্ত বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে, তাকে আপোষহীন পথ চলতে, উজ্জীবিত করতে চারন কবির মত শেখ মুজিব তার ঐক্যের একতারা হাতে ঘুরে বেরিয়েছেন শ্যামল বাংলার পথে প্রান্তরে’।
‘স্বাধীনতা সুরক্ষায় আগামীর ভাবনা’ থেকে অভ্যন্তরীণ বিষয়ের মাঝে বিপুল সংখ্যক কর্মসংস্থান,সৃষ্টিশীল জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটানো এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠি গুলির মাঝে ইনক্লুসিভনেস বা বাংলাদেশের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন বা উন্নয়ন বঞ্চিত এমন মনোভাব সৃষ্টির যেন অবকাশ সৃষ্টি না হয়’।
‘আমেরিকা পাশ্চাত্যকে তৃতীয় বিশ্ব–যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে’ থেকে মানুষের তৈরী সুরের অনুসঙ্গ কে সঙ্গী করে মানুষ যুগে যুগে সৃষ্টি করেছে এক মোহন সুরের জগৎ। মানুষের তোলা সুর এই যেমন ইকুয়েডরিয়ান লিও রোজার বাঁশের বাঁশির সুর কনডর পর্বতমালার স্বর্গীয় ঈগলদের পাখায় পাখায় কি বিষাদ যে ছড়ায় তা ঐ সুরে যারা মগ্ন হয়েছেন তারা জানেন। ইয়ান্নির তোলা সুরে অজস্র মানুষ বিমুগ্ধ থেকেছে বহুদিন থেকে। আমাদের এ উপ–মহাদেশের রবি শংকরের সেতার ইয়াহুদি মেনহুইনের সাথে যুগল বন্দী হয়ে মানুষকে ভাসিয়েছে আনন্দ বেদনার বন্যায়। ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খানের সানাইয়ের সুর মানুষকে বিমুগ্ধ বেদনায় আচ্ছন্ন করেছে। লালন – শাহ আবদুল করিম কি এক মরমীয়া বিচ্ছেদ বেদনায় ডুবে মানুষকে নিয়ে যান অদেখা এক ভুবনে। এই মানুষই আবার সৃষ্টি করেছে পারমানবিক অস্ত্র, হাইপারসনিক মিসাইল, সাবমেরিন, জঙ্গী বিমান। এসবই মানুষ মারার জন্য’।
‘ইরান ইসরাইল পরিস্থিতি, অস্থিরতা আর উৎকণ্ঠায় বিশ্ব’ থেকে ‘পাশ্চাত্যের স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী সবসময় ইরানী জু জু’র ভয় দাঁড় করিয়েছে এর মাঝে একটি হল ইরান প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হলে তাদের ক্ষমতা বির্পযস্ত হবে, দ্বিতীয়টি হল শিয়া– সুন্নী বিষয়টিকে সামনে এনে পশ্চিমারা ইসলামী বিশ্বকে সবসময বিভক্ত করার পাঁয়তারা করে এসেছে। একই কায়দায় তারা অটোম্যানদের বিরুদ্ধে একসময় আরবদের ক্ষেপিয়ে তুলেছিল, যার ফলাফল বালফোর ডিকা্লরেশন এবং পরবর্তীর ইসরাইলের সৃষ্টি’।
‘চলুন আয়নায় নিজেকে দেখি’ থেকে ১৯৪৮ সালের দরিদ্র এক সিঙ্গাপুর কি যাদু বলে দ্রুত এবং অভাবনীয়ভাবে তৃতীয় বিশ্ব থেকে উন্নত বিশ্বে উন্নীত হয়, এটি বর্ণনা করতে গিয়ে মাহবুবানি তিনটি ইংরেজী অক্ষর উল্লেখ করেন, এম+এইচ+পি। এম দিয়ে তিনি বুঝিয়েছেন ‘মেরিটোক্রেসি’ অর্থাৎ মেধা। এইচ– অনেস্টি বা সততা..! পি। প্রাগমাটিজম। এটি ইংরেজী শব্দ। মাহবুবানির বক্তব্য অনুযায়ী প্রাগমাটিজম শব্দটিকে সবচেয়ে ভাল ব্যাখ্যা এবং প্রয়োগিক দিক দারুণভাবে তুলে ধরেছেন চীনা নেতা দেং জিয়াও পিং। দেং এর কথা হল, ‘বিড়াল কাল কি সাদা তা নিয়ে ব্যস্ত না হয়ে দেখতে হবে বিড়ালটি ঠিক মত ইঁদুর ধরছে কিনা’।
হামাস’ এর উত্থান তার সামরিক শক্তি থেকে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি তরুণ যারা স্বাধীনভাবে বাঁচার জন্য জীবন মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্য করেছে সেই তরুণদের কথা ভেবে বেদনায় অন্তর ভরে উঠছে। সেইসব দুঃখিনী ফিলিস্তিনী মায়েদের কথা ভাবতেও কেমন জানি অনুভূতির সব শিরদাড়া খাড়া হয়ে যায়, যারা কষ্ট করে সন্তান ধারণ এবং জন্ম দেন আবার যুদ্ধের মাঠ থেকে লাশ হয়ে আসা সেই সন্তানকে তাদের কবরও দিতে হচ্ছে এখন।
দুর্নীতির আত্মনুসন্ধান থেকে ‘একবারও কি আমাদের সমাজ কোন দুর্নীতিবাজকে বয়কট করে জানান দিয়েছে এই সমাজে দুর্নীতির স্থান নাই। অবৈধ অঢেল সম্পতির কোন মালিককে সমাজ কখনো কি প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে, বরং ফুলের মালায় তাকে নেতৃত্বের আসনে বসিয়ে দিয়েছে। এই সমাজ দুর্বৃত্তকে শুধু লালনই করছে না বরং এই সমাজ এ যাবত সৎ মানুষদের জীবনকে অসহনীয় এক আবর্তে ঠেলে দিয়ে এসেছে’।
শততম এই লেখায় শুরুর দিকের লেখাগুলি থেকে উদ্বৃতি তুলে ধরলাম এই প্রতীতে সাম্প্রতিকের লেখাগুলি পাঠকের স্মৃতিপট থেকে হয়ত এখনো হারিয়ে যায়নি। শততম এ লেখার সাথে একটিই প্রার্থনা আমার শুরুর লেখায় রবীন্দ্রনাথ থেকে উদ্ধৃত করে যে প্রতীতি ব্যক্ত করেছিলাম–
‘সত্য যে কঠিন
কঠিনেরে ভালোবাসিলাম
সে কখনো করে না বঞ্চনা’
পরম স্রষ্টা যেন এ থেকে আমাকে কখনো বিচ্যুত না করেন। প্রিয় পাঠকদের কাছে নিবেদন রবার্ট ফ্রস্টের ‘স্টপিং বাই উডস অন এ স্নোয়ি ইভিনিং’ এর অমর উচ্চারণ ‘এ মাইলস টু গো বিফোর আই স্লিপ’ এ বাক্যের কবি শামসুর রাহমানের অনুবাদে ‘অযোজন পথ বাকী, অযোজন পথ বাকি ঘুমাবার আগে’ আমারও যেন আরাধ্য হয়।
লেখক: প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক, কলামিস্ট; সামরিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক।












