৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ আমেরিকান সৈন্যরা ইরাক ত্যাগ করে। এর পিছনে বিশ্বের তাবৎ ভূ–কৌশলবিদরা কারণ খুঁজে পেতে হন্যে হন। এরপর কারণ হিসাবে যা সামনে আসে তা হলো, ইরান যুদ্ধে ইরানি আক্রমণে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে আমেরিকান ঘাঁটিসমূহ ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়া। দ্বিতীয়ত আমেরিকা পুনরায় ইরানের সাথে সংঘাতে জড়ালে ইরাকের আমেরিকান সৈন্যবাহিনী ইরানের আশু লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা। উল্লেখ্য সৌদি আরবের ইস্ট–ওয়েস্ট তেলবাহী পাইপ লাইনকে ইরানি প্রক্সিরা ইরাক থেকেই লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছিল। এসব কিছু বিবেচনায় নিয়েই হয়তো আমেরিকানরা ইরাক থেকে তাদের দীর্ঘ দখলদারিত্বের অবসান ঘটায়।
এরপর আসে ইরান যুদ্ধের বিরুদ্ধে আমেরিকান সাধারণ মানুষের বিপুল সংখ্যকের অবস্থান। দি পিউ রিসার্চ সেন্টারের পরিচালিত জরিপ অনুযায়ী ৭০% (সত্তর শতাংশ) আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধের বিরুদ্ধে তাদের মত প্রকাশ করেছেন। সাধারণ আমেরিকানদের অভিমত ইসরাইলি প্ররোচনায় এই যুদ্ধে জড়িয়ে ইসরাইলের যুদ্ধ আমেরিকা করে যাচ্ছে।বিশ্ব–জনমতও ইতিমধ্যে ইরান যুদ্ধকে ঘিরে আমেরিকার বিরুদ্ধে। এরই মাঝে বিশ্বের সচেতন মানুষ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভাষণে ইরানের বিরুদ্ধে বিষোদগার এবং ইরানকে পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করার হুমকিকে, জাতিসংঘে দেওয়া ইতিহাসে নিকৃষ্টতম ভাষণ হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন।
উল্লেখ্য ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ আমেরিকা–ইসরাইল যৌথভাবে ইরান আক্রমণ করে। এ আক্রমণের পূর্বে আমেরিকা–ইসরাইলের ধারণা ছিল যুদ্ধের শুরুতেই ইরান কাবু হবে, বিপুল সংখ্যক ইরানি সাধারণ জনগণ তাদের সরকারের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামবে। ইরানের সবকিছু ওলটপালট হবে, সরকার পরিবর্তন হবে। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল–আমেরিকার স্বার্থের বিরুদ্ধে কথা বলার আর কেউ থাকবে না। আখেরে ইরানি প্রতিরোধ এবং প্রতি–আক্রমণে আমেরিকা–ইসরাইলের সে আশায় গুড়েবালি পড়ার মতো অবস্থা হয়। সব কিছু লেজেগোবরে করে আমেরিকা ইরানের সাথে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ১৭ জুন ২০২৬ এক যুদ্ধবিরতি সম্মত স্মারকে (এমওইউ) স্বাক্ষর করে। সেই সম্মতি স্মারকের পরিণতি আলোচনার আগে সম্মত সেই সিদ্ধান্তে যা ছিল তার সারাংশ পাঠকের অবগতির জন্য তুলে ধরছি।
১. আমেরিকা এবং তার মিত্ররা ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সাথে এই মর্মে যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে স্বাক্ষর করছে যে তারা লেবানন সহ সকল ক্ষেত্রে অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ করবে, ভবিষ্যতে যুদ্ধে জড়ানোর মতো কোনো কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবে না। পরস্পরের প্রতি কোনো প্রকার হুমকি সৃষ্টি করা হবে না। লেবাননের অখণ্ডতা এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হবে। ২. আমেরিকা এবং ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরান পরস্পরের অখণ্ডতা, সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং পরস্পরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকবে। ৩. আমেরিকা এবং ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরান ৬০ দিনের মধ্যে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে একটি স্থায়ী সমাধানে পৌঁছাতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। এর ব্যত্যয় ঘটলে আলোচনার মাধ্যমে পারস্পরিক সম্মতিতে এই সময় বৃদ্ধি করা হবে। ৪. আমেরিকা এই চুক্তি স্বাক্ষরের ৩০ দিনের মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ সম্পূর্ণভাবে তুলে নেবে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল যুদ্ধ শুরুর পূর্বাবস্থায় ফিরে যাবে। চূড়ান্ত যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষর হওয়ার পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে আমেরিকান সৈন্যবাহিনী ইরান থেকে দূরবর্তী স্থানে সরে যাবে। ৫. ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরান এই সমঝোতা স্বাক্ষরের ৩০ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদে বাণিজ্য জাহাজসমূহ কোনো প্রকার শুল্ক ছাড়া চলাচলের নিশ্চিত ব্যবস্থা করবে, শুল্ক ছাড়ের বিষয়টি ৬০ দিনের জন্য প্রযোজ্য। এ ব্যবস্থা পারস্য উপসাগর হয়ে ওমান উপসাগর এবং ফিরতি পথের জন্য নিশ্চিত করতে হবে। ইরান হরমুজ প্রণালিতে বিদ্যমান সকল সামরিক প্রতিবন্ধকতাসমূহ দূরীকরণের কাজ এই চুক্তি স্বাক্ষরের ৩০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করবে। ইরান সুলতানাত অব ওমান সহ ঐ অঞ্চলের দেশসমূহের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে হরমুজ প্রণালির সার্বভৌমত্ব এবং ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। ৬. আমেরিকা তার আঞ্চলিক মিত্রদের সহায়তায় ইরানের অর্থনীতি এবং ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠনে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের যোগান দেবে। চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের ৬০ দিনের মধ্যে আমেরিকা এ ক্ষেত্রে সকল প্রকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। ৭. আমেরিকা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ, আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি কমিশন সহ অন্যান্য যেকোনো পক্ষের ইরানের উপর আরোপিত সকল ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ব্যবস্থা করবে। ৮. ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান নিশ্চয়তা প্রদান করছে যে সে কখনো পারমাণবিক বোমা সংগ্রহ বা তৈরি করবে না। আমেরিকা এবং ইরান এই মর্মে সম্মত যে ইরানের কাছে মজুদ আণবিক বোমা তৈরির মতো সমৃদ্ধ পারমাণবিক জ্বালানিসমূহের ব্যাপারে আলোচনা সাপেক্ষে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। ইরানের পারমাণবিক জ্বালানি উৎপাদনের প্রয়োজনীয় পারমাণবিক বিষয়গুলির উপর আলোচনা সাপেক্ষে ত্বরিৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। ৯. আমেরিকা এবং ইরান বর্তমান বিদ্যমান অবস্থান বজায় রাখবে। ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি যে অবস্থায় আছে সে অবস্থান বজায় রাখবে, আমেরিকা এতদঞ্চলে নতুন কোনো সৈন্য সমাবেশ ঘটাবে না। ১০.আমেরিকান অর্থ মন্ত্রণালয় এ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর অবিলম্বে ইরানি অপরিশোধিত জ্বালানি, পেট্রোলিয়াম জাত দ্রব্যাদি রপ্তানির উপর ব্যাংকিং ব্যবস্থা সহ বিদ্যমান সকল প্রতিবন্ধকতা প্রত্যাহার করবে। ১১. আমেরিকা ইরানের অবরুদ্ধ সম্পদ সম্পূর্ণ অবমুক্ত করে দেবে যেন ইরান তা ব্যবহার করতে পারে। ১২. আমেরিকা এবং ইরান সমঝোতা স্মারকের সফল বাস্তবায়ন এবং চুক্তির চূড়ান্ত রূপদান পর্যবেক্ষণে একটি কার্যকরী কমিটি গঠনেও সম্মত হয়। ১৩. সমঝোতা স্মারক এর ১, ৪, ৫, ১০ এবং ১১ ধারার কার্য সম্পন্ন হওয়ার পর আমেরিকা এবং ইরান একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে কাজ করবে। ১৪. চূড়ান্ত চুক্তি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক অনুমোদিত এবং স্বীকৃত হবে।
আমেরিকা ইরানের মধ্যে সম্পাদিত উপরে বর্ণিত সমঝোতা স্মারক ৬০ দিন অতিক্রান্তের পর আমেরিকা একপাক্ষিকভাবে এ চুক্তি আর নবায়ন করেনি এবং চুক্তি থেকে সরে যায়।
এই সমঝোতা চুক্তির নবায়ন না হওয়া বা ব্যর্থতার পিছনে ইসরাইল মূল ভূমিকা পালন করেছে বলে প্রতীয়মান। কারণ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হওয়ার পর থেকে ইসরাইল একদিনের জন্যও লেবাননে তাদের হামলা বন্ধ রাখেনি এবং আমেরিকাও ইসরাইলকে তা করতে বাধ্য করেনি অথচ চুক্তির একেবারে শুরুতেই ১ নাম্বার ধারাতেই লেবানন সহ সকল ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধের স্পষ্ট ঘোষণা বিদ্যমান। এর বাইরে চুক্তিটি স্বাক্ষর হওয়ার পর থেকে বিশ্বব্যাপী আলোচকরা আমেরিকা ইরানকে এই চুক্তিতে অতিরিক্ত ছাড় দিয়েছে এরকম একটি আবহের জন্ম দেয়, এ থেকে হয়তো ট্রাম্প প্রশাসনের উপর এ চুক্তি একধরনের হেরে যাওয়া মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করে, পরিণামে সুযোগ বুঝে ট্রাম্প প্রশাসন এ চুক্তি থেকে বেরিয়ে যায়। এ ছাড়াও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ব্যাপারে অনড় অবস্থান, হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজসমূহকে ইরানের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে নিয়ে নির্দিষ্ট অর্থ আদায় সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো রকম সুরাহা করতে ব্যর্থতা, ইরানের দূরপাল্লার মিসাইল কর্মসূচির ব্যাপারে কোনো ধরনের সমঝোতায় পৌঁছতে না পারা এবং ইরানের প্রক্সিদের ব্যাপারে ইরান–আমেরিকার ভিন্ন অবস্থান এ চুক্তির সফলতাকে অনিশ্চিত করে তোলে।
সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর এবং ৬০ দিন অতিক্রান্তের পর সেখান থেকে আমেরিকার সরে যাওয়া বা সমঝোতা অনুযায়ী আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সামনে আসা সমস্যাসমূহের সুরাহা প্রচেষ্টা গ্রহণ করা যেত। সেটা হয়নি। এ প্রসঙ্গে আমার কাছে আমেরিকান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জন জে. মিয়ারশাইমার এর ‘দি ট্র্যাজেডি অব গ্রেট পাওয়ার পলিটিক্স’ বই এর শুরুতে তিনি যা উল্লেখ করেছেন তা এখানে প্রণিধানযোগ্য বলে প্রতীয়মান, তিনি উল্লেখ করেছেন “Great power are always searching for opportunities to gain power over their rivals ” অর্থাৎ পরাশক্তিসমূহ সব সময় তাদের প্রতিপক্ষের উপর প্রভাব বিস্তারের সুযোগের সন্ধানে থাকে। আমেরিকাও হয়তো এখন ইরানকে ঘিরে এমন এক সুযোগের সন্ধানে।
তবে এ সুযোগের সন্ধানে থাকতে গিয়ে ভূ–রাজনীতি বিষয়ক অন্যতম বিশেষজ্ঞ এবং বিশ্লেষক সিঙ্গাপুরের কিশোর মাহবুবানী, যার বিখ্যাত বই ‘হ্যাজ চায়না ওয়ান’ বলেছেন, ইউক্রেন যুদ্ধে জড়িয়ে ইউরোপ নিঃসন্দেহে দুর্বল হয়েছে, একইভাবে ইরান যুদ্ধে জড়িয়ে আমেরিকাও নিঃসন্দেহে দুর্বল হয়েছে। এ প্রসঙ্গে কিশোর মাহবুবানী আরো উল্লেখ করেন মধ্যপ্রাচ্য এবং দুনিয়ার অন্যান্য যেকোনো প্রান্তে যেখানেই আমেরিকা যুদ্ধে জড়িয়েছে তা চীনের জন্য এক একটি উপহার হিসাবে বিবেচিত হবে।
লেখক: প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব,
সামরিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক।












