সবই দেখি তা-না-না-না

(দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব)

সালমা বিনতে শফিক | সোমবার , ২৯ মে, ২০২৩ at ৫:১৪ পূর্বাহ্ণ

আজকাল যেকোন ধরনের সামজিক অবক্ষয় অধঃপতনের জন্য আমরা কথায় কথায় পশ্চিমা সংস্কৃতির আগ্রাসনকে দায়ী করি। কিন্তু আমরা কী জানি পশ্চিমা সংস্কৃতি আসলে কেমন? হলিউডের চল”িচত্রের ওপর ভর করে আমরা পশ্চিমা সংস্কৃতি বিনির্মাণ করি নিজেদের কল্পনায় এবং সেটাকেই আধুনিকতার মাপকাঠি বলে ধরে নেই। তবে হলিউডের চলচ্চিত্র মানেই অশোভন বেপরোয়া কিছু নয়। ভাল মানের চলচ্চিত্র, খ্যাতি ও পুরস্কার জোটে যাদের ঝুলিতে সেগুলোতে প্রকৃতই মূল্যবোধ, স্মৃতিকাতরতা ও ভালোবাসার গল্প থাকে। আমাদের একালের মূলধারার চলচ্চিত্রের তুলনায় অনেক বেশী মাত্রায় শালীন ও শোভন হলিউডের ধ্রুপদী ছায়াছবি। সেই গল্প, নির্মাণশৈলী থেকে আমরা কিন্তু কিছু গ্রহণ করিনা, অনুসরণ করিনা। আমাদের যত আগ্রহ ওদের সাজসজ্জায়। চলচ্চিত্রের পাত্র পাত্রীদের পোশাক, চুলের ছাঁট, সাজসজ্জা নকল করে জাতে উঠে যাই আমরা! কিন্তু পশ্চিমের সাধারণ মানুষজনের নৈতিকতা, সত্যবাদিতা, সহমর্মিতা, মিতব্যয়িতা, সময়ানুবর্তিতা এবং প্রকৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে একাত্মতার কথা আমাদের অনেকেরই জানা হয়না। পশ্চিমে একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সঙ্গে একজন কৃষকের কিংবা দোকানির বন্ধুত্ব হতে পারে। একজন চিকিৎসক, বিজ্ঞানী কিংবা শিক্ষক, বাসচালক, কাঠের কারিগর অথবা শিশু/বৃদ্ধদের পরিচর্যাকারীর সঙ্গে ঘর বেঁধে জীবন কাটিয়ে দিতে পারে। পরিচ্ছন্নতা কর্মী, চুল পরিচর্যাকারী দোকানের কর্মী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য একই পাড়ায় বসবাস করতে পারে, একই দোকানে বাজার করতে পারে, পথে বা বাজারে দেখা হয়ে গেলে হাত মিলিয়ে গল্প জুড়ে দিতে পারে, একসঙ্গে বসে চা খেতে পারে, একই বিদ্যালয়ে তাদের সন্তানেরা পড়তে যেতে পারে। যদিও পশ্চিমের কৃষক, বাসচালক, দোকানি কিংবা পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের শরীর স্বাস্থ্য ও জীবন এবং ঘরবাড়ী আমাদের মতো নড়বড়ে নয়, সামাজিক অর্থনৈতিক একটা প্রভেদতো থাকেই। পশ্চিমা সংস্কৃতির এই মানবিক শিক্ষাগুলো কী আমরা গ্রহণ করতে পারব, না কোনদিন গ্রহণ করতে চাইব? পশ্চিমের পথেঘাটে, গাড়ীতে বন্দরে নাগরিকরা যে কত সাধারণ পোশাকে চলাফেরা করে তা দেখলে আমাদের আধুনিকতার পাঠ নেওয়া নাগরিকরা উচ্চমূল্যের পরিধেয় নিয়ে বোধ করি ভয়ানক বিপদেই পড়ে যাবেন।

পশ্চিম থেকে এবার চোখ ফেরানো যাক প্রাচ্যে। সমাজে উগ্রপন্থা বিস্তারের জন্য আমরা অনেকেই ধর্মকে দায়ী করি। তবে আক্রমণটা সরাসরি আসে ইসলামের ওপর। কিন্তু প্রকৃত ইসলাম কী, ইসলামী সংস্কৃতিই বা কেমন সেবিষয়ে আমরা কিছুই জানিনা, জানার বিন্দুমাত্র আগ্রহও নেই আমাদের। ধর্মীয় মৌলবাদ কিংবা উগ্রপন্থা প্রচারকারীগণই বা কতটুকই জানেন ইসলামকে? নিজেদের জীবন জীবিকার প্রয়োজনে ইসলামের কিছু মহান বাণী খণ্ডিত আকারে উপস্থাপন করেন তাঁরা হতদরিদ্র গণমানুষের কাছে। অসহায় জনগোষ্ঠী দারিদ্রের মহাসমুদ্র হাতড়ে হাতড়ে কুল কিনারা না পেয়ে মহাসাধকের পায়েই আশ্রয় খুঁজে পায়। ইহকালে সুখের দেখাতো মিলবেনা, পরকালটা অন্তত ঝরঝরে করে নেয় তারা তথাকথিত আধ্যাত্মিক নেতার কৃপায়। অভিজাত পরিবারের উচ্চশিক্ষিত সন্তানরা কেমন করে মৃত্যু পরবর্তী জীবনে সোনাদানায় মোড়ানো সাম্রাজ্যের ফাঁদে পা দিয়ে ফেলে, তা অবশ্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। তবে এসবের কোন কিছুতেই ইসলাম নেই। ইসলাম প্রকৃতপক্ষে নৈতিকতা, সত্যবাদিতা, সহমর্মিতা ও মিতব্যয়িতার কথা বলে যেটা পশ্চিমের সমাজ সংস্কৃতিতে সততই দৃশ্যমান। আমাদের সুশীল সমাজের বড় একটা অংশ ধর্ম, বিশেষ করে ইসলাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সমতার সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখান আমাদেরকে। তাঁরা জানলেও মানতে চাননা যে ইসলাম প্রকৃতপক্ষে সমতার কথাই বলে। কোন ইসলামী বক্তার ভাষণ বক্তৃতা মনপুত না হলে কোন জ্ঞানী ব্যক্তি যদি ইসলাম পরিত্যাগ করার শপথ নিয়ে ফেলেন, তাহলে তাঁকে জ্ঞান দিতে যায় কার সাধ্য! ইসলামের মূলকথা, দর্শন, জ্ঞানবিজ্ঞানের ইতিহাস আমাদের দেশে ওয়াজ মাহফিল করে জীবিকা নির্বাহ করা বক্তাদের ক’জনই বা ভাল করে জানেন! যারা জানেন, প্রকৃত ইসলামী চিন্তাবিদ, তাঁরা বর্তমান আধুনিক সমাজে অপাংক্তেয় হওয়ার ভয়ে নীরব থাকাটাকেই নিরাপদ মনে করেন।

আর হ্যাঁ, ইসলামের ধারক ও বাহক বলতে আমরা যদি বর্তমান আরব দুনিয়াকে নির্দেশ করি, তাহলে প্রকৃতই আমরা বোকার স্বর্গে বাস করছি। ইসলামের আঁতুড়ঘর নবীর দেশের রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থায়, সমাজ ও সংস্কৃতিতে ইসলামের লেশমাত্রও নেই আজ। মক্কা মদিনার ঐতিহাসিক অবস্থান আর ভূগর্ভস্থ তেলের ওপর ভর করে সৌদি রাজপরিবার ও ধনকুবেররা যে বিলাস ব্যসন করে তা ইসলাম কখনই সমর্থন করেনা। কোটি কোটি জনতাকে ভাতে মেরে, হাতে মেরে জোব্বা পাগড়ির আড়ালে তারা পশ্চিমের যুদ্ধবাজ ঔপনিবেশিক শক্তির সঙ্গে হাত মেলায়কারও অজানা নয় সেসব কাহিনী। বড়ই পরিতাপের বিষয়, অটোম্যান সাম্রাজ্যের মহাপরাক্রমশালী শাসক সুলতান সোলেমানকে নিয়ে নির্মিত মেগা ধারাবাহিক থেকেও আমাদের অনেকে ইসলামকে বোঝার প্রয়াস নেন, যদিও আরব বাদশাহদের মতো অটোম্যান সুলতানরাও ইসলামকে কেবলই পোশাকী আবহে বেঁধে ফেলেছিলেন, এবং পোশাকের আড়ালে ক্রমাগত অনিসলামী কর্মকাণ্ড ও জীবন যাপন করে গিয়েছিলেন মহা প্রতাপের সঙ্গে।

ইউরোপের রেনেসাঁ পড়তে গিয়ে চোখে পড়ল, অসামপ্রদায়িকতার অর্থ ধর্মকে বাতিলের খাতায় ফেলা দেওয়া নয়। একইভাবে বলা যায়, ধর্মনিরপেক্ষতা ধর্মহীনতাও নয়। ধর্ম যে সংস্কৃতিরই একটা বিশেষ উপাদান সেকথা আমাদের ভুলে গেলে চলবেনা। ধর্ম জীবনে শৃঙ্খলা আনে, তবে জীবনকে শৃঙ্খলিত করেনা। শুধু ইসলাম নয়, কোন ধর্মই বিভেদের কথা বলেনা। বিভেদ বিভাজন সবই আমাদের মানুষদের তৈরি। আমরা নিজেদের প্রয়োজনে নিজেদের সুবিধামতো নিয়ম করি, নিয়ম ভাঙি; যখন খুশি। পৃথিবীর মঙ্গল, সমাজের কল্যাণ, পরবর্তী প্রজন্মের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা আমাদের ভাবনায় থাকেনা বলে আমরা আমাদের মতো করে ধর্মীয় বিধিনিষেধ দাঁড় করাই এবং আমার মতো না হলেই তাকে বা তাদেরকে বিদ্রুপ করি, সম্ভব হলে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চাই। আমাদের সবার মাঝেই জাত্যাভিমান প্রবল। ভিন্ন জাতের, ভিন্ন মতের কাউকে এগিয়ে আসতে দেখলে গেল গেল, সব রসাতলে গেল বলে রব উঠে চতুর্দিক হতে।

সংস্কৃতি যেকোন জাতির কাছে মহা মূল্যবান সম্পদ, সন্দেহ নেই। কারণ সংস্কৃতি তার পরিচয়। তবে কোন কিছুই জীবনের চেয়ে বেশী মূল্যবান নয়। কবিগুরু বলেছিলেন– “নীতির চেয়ে সত্য বড়, রীতির চেয়ে জীবন”। নজরুল তো জাতের নামে বজ্জাতি করাদের ধুয়ে দিয়েছেন তাঁর স্বভাবসুলভ বেপরোয়া ভঙ্গিতে– “জাতের নামে বজ্জাতি সব জাতজালিয়াত খেলছে জুয়া। ছুঁলেই তোর জাত যাবে? জাত ছেলের হাতের নয়তো মোয়া”। তবে আজ লালনের সেই কথাগুলো বড় বেশী মনে পড়ছে

সত্য কাজে কেউ নয় রাজি,

সবই দেখি তানানানা

জাত গেল জাত গেল বলে

কী আজব কারখানা!