সকল প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য আস্থা তৈরি করুন

| রবিবার , ২৫ অক্টোবর, ২০২৬ at ৮:০৪ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশের অর্থনীতি ধীরগতির প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে মন্দা ও ব্যাংকিং খাতের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এ পরিস্থিতিকে ‘অর্থনৈতিক জরুরি অবস্থা’ হিসাবে উল্লেখ করে সংকটের ভয়াবহতা স্বীকার করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন পানাম ইনস্টিটিউটের অর্থনীতিবিদ জ্যোতি রহমান। মঙ্গলবার সাপ্তাহিক কাউন্টারপয়েন্ট–এ প্রকাশিত ‘এ স্টেট অব ইকোনমিক ইমার্জেন্সি’ শীর্ষক নিবন্ধে তিনি এ সতর্কবার্তা দেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় ধরে দুর্বল বিনিয়োগ, স্থবির প্রবৃদ্ধি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতিতে আটকে পড়তে পারে। প্রকাশিত নিবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলো ধারাবাহিকভাবে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমাচ্ছে। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ দশমিক ২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। একইভাবে ২০২৮ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ দশমিক ২ শতাংশ করা হয়েছে। সংস্থাটির ধারণা, আগামী দশকেও বাংলাদেশের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশের নিচে থাকতে পারে। বিশ্বব্যাংকও ২০২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ২০২৮ অর্থবছরে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ করেছে।

এদিকে ২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস ৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ করেছে আইএমএফ। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩১ অর্থবছরের আগে মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসার সম্ভাবনা নেই। বিনিয়োগ পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরে মোট বিনিয়োগ ০ দশমিক ৫ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে। ২০২৭ ও ২০২৮ অর্থবছরে বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি যথাক্রমে ০ দশমিক ৩ ও ১ শতাংশ হতে পারে। দেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতি নিয়েও পূর্বাভাস পরিবর্তন করেছে বিশ্বব্যাংক।

জ্যোতি রহমানের মতে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকটের জন্য শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দায়ী নয়। দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থা, করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সংকট, বিনিয়োগ হ্রাস ও নীতিগত অনিশ্চয়তাও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, রপ্তানি বাণিজ্য অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের অন্যতম উৎস। যেকোনো বিকাশমান দেশের জন্যই বৈদেশিক মুদ্রায় আয় সক্ষমতা বৃদ্ধি সমৃদ্ধি বাড়ায়। ইদানীং বৈশ্বিক নানা বাধা ও অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে আমাদের রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে।

রপ্তানির পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের আরেক অন্যতম উৎস প্রবাসী আয়। এ দুই উৎস দেশের বৈদেশিক মুদ্রা মজুতের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে কাজ করে। রপ্তানি আয় ও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স যত বাড়ে, ততই দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ে। ফলে দেশের আমদানি ব্যয় মেটানো, ঋণ পরিশোধ ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সহজ হয়। তা ছাড়া বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যত শক্তিশালী হয়, ততই দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা উন্নত হয়। ফলে টেকসই উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মুদ্রাবাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সহজ হয়। রপ্তানি আয় হ্রাস পেলে বৈদেশিক মুদ্রার প্রভাব কমবে ও দেশের রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি করবে। এতে ডলার–সংকট দেখা দেবে। আমদানি ব্যয় মেটানো, ঋণ পরিশোধ ও মুদ্রার স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা হুমকিতে পড়বে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, অর্থনীতির বিভিন্ন জায়গায় যে অস্থিরতা আছে, সেখানে যেন একটা গতি ও স্থিতিশীলতা আসে। মানুষের প্রত্যাশা শুধু সামাজিক বা পারিবারিক জীবনে নয়; অর্থনৈতিক জীবনেও স্বস্তি ফিরে আসবে।

তাঁরা বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেক মন্থর গতিতে চলছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের অর্থনীতির গতি এখনো অনেক শ্লথ। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জনের পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। বেশ কিছুদিন ধরে লক্ষ করা যাচ্ছে, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, কৃষি এবং ব্যাংকিং খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে মন্থর গতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। অর্থনীতিকে সচল রাখার জন্য মূল ইঞ্জিনগুলোকে আবার দ্রুত সক্রিয় করতে হবে। পাশাপাশি, অর্থনীতিতে গতি না আসার সুনির্দিষ্ট কারণগুলো চিহ্নিত করতে হবে। বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় সংকট হলো জ্বালানি সংকট। এ সংকট শুধু উৎপাদন ও ব্যবসাকেই ব্যাহত করছে না, বরং পুরো অর্থনীতিকে স্থবির করে দিয়েছে। তাই স্থবিরতা কাটাতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ করে, জ্বালানি সংকটের টেকসই সমাধান নিশ্চিত করতে হবে। দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে যত ধরনের প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, সেগুলো যৌক্তিকভাবে মোকাবিলা করে বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য আস্থা তৈরি করতে হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে