ঢাকার পল্লবীতে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার শিশু রামিসার ঘটনাটি যেমন নাড়া দিয়েছে পুরো বাংলাদেশকে, তেমনি গত একমাসে আরো অন্তত তিনটি শিশু এ ধরনের ঘটনার শিকার হয়েছে। এই শিশুদের প্রত্যেকেরই বয়স চার থেকে দশ বছরের মধ্যে। গত ছয়ই মে থেকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় শিশুরা এমন নৃশংসতার শিকার হয়েছে।
এদিকে নগরীর দক্ষিণ বাকলিয়ার আবু জাফর রোড চেয়ারম্যানঘাটা এলাকায় সাড়ে তিন বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে মনির হোসেন (৩৫) নামে এক ব্যক্তিকে আটক করেছে পুলিশ। থানায় নিয়ে যাওয়ার সময় বিক্ষুব্ধ জনগণ প্রায় সাত ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখে পুলিশকে। এসময় কাঁদানে গ্যাসের শেল, সাউন্ড গ্রেনেড, ফাঁকা গুলি ছুড়েও পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেও পারেনি। পরে রাত ১০টায় এলাকায় বিদ্যুৎ চলে গেলে কৌশলে ওই ব্যক্তিকে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এসময় বিক্ষুব্ধ স্থানীয় জনগণ পুলিশের গাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়। পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পরবর্তীতে রাত সোয়া ১০টার দিকে উত্তেজিত জনগণ চট্টগ্রাম কক্সবাজার মহাসড়কের বাকলিয়া অংশে অবরোধ করে এবং টায়ার জ্বালিয়ে আগুন লাগিয়ে দেয়। উত্তেজিত জনতা অভিযুক্ত ব্যক্তিকে তাদের হাতে তুলে দেওয়ার দাবি জানালে পুলিশ ও জনতার মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পুলিশ বিভিন্ন ভাবে স্থানীয় জনগণকে শান্ত করার চেষ্টা করেন।
এইচআরএসএস মানবাধিকার সংগঠনটির এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সারাদেশে ৫৮০ জন শিশু ধর্ষণ এবং ৩১৮ জন যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব ঘটনা ঠেকাতে বা প্রতিরোধে বাংলাদেশে কোনো আইনী ব্যবস্থা রয়েছে কী? বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে মানবাধিকার কর্মী, আইনজীবী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, বাংলাদেশে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে সুনির্দিষ্ট কোন আইন নেই। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী ফওজিয়া করিম বলেন, ‘যৌন হয়রানি বা এ সংক্রান্ত অপরাধ প্রতিরোধে সুনির্দিষ্ট কোনো আইন নেই। তবে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে উচ্চ আদালতের নির্দেশে একটি নীতিমালা আছে, কিন্তু সেটি আইনে পরিণত হয়নি।’ এই মানবাধিকার কর্মী বলেন, এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে জনসচেতনতা সৃষ্টি সবচেয়ে বেশি জরুরি। অন্যদিকে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, অপরাধীর প্রোফাইল তৈরির জন্য পুলিশের একটি সফটওয়্যার রয়েছে। যাতে তার সকল তথ্য থাকে। অপরাধীর প্রথমবারের অপরাধের রেকর্ড রাখার পর আবার অপরাধ করলে পূর্ব রেকর্ড খুঁজতে গেলে ওই সফটওয়্যারে সকল তথ্য পাওয়া যাবে বলে জানান পুলিশ কর্মকর্তারা। গত চার–পাঁচ বছর ধরে এই সিস্টেমে অপরাধীর তথ্য সংরক্ষণ করা হয়।
আসলে আমাদের সমাজে ভিকটিম যদি নারী বা কন্যা শিশু হয় তাহলে ‘ভিক্টিম ব্লেইমিং’ যেন একটি অতি সাধারণ ব্যাপার। আর শিশু যদি ভিক্টিম হয় তাহলে এটা আরও বেশি ঘটে। কারণ শিশুরা শক্তভাবে প্রতিবাদ করতে পারে না। কিন্তু নির্যাতিত ব্যক্তির উপর দায় চাপানোর এই চর্চা আমাদের দ্রুত বন্ধ করা উচিত।
বিলম্বিত বিচার এবং তদন্ত প্রভাবিত হওয়ার কারণে ধর্ষণের ঘটনা বাড়ছে। একাধিক আইনজীবীর মতে, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা অনেক সময় নথিপত্রে তথ্য–প্রমাণাদি সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে পারেন না। ফলে বিচার প্রক্রিয়া বছরের পর বছর ধরে ঝুলে থাকে, যা বাদীপক্ষকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে এবং সমাজে এক ধরনের ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’ তৈরি করে। যখন অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত হতে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয় বা অপরাধী পার পেয়ে যায়, তখন অন্যান্য সম্ভাব্য অপরাধী উৎসাহিত হয়। বিশেষজ্ঞরা বলেন, ধর্ষণ প্রতিরোধে আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। নারীর নিরাপত্তা মানে সমাজের নিরাপত্তা। প্রতিটি শিশু, প্রতিটি নারীকে নিরাপদ রাখা রাষ্ট্র ও সমাজের মৌলিক দায়িত্ব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কন্যাশিশুরাই বড় হয়ে এক দিন মা হবে। তাই যত্ন দিয়ে, নিরাপত্তা দিয়ে তাদের বেড়ে ওঠার সুযোগ করে দিতে না পারলে সমৃদ্ধ জাতি গঠনে তারা সহায়ক শক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হবে। কন্যাসন্তানকে সুশিক্ষিত হিসেবে গড়ে তুলে যোগ্য পাত্রের হাতে তুলে দিতে হবে। শুধু আইন দিয়ে নয়, সম্মিলিতভাবে সরকার ও সুশীলসমাজকে এ নিয়ে কাজ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে পরিবার, প্রতিষ্ঠান এবং সরকারের দায়িত্ব অপরিসীম। যৌন হয়রানি রোধে অবাধ ইন্টারনেট ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। শিশু ধর্ষণ রোধে আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি মানুষের মানসিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে হবে।






