বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যে শিক্ষার উন্নয়নে ৪৩টি ক্ষেত্র চিহ্নিত করে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সরকার বাস্তবায়ন করছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সংসদ অধিবেশনে গতকাল বুধবার নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে সিরাজগঞ্জ–১ আসনের সংসদ সদস্য সেলিম রেজার লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী সংসদে এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্য, সরকার শিক্ষাকে জাতির শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করে এবং একটি গুণগত, জীবনমুখী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর। তিনি বলেন, সরকার নির্বাচনি ইশতেহারে শিক্ষা খাতে বরাদ্ধ পর্যায়ক্রমে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা ব্যক্ত করা হয়েছে। সেই আলোকে শিক্ষা খাতে ৪৩টি ক্ষেত্র চিহ্নিত করে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ইশতেহারে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
সেই লক্ষ্যে চলতি অর্থ বছরেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২ লক্ষ শিক্ষার্থীর মাঝে বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস বিতরণ করা হবে। এটা সকল উপজেলায় পর্যায়ক্রমে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের পুষ্টি চাহিদা পূরণে পর্যায়ক্রমে সকল উপজেলায় স্কুল মিড ডে মিল পরিকল্পনা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে একটি দেশের শিক্ষা খাত জিডিপির ৬ শতাংশ বা বাজেটের ২০ শতাংশ বরাদ্দ পেলে তা আদর্শ ধরা হয়, সেখানে বাংলাদেশে তা ২ শতাংশের কম। সে কারণে প্রতি বছরই শিক্ষায় বরাদ্দ আরো বাড়ানোর দাবি থাকে। এদিনও মাইক বিভ্রাটের কারণে আধা ঘণ্টা দেরিতে বেলা ১১টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে শুরু হয় সংসদ অধিবেশন। অধিবেশনের প্রথম ৩০ মিনিট ছিল প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্ব। প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর এবং মন্ত্রীদের প্রশ্নোত্তর টেবিলে উপস্থাপিত হয়েছে বলে স্পিকার জানিয়েছেন।
এমপি সেলিম রেজার প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরে বলেন, নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী নতুন প্রজন্মকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার উপযোগী করতে প্রাথমিক, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও সমমানের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করা হবে। ডিজিটাল বৈষম্য কমাতে ১৫০০টি প্রতিষ্ঠানে (মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়) ফ্রি ওয়াই–ফাই সংযোগ এবং প্রতিটি শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের জন্য অনন্য ডিজিটাল পরিচয় বা ‘এডু–আইডি’ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। নির্বাচনি ইশতেহারে মাধ্যমিক পর্যায়ে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি সবার জন্য কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার অঙ্গীকারও করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি উপজেলায় টেকিনিক্যাল স্কুল ও কলেজ এবং প্রতি জেলায় পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
এছাড়া কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আধুনিকায়নের পাশাপাশি আগামী ১৮০ দিনের মধ্যে দেশের ২৩৩৬টি কারিগরি ও ৮২৩২টি মাদ্রাসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ‘ফ্রি ওয়াই ফাই’ চালু করা হবে। মাদ্রাসা শিক্ষাকে আধুনিকায়ন ও যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে আধুনিক স্মার্ট ক্লাসরুম স্থাপন, শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ ও কারিগরি কোর্স অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
এছাড়া আইসিটি বিভাগের আওতাধীন কম্পিউটার কাউন্সিল থেকে আগামী ৬ মাসের মধ্যে আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স, সাইবার সিকিউরিটি, মোবাইল অ্যাপস ডেভেলমেন্ট অ্যান্ড ডিজাইন ইউজিং ফ্লাটার, পিথম প্রোগ্রামিং ও অল বেইজড ডিজিটাল মার্কেটিং বিষয়ে ছাত্র–ছাত্রীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ারও উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এদিন চারটি প্রশ্ন নির্ধারিত ছিল প্রধানমন্ত্রীর জন্য । শিক্ষা বিষয়ক এমপি সেলিম রেজার দুটি প্রশ্নের জবাবে এসব তথ্য সংসদকে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
ব্যক্তি নয়, পরিবারই মূল একক : ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক দর্শনে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নোয়াখালী–১ আসনের এ এম মাহবুব উদ্দিনের প্রশ্নের লিখিত জবাবে প্রধানমন্ত্রী এ কথা জানান। তিনি বলেন, দেশের নাগরিকদের সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বর্তমান সরকার ‘ব্যক্তি নয়, পরিবারিই উন্নয়নের মূল একক’ এই দর্শনে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। প্রাথমিক পর্যায়ে গত ১০ মার্চ দেশের ১৩টি জেলা এবং তিনটি সিটি করপোরেশনে ৩৭ হাজার ৮১৪টি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড প্রদান করা হয়েছে। আগামীতে দেশের প্রায় ৪ কোটি প্রান্তিক পরিবারকে পর্যায় ক্রমে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনা হবে। আশা করছি, সংসদ সদস্যের নির্বাচনি এলাকায় দরিদ্র পরিবারের নারী সদস্যদের স্বল্পতম সময়ের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হবে।
পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন প্রসঙ্গে : ঢাকা–১৯ আসনের সাংসদ দেওয়ান মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিনের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারের সাথে পর্যটন সংশ্লিষ্ট ৫টি প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এগুলো হচ্ছে, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও পর্যটন বান্ধব নীতি প্রনয়ন, ট্যুর গাইড প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন, রন্ধনশৈলী পর্যটনের প্রসার ঘটানো, কমিউনিটি ট্যুরিজম, এথনিক ও ওয়াটার ট্যুরিজমের বিকাশ ও ইকো–ট্যুরিজমের বিকাশ ও গ্রাম পর্যটন উন্নয়ন।
তিনি বলেন, দেশের আর্থ–সামজিক অবস্থা ও দেশি–বিদেশি পর্যটকদের ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্বাচনি ইশতেহারের পর্যটন সংশ্লিষ্ট প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে জাতীয় পর্যটন মহাপরিকল্পনা এর খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে। দেশের বর্তমানে ৩০টির অধিক জেলায় স্বীকৃত ও আকর্ষনীয় পর্যটন গন্তব্য রয়েছে। সকল অঞ্চলে পর্যটনের সুবিধা সমপ্রসারণ ও ভারসাম্যপূর্ণ পর্যটন উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রত্যেকটি জেলার পর্যটন উপযোগিতা বিবেচনা করে স্থানীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ভিত্তিক পর্যটন সুবিধা সৃষ্টি গ্রহণ করা হয়েছে।













