শানে রেসালাত বোঝার ঈমানী ও মানবিক দৃষ্টি

আল্লামা ইমাম হায়াত | শনিবার , ৪ এপ্রিল, ২০২৬ at ৫:৩১ পূর্বাহ্ণ

আমাদের প্রাণাধিক প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জানা বোঝার দুইটি দিক আছে। প্রাণাধিক প্রিয়নবীকে আল্লাহতাআলার সংযোগ হিসেবে বুঝার ঈমানী দৃষ্টি এবং মানবতার উৎস হিসেবে বুঝার মানবিক দৃষ্টি।

প্রথমত ঈমানী দিক বা আল্লাহতাআলার একমাত্র মূল সংযোগ, প্রত্যক্ষ নূর এবং আল্লাহতাআলার নবী ও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিসেবে।

দ্বিতীয়ত সকল গুণজ্ঞানকল্যাণের উৎস ও সব মানুষের জন্য মর্যাদানিরাপত্তাঅধিকারস্বাধীনতার দাতা তথা মানবতার উৎস এবং মিথ্যামূর্খতাঅবিচারশোষণবৈষম্যপাশবতারুদ্ধতাস্বৈরদস্যুতা থেকে মানবতার মুক্তিদাতা মহান মানুষ রূপে বাহ্যিক হিসেবে।

ঈমানী দিক সত্যপ্রাপ্ত সৌভাগ্যবান ঈমানদারদের জন্য কুরআনে নির্দেশিত পবিত্র কলেমায় ঘোষিত। আর বাহ্যিক ধারণা বিশ্লেষণ অন্যদের জন্য যারা ঈমানী উপলব্ধিতে অক্ষম, ইলাহীয়াত বিশ্বাস করে না অথবা করলেও রেসালাত বুঝতে চায় না।

ঈমানী দিক থেকে দয়াময় আল্লাহতাআলার পবিত্র সত্তার প্রত্যক্ষ আলোকে আলোকিত, প্রত্যক্ষ সম্পর্কিত, প্রত্যক্ষ দর্শী, আল্লাহ্‌তায়ালার প্রত্যক্ষ প্রেমসত্তা, আল্লাহ্‌তায়ালার পবিত্র সত্তা ও সকল গুণাবলী নামাবলীর রেসালাতের মহা প্রতিষ্ঠান; যে রেসালাতের মাধ্যমেই আল্লাহ্‌তায়ালা প্রকাশিত হন, সকল গুণাবলীনামাবলীইচ্ছাবাণী ও হুকুম প্রকাশিত হয়, সব জ্ঞানরহমতনেয়ামতকুদরত যে সত্তার মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়, সব সৃষ্টিও হয় যাঁর উসিলায় এবং সৃষ্টির সাথে সম্পর্কও হয় কেবল যাঁর মাধ্যমে, সর্ব সৃষ্টির জন্য যিনি উৎসরক্ষামুক্তি ও আল্লাহতাআলার কবুলিয়ত ও নৈকট্যের মূল, সকল সৎ গুণাবলী ও পবিত্রতার উৎস।

দয়াময় স্রষ্টার মহান রাসুল ই সর্বসৃষ্টির জন্য স্রষ্টার আলো ও বন্ধন এবং সর্বোচ্চ অনুগ্রহ; স্রষ্টার পক্ষ থেকে মহান রাসুল ই সমগ্র মানবমণ্ডলীর জন্য সকল জ্ঞানবিজ্ঞান, সকল গুণ, সকল কল্যাণের উৎস। বস্তুর উর্ধ্বে স্রষ্টার নামে মানবসত্তা, জীবনের আত্মমালিকানা, দুনিয়া ও দুনিয়ার সকল সম্পদে সব মানুষের সম্মিলিত মালিকানা, প্রতিটি মানুষের জীবনের নিরাপত্তাস্বাধীনতাঅধিকারমর্যাদা, সব মানুষ যার যার বিশ্বাস আদর্শ নিয়ে চলা এবং সত্য ও জ্ঞানের মুক্ত প্রবাহের ধারায় একক গোষ্ঠীর স্বৈরতামুক্ত সর্বজনীন মানবতার রাষ্ট্র, মানবিক সাম্যের ভিত্তিতে মুক্ত জীবনের অখণ্ড দুনিয়া খেলাফতে ইনসানিয়াতের একমাত্র দাতা ও প্রতিষ্ঠাতা প্রাণের রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।

সব নবী রাসুলই পবিত্র ও মহান, মানবমণ্ডলীর জন্য দয়াময় আল্লাহতাআলার দয়াদিশা ও মুক্তির কেন্দ্র; যাঁদের বাদ দিয়ে জীবন শয়তানে পরিণত হয় আর সব রহমত থেকে বঞ্চিত হয়।

ঈমানী বিশ্বাস না করলেও সব নবী রাসুলের মধ্যে সত্য ও কল্যাণ ত্যাগ ছাড়া আর কিছুই নেই। কিন্তু তারপরও সত্য ও সৌন্দর্য্য পছন্দ করে না এমন বিকৃত মানসিকতার মানুষ রূপী শয়তানগণ নবী রাসুলদের অন্যায় অযৌক্তিক শত্রুতা বিরোধিতা করেছে, তাঁদের কষ্ট দিয়েছে এবং এখনও করে যাচ্ছে; যেমন ময়লা থেকে সব সময় কেবল দুর্গন্ধই বের হয়।

মিথ্যা ও বস্তুর দাসত্ব থেকে সর্ব প্রকার দাসত্ব থেকে মুক্ত করে আত্মার স্বাধীনতা জীবনের স্বাধীনতা সহ দুনিয়ার প্রতিটি মানুষের স্বাধীনতা আমাদের মহান প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দান।

এ অবস্থায় আমরা সবাইকে দৃঢ়ভাবে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, আমাদের প্রাণাধিক রাসুলের শানে কোন ধৃষ্টতা অবমাননা সহ্য করা হবে না বরং প্রাণপণে প্রতিহত করা হবে। মিথ্যাকে প্রশ্রয় দেয়াও অপরাধ।

মুমিন শব্দের এক অর্থ আমান দাতা বা নিরাপত্তা প্রদানকারী। মুমিনের কাছে কোন নিরপরাধ লোকের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে না, সে যে ধর্মেরই হোক বা যে দেশেরই নাগরিকই হোক।

মুমিন নিজ রাষ্ট্রের নাগরিকত্বের সাথে সাথে বিশ্বনাগরিকও। মুমিনের নিকট সব মানুষের জান মাল ইজ্জত আমানত। স্মরণ রাখতে হবে আল্লাহতাআলা তাঁর হাবীব প্রিয়নবীকে রাহমাতাল্লিল আলামীন সবার জন্য সর্ব জগতের রহমত কল্যাণ বলে প্রশংসিত করেছেন।

মহান প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সব উম্মত তথা সব ঈমানদারকে কল্যাণের প্রতিবিম্ব হতে হবে। সব বিষয়ে সত্য ন্যায় বিবেক সুবিচার দ্বীনের আদর্শ ও মর্যাদার প্রতিফলন ঘটাতে হবে।

আমরা ঈমানদারদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, এ ভয়ংকর দুঃসহ পরিস্থিতিতেও যদি আমরা জাগ্রত ঐক্যবদ্ধ ও যুগের সঠিক দিশায় যথার্থ পরিকল্পনা ও কর্মসূচী নিয়ে এগিয়ে যেতে না পারি তা নিজেদের অসারতা, মূলের সাথে দূরত্ব ও আপনত্বহীনতা হয়ে দাঁড়াবে যা দুর্বৃত্তদের আরো লাগামহীন করে তুলবে।

সত্য ও মানবতার শক্তি ঐক্যহীন দুর্বল হলে মিথ্যা ও জুলুমের শক্তি বেপরওয়া হয়ে যায়। এজন্য সর্বাগ্রে যারা আমাদের দ্বীনের ছদ্মবেশে ভিতর থেকে সবদিক থেকে দুর্বল করে শয়তানদের শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে তাদের ধোকা চক্রান্ত প্রদর্শনী থেকে মুক্ত হতে হবে।

কারণ একদিকে সত্যের যথাযথ দিশা ও কর্মসূচীর ঘাটতি অন্যদিকে ভিতর বাহিরের যৌথ চক্রান্তে যুগের পর যুগ একের পর এক ঐতিহাসিক ভুল ও আত্মঘাতি সিদ্ধান্তে দুনিয়াব্যাপী মিল্লাত পর্যুদস্ত হয়ে গেছে।

দ্বীনের ছদ্মবেশী এসব বিভিন্ন বাতিল ফেরকা যারা সুদূর প্রসারী দ্বীন বিনাশী কুপরিকল্পনার অংশ হিসেবে দ্বীনকে বিকৃতমিল্লাতকে বিভক্তঈমানী জাতীয়তা হরণঅরাজনৈতিক গণ্ডীতে আবদ্ধ কিংবা হীন স্বার্থের ভ্রান্ত রাজনীতির শিকারে পরিণত করে।

দ্বীনের প্রকৃত শিক্ষা মর্ম সৌন্দর্য ব্যাপকতা আড়াল করে নিছক কতিপয় আইন আমলা মছআলা ফতোয়ার অতি বাড়াবাড়ি ও সংকীর্ণ চক্রে আবদ্ধ রেখে, বোনদের সুস্থ স্বাভাবিক পর্দা বা শরীয়ত সম্মত পোশাকের পরিবর্তে অতি পর্দার বিকৃত অবরোধ, শিক্ষা বিকাশ নিষিদ্ধ, স্বাধীনতা অধিকার মর্যাদা মানুষসত্তা হরণ করে জাতিকে পঙ্গু করে দিয়েছে।

দ্বীনের মূল বিষয় রূহানীয়াত অস্বীকার অবজ্ঞা করে আওলিয়া কেরামের অবমাননা, তাঁদের মাজারশরীফ ভেঙে ওরস শরীফে হামলা করে, আওলিয়া কেরামের স্মরণ অনুসরণ তথা আল্লাহতাআলা রাসুলের প্রেম ও নৈকট্য সাধনায় বাধা দিয়ে, মুসলমানদের বস্তুবাদি মতবাদের দাস করে রেখে এবং শিক্ষাজ্ঞানবিজ্ঞানপ্রযুক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন রেখে দ্বীন ও জাতি হিসেবে দুর্বল অক্ষম করে রেখেছে।

আজ শানে রেসলাতের খেলাফ অবমাননা ধৃষ্টতার উপর্যুপরি বেপরওয়া দুঃসাহসের জন্য মিল্লাতের বহুমুখী বিপর্যয় সংকটের জন্য এরাই প্রধানত দায়ী। বাহ্যিক শক্রর চেয়ে এসব অভ্যন্তরীন শত্র অনেক বেশি মারাত্মক ক্ষতিকর বিনাশী যাদের চিনতে না পারলে দ্বীন মিল্লাত এমনিতে ভিতর থেকেই পরাজিত বিকৃত ও ধ্বংস হয়ে যাবে।

শানে রেসালাতে অবমাননারও দুই দিক আছে। মিথ্যাচারী হীন বর্বর শয়তান কুলাঙ্গারদের বিদ্বেষপ্রসূত প্রকাশ্য এসব বেয়াদবির সাথে সাথে কৌশলে দ্বীনের ছদ্মবেশেই রেসালাতের শান সিফাত মহিমা অস্বীকার করে, ঈদে আজম সালাতু সালামে বাধা দিয়ে, ঈদে মেরাজ শরীফ অস্বীকার করে, ঈমানের বিপরীত কেবল বাহ্যিক বস্তুবাদি দৃষ্টিভঙ্গীতে দেখিয়ে, আত্মার সম্পর্ক বিনষ্ট করে আত্মাকে আঁধার ও মৃত করে ফেলার চক্রান্ত চলছে।

তাই আমাদেরকে শানে রেসালাতের প্রকাশ্য খেলাফ শয়তান শক্রদের মিথ্যাচার অবমাননা যেমন সর্ব শক্তিতে রুখে দাঁড়াতে হবে, তেমনি দ্বীন ও মিল্লাতকে অভ্যন্তরীণভাবে বিচ্যুত বিভক্ত দুর্বল করার চক্রান্ত এবং পরোক্ষভাবেও যারা শানে রেসালাতের খেলাফ করে যাচ্ছে তাদের ব্যাপারেও সতর্ক সজাগ থাকতে হবে, যেন এসব এজিদবাদি বাতিল ফেরকা ধোকা দিয়ে নিজেদের ইসলাম হিসেবে চালিয়ে দিয়ে প্রতারণা করতে না পারে, জাতীয় নেতৃত্ব কর্তৃত্ব ছিনতাই করতে না পারে।

দ্বীন মিল্লাত মানবতার বিরুদ্ধে সার্বিক ধ্বংসাত্মক চক্রান্তসন্ত্রাসআগ্রাসন ও এ সব হীন মিথ্যা বেয়াদবীর বিরুদ্ধে কেবল এক দিনের বিক্ষোভ মিছিল করে গেলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না এবং সমস্যার সমাধানও হয়ে যায় না, প্রয়োজন অব্যাহত পরিকল্পিত আন্দোলন। এ জন্য আমাদের সবার প্রয়োজন বাতিল ফেরকা ও বস্তুবাদ তথা সব মিথ্যা অনাচার থেকে মুক্ত থেকে, নিজেকে কোন প্রকার মিথ্যা জুলুমের অংশ না করে একমাত্র প্রিয়নবীর হয়ে যাওয়া।

একমাত্র রেসালাত কেন্দ্রিক জীবনই তাওহীদ ভিত্তিক হতে পারে এবং সত্যের প্রদীপ হিসেবে মিথ্যাকে দূর করতে পারে। প্রাণাধিক প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রেম তথা সত্য ও মানবতার শক্তির দুনিয়াব্যাপি ঐক্য ও বিজয়ের লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার আন্তরিক শপথই এ সংকট সময়ে আমাদের সবার ঈমানী কর্তব্য।

লেখক: প্রতিষ্ঠাতা, ওয়ার্ল্ড সুন্নী মুভমেন্ট

পূর্ববর্তী নিবন্ধরণদা প্রসাদ সাহা : মেধা ও পরিশ্রমে জিরো হতে হিরো
পরবর্তী নিবন্ধহাম ভাইরাস নিয়ে বাবা-মায়ের করণীয়