রেমিট্যান্সের পর রপ্তানি আয়বৃদ্ধি : অর্থনীতির জন্য আশাজাগানিয়া

| বৃহস্পতিবার , ৪ আগস্ট, ২০২২ at ৬:৩৩ পূর্বাহ্ণ

গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। বিশেষজ্ঞরা এই পরিবর্তন ও অগ্রগতিকে বলছেন বিস্ময়কর। অর্থনীতিবিদরা জানিয়েছেন, দেশে ৭৫ পরবর্তী অর্থনীতির যত পরিবর্তন ঘটেছে তার ৭৩ শতাংশ হয়েছে গত ১২ বছরে। স্বাধীনতার পরের বছর (১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে) বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ছিল ৩৪৮ মিলিয়ন ডলার। এর সিংহভাগই এসেছিল পাট ও পাটজাত পণ্য থেকে। এরপর পার হয়েছে প্রায় ৫ দশক। রপ্তানি বেড়েছে বহুগুণ। এখন বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক। আর সেই তৈরি পোশাকের ওপর ভর করেই আজ ৫১ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয়ের ইতিহাস সৃষ্টির পথে বাংলাদেশ।
সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনীতির ব্যাপক সংকটের মধ্যে আলো ঝলমলে খবর হচ্ছে ‘রেমিট্যান্সের পর রপ্তানি আয়েও বাজিমাত’।

পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, প্রবাসী আয়ের (রেমিট্যান্স) পর রপ্তানি আয়েও বড় ধরনের উল্লম্ফন হয়েছে। এই অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার দেশে এসেছে। ফলে রেমিট্যান্স আর রপ্তানিতে বাজিমাত করে নতুন অর্থবছর ২০২২-২৩ শুরু করলো বাংলাদেশ। নতুন অর্থবছরের শুরুর মাসে এই রপ্তানি আয় গত বছরের একই মাসের চেয়ে ১৪ দশমিক ৭২ শতাংশ বেশি। আর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১ দশমিক ৬৫ শতাংশ বেশি এসেছে। মঙ্গলবার এ তথ্য প্রকাশ করেছে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)। প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ২০২২-২৩ অর্থবছরের পুরো মাসে প্রায় ৪ বিলিয়ন (৩৯৮ কোটি ৪৮ লাখ ২০ হাজার) ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। করোনার অভিঘাত আর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্ব বাণিজ্যে অস্থির পরিস্থিতির মধ্যেও রপ্তানিতে এই উল্লম্ফনকে দেশের অর্থনীতির জন্য আশাজাগানিয়া লক্ষণ হিসেবে অভিহিত করছেন অর্থনীতিবিদ ও রপ্তানিকারকরা।

তথ্য বলছে, গত ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে রপ্তানিতে আয় হয়েছিল ৩৪৭ কোটি ৩৪ লাখ (৩.৪৭ বিলিয়ন) ডলার। লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৩৯২ কোটি (৩.৯২ বিলিয়ন) ডলার।এ হিসাবে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৪ দশমিক ৭২ শতাংশ। আর লক্ষ্যের চেয়ে বেড়েছে ১ দশমিক ৬৫ শতাংশ। ইপিবির তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের শুরুর মাসে (জুলাই) মোট রপ্তানি আয়ের মধ্যে তৈরি পোশাক খাত থেকেই এসেছে ৩৩৬ কোটি ৬৯ লাখ (৩.৩৬) ডলার বা ৮৪ দশমিক ৫০ শতাশ।প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৬ দশমিক ৬১ শতাংশ। গত ২০২১-২২ অর্থবছরে পণ্য রপ্তানি করে ৫২ দশমিক শূন্য আট বিলিয়ন ডলার আয় হয়েছিল, যা আগের অর্থবছরের (২০২০-২১) চেয়ে ৩৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ বেশি আয় হয়েছিল। উল্লেখ্য, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫৮ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে। এদিকে জুলাই মাসে রেমিট্যান্সও বেড়েছে ১২ শতাংশের বেশি। এই মাসে প্রবাসীরা ২.১০ বিলিয়ন (২১০ কোটি) ডলার পাঠিয়েছেন দেশে, যা ১৪ মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি।

এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও করোনা অতিমারির দীর্ঘকালীন প্রভাবের মধ্য দিয়ে গেছে। যখন করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছিল, ঠিক সেই সময়ে শুরু হয়েছিল রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। গত কয়েক মাস ধরে বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্য পরিস্থিতি এই সংকটে খাবি খাচ্ছে। করোনা পরিস্থিতির নেতিবাচক প্রভাব এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যেও রপ্তানি আয়ের এই আনন্দদায়ক রেকর্ড গড়ল বাংলাদেশ।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মনে রাখতে হবে, আমাদের মতো দেশগুলোতে এখন বর্ধিষ্ণু আমদানি ও সেবাদায় নিষ্পন্ন করা এমনকি প্রবাসী আয় কিংবা বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স আনয়ন ধীরে ধীরে চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠছে। ঠিক এই সময়ে রপ্তানি আয় বৃদ্ধিতে মাইলফলক অর্জন অতিশয় সুখের বিষয়। আমাদের ক্রমাগত বাণিজ্য ঘাটতি এমনকি চলতি হিসাবের ঘাটতি মোকাবিলায়ও রপ্তানি আয় বৃদ্ধির বিষয়টি কাজে আসবে। অর্থনীতি বিশ্লেষক মামুন রশীদ বলেছেন, আমাদের এটাও মনে রাখতে হবে, রপ্তানি ঝুড়িতে আমাদের যোগ করতে হবে আরও নতুন নতুন পণ্য। বিশেষ নজর রাখতে হবে ডলারের বিপরীতে দেশি মুদ্রার বিনিময় হারের দিকেও। অধুনা বাংলাদেশ ব্যাংকের বেঁধে দেওয়া ডলারের রেট ৮৭ টাকা, আর আমদানিকারকদের আমদানি দায় নিষ্পন্নের রেট ৯৬-৯৭ টাকার লুকোচুরির মধ্য দিয়ে প্রবাসী বা রপ্তানিকারকদের তেমন লাভ হয়নি বরং বিভ্রান্তি বেড়েছে। বৈধ বিনিময় ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলার কারণে প্রবাসীদের পাঠানোর মতো অর্থের অনেকটাই হুন্ডির মাধ্যমে লেনদেন শুরু হয়েছে। বাজার শৃঙ্খলা মেনে ধীরে ধীরে বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা করা গেলে সব অংশীজনেরই লাভ হয়। এতো নেতিবাচক পরিস্থিতির মধ্যেও রপ্তানি আয় যে বেড়েছে, তা ধরে রাখতে হলে রপ্তানি চ্যানেলগুলো নির্বিঘ্ন রাখতে হবে।