সবুজ পাতার তীব্র সুবাসে চারপাশ আমোদিত। বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে চোখ জুড়ানো সবুজ চাদর। বাতাসে দোল খাচ্ছে ধনে পাতার চেয়ে একটু চওড়া ও খাঁজকাটা পাতার এক বিশেষ সুগন্ধি মসলা্ত বিলাতি ধনিয়া। চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের বেতছড়ি ও রইস্যাবিলি এলাকার মাঠে মাঠে এখন এই ফসলেরই জয়জয়কার। পুরো রাঙ্গুনিয়া উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিলাতি ধনিয়ার আবাদ হয় এই ইসলামপুরেই। চলতি মৌসুমে এখানকার প্রায় ২০ হেক্টর জমিতে এই ফসলের ব্যাপক চাষাবাদ হয়েছে। অল্প পুঁজি ও সঠিক পরিচর্যায় নিশ্চিত আয়ের কারণে প্রতিবছরই স্থানীয় কৃষকরা এই চাষে ঝুঁকছেন। তবে চলতি মৌসুমে বাম্পার ফলন হলেও বাজার ব্যবস্থাপনায় বেপারীদের কারসাজি আর ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় লোকসানের আশঙ্কায় দিন কাটছে চাষিদের।
সরেজমিনে ইসলামপুরের বেতছড়ি ও স্যাদিক্যাবিলি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কৃষকদের তুমুল ব্যস্ততা। কেউ জমি থেকে পাতা তুলছেন, কেউ তা আঁটি বাঁধছেন। এই উৎপাদিত বিলাতি ধনিয়াকে কেন্দ্র করে এই এলাকায় প্রতিদিন বসে একটি বিশেষ পাইকারি বাজার। স্থানীয় কৃষকরা মাঠ থেকে টাটকা ধনিয়া পাতা তুলে এনে এই বাজারেই প্রতিদিন বেচাকেনা করেন। দূর–দূরান্ত থেকে বেপারীরা গাড়ি নিয়ে আসেন এই হাটে। বেতছড়ি গ্রামের কৃষক মো. মুরাদ ও মো. সিরাজ ভূট্টা প্রত্যেকে ৪০ শতক জমিতে এই ধনিয়ার আবাদ করেছেন। জমি থেকে ফসল তোলার সময় কথা হয় মো. সিরাজের সাথে।
তিনি বলেন, বিলাতি ধনিয়া মূলত একটি দীর্ঘমেয়াদী ফসল। জমিতে প্রায় আট থেকে নয় মাস থাকে। বীজ বোনার তিন মাস পর থেকেই আমরা কাটা শুরু করি। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, একবার রোপণ করলে প্রতি মাসে একই জমি থেকে দুইবার করে ফসল তোলা যায়।
একই বাজারের এক কোণে নিজের জমির ধনিয়া পরিষ্কার করছিলেন রইস্যাবিলি গ্রামের সাজু তনচঙ্গ্যা (৩০ শতক) ও স্যাদিক্যাবিলি গ্রামের করুনা মোহন (১৫ শতক)। তারা জানান, বেতছড়ি বাজারের এই দৈনিক বাজারটিই এখন এলাকার শত শত চাষির রুটি–রুজির প্রধান কেন্দ্র। কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এটি যেমন লাভজনক তেমনি এতে খরচও কম নয়। ২০ শতক জমিতে আবাদ করা কৃষক মো. আবু সৈয়দ ও শিশু মোহন তনচঙ্গ্যা জানান, ৪০ শতক জমিতে বিলাতি ধনিয়া আবাদে বীজ, সার, সেচ ও শ্রমিকের মজুরিসহ প্রায় ৩ থেকে ৪ লক্ষ টাকা খরচ হয়। বাজারে যদি উপযুক্ত দাম যেমন ১০০–১২০ টাকা পাওয়া যায়, তবে একই জমি থেকে ৯ থেকে ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আয় করা সম্ভব।
চাষিরা জানান, লাভজনক হলেও বিলাতি ধনিয়া চাষে কিছু রোগবালাইয়ের ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে ছত্রাকজনিত রোগের কারণে পাতার ওপর কালো দাগ পড়ে ফলন বিপর্যস্ত হয়। তবে সঠিক সময়ে ম্যানকোজেব ও কার্বেন্ডাজিম এৎড়ঁঢ়ং–এর ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করলে এই রোগ সম্পূর্ণ নির্মূল করা সম্ভব। তবে কৃষকদের আক্ষেপ, এই সম্ভাবনাময় ফসলের জন্য সরকারিভাবে কোনো সার–বীজ কিংবা বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা নেই। ইসলামপুর ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মিটন দাশ মাঠে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়ার সময় বলেন, ইসলামপুর ইউনিয়ন রাঙ্গুনিয়ার সবচেয়ে বড় পরিসরে বিলাতি ধনিয়া চাষাবাদ করা হয়। আমরা নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন করে কৃষকদের বিভিন্ন রোগ–বালাই সম্পর্কিত সঠিক পরামর্শ প্রদান করি। সরকারি কোনো আর্থিক প্রণোদনা না থাকলেও কোনো কৃষকের যদি কৃষি ঋণের প্রয়োজন হয়, তবে আমরা ব্যাংকগুলোতে কৃষক হিসেবে আমাদের পক্ষ থেকে সুপারিশ করে থাকি। এদিকে বেপারীদের দৌরাত্ম্যে ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ করছেন কৃষকরা। চলতি মৌসুমের শুরুতে এই দৈনিক হাটে বিলাতি ধনিয়া প্রতি কেজি ৮০ থেকে ১৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছিল। কিন্তু বর্তমানে চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। হঠাৎ করেই বাজারে বেপারীদের সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে। হতাশা প্রকাশ করে কৃষক মো. মুরাদ বলেন, বর্তমানে বেপারীদের দৌরাত্ম্যের কারণে মাত্র ৪০ থেকে ৫০ টাকা কেজিতে ধনিয়া বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছি আমরা। এই দামে বিক্রি করলে আমাদের খাটুনিই ওঠে না। হঠাৎ দাম পড়ে যাওয়ায় আমরা লাভ থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। কৃষি কর্মকর্তা বাবু মিটন দাশের মতে, এই বাজার সিন্ডিকেট ভাঙতে কৃষকদের নিজেদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, কৃষকরা যদি নিজস্ব সংগঠনের মাধ্যমে বেপারীদের ওপর নির্ভর না করে সরাসরি চট্টগ্রাম বা দেশের বড় বড় আড়তদারদের কাছে পণ্য বিক্রি করতে পারতেন, তবেই এই ফসলের ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হতো। রাঙ্গুনিয়ার সম্ভাবনাময় এই বিলাতি ধনিয়া চাষকে টিকিয়ে রাখতে এবং কৃষকের মুখে হাসি ফোটাতে সরকারি নজরদারির পাশাপাশি একটি সুশৃঙ্খল, মধ্যস্বত্বভোগী মুক্ত বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়া গড়ে তোলার দাবি স্থানীয় ভুক্তভোগী চাষিদের।












