নানা সমস্যায় জর্জরিত রাউজান উপজেলার ৫০ শয্যার স্বাস্থ্য কেন্দ্রে এখন মানুষের সেবা দান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, স্বাস্থ্য কেন্দ্রটির ‘স্বাস্থ্য’ খারাপ হয়ে গেছে। সেখানে রোগীদের স্বাস্থ্য সেবা আর কিভাবে প্রদান করবে? এখানে বিদ্যুৎ সরবরাহের বিকল্প হিসাবে রাখা জেনারেটরটি হয়ে আছে অকেজো। এই স্বাস্থ্য কেন্দ্রে পাঁচটি অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও তিনটি পড়ে আছে নষ্ট হয়ে। দুটি সচল থাকলেও চালক আছেন একজন। স্বাস্থ্য কেন্দ্রের বাইরে একটি টিনশেডের নিচে করোনা কাল থেকে অযত্নে পড়ে আছে কোটি টাকার বেশি দামের একটি লাইফ সাপোর্ট (আইসিইউ) অ্যাম্বুলেন্স।
স্বাস্থ্য কেন্দ্রের সাথে সংশ্লিষ্টরা বলেছেন দামি এই গাড়িটি এখানে আনার পর যেখানে রাখা হয়েছিল এখনো সেখানে পড়ে আছে। ব্যবহার করা হয়নি এক মুহূর্তের জন্যও। অনেকটা অভিভাবকহীন অবস্থায় পড়ে থাকা দামি এই অ্যাম্বুলেন্স সম্পর্কে খবর নিয়ে জানা যায় দুই হাজার সালের শেষের দিকে করোনা রোগীদের সেবাদানের জন্য এটি উপহার হিসাবে পাওয়া গিয়েছিল। স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে এটি ব্যবহারের জন্য কোনো উদ্যোগ না নেওয়ার কারণে সেটি এখন এক রকম পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে।
স্বাস্থ্য কেন্দ্রের একাধিক কর্মকর্তার সাথে কথা বললে তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, গাড়িটির রক্ষণাবেক্ষণ ও করণীয় নিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে একাধিকবার মতামত চাইলেও তাদের পক্ষ থেকে ইতিবাচক কোনো পরামর্শ এই পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় জনসাধারণ ও সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা যায়, স্বাস্থ্য কেন্দ্রটি নির্মাণকালীন ত্রুটির কারণে সারা বছর ধরে কেন্দ্রের চারপাশের পরিবেশ থাকে স্যাঁতস্যাঁতে। প্রতিটি ওয়ার্ডের সাথে থাকা নালাগুলো পানি ভর্তি থাকায় এখন পরিণত হয়েছে মশা মাছির প্রজননক্ষেত্রে। হাসপাতালের ডাক্তার ও কর্মচারীদের থাকার আবাসিক ভবনসমূহ এখন লতাপাতায় ঢাকা পড়েছে। বলা যায়, আবাসিক ভবনগুলো এখন ভূতুড়ে পরিবেশ আর সাপ বিচ্ছুর বিচরণ ক্ষেত্র। পরিদর্শন কালে দেখা যায়, বিশাল এলাকা জুড়ে থাকা এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সেবাদান কার্যক্রম চলে একতলা ভবনে। স্থানীয় জনসাধারণ স্বাস্থ্য কেন্দ্রটিরই ‘স্বাস্থ্য’ খারাপ হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেন। তারা বলেন, কেন্দ্রটিতে রোগীদের স্বাস্থ্য সেবা আর কিভাবে প্রদান করবে?
স্থানীয় জনসাধারণ ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রের সংশ্লিষ্ট লোকজনের সাথে কথা বলে জানা যায়, হাসপাতালের চতুর্দিকে রাস্তাঘাট উন্নয়নের আওতায় এনে উঁচু করা হয়েছে। আশেপাশের সব অবকাঠামোতে এসেছে পরিবর্তন। কিন্তু স্বাস্থ্য কেন্দ্রটির অবস্থান রয়েছে নিচু ভূমিতে। এই অবস্থায় পয়নিঃষ্কাশন অবস্থা বন্ধ হয়ে পড়েছে। একটু বৃষ্টি হলে স্বাস্থ্য কেন্দ্রের চৌহর্দ্দি মধ্যে ডুবে থাকে পানিতে। সারা বছর ধরে এই পানিতে সৃষ্টি হয় স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশ। কেন্দ্রের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে দেখা যায়, চিকিৎসাধীন থাকা রোগীদের খাটের নিচে বিড়াল দলের ছোটাছুটি। টয়লেটগুলো নোংরা, স্যাঁতস্যাঁতে, কোনোটির দরজা ভাঙা। ওয়ার্ডসমূহের দেয়াল ঘেঁষে থাকা নালা এখন মশা মাছি প্রজননের র্ঊ্বর ক্ষেত্র।
স্বাস্থ্য কেন্দ্রের নথিপত্র সংরক্ষণকারী এক কর্মচারীর সাথে কথা বলে জানা যায়, স্বাস্থ্য কেন্দ্রের পাঁচটি অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যে তিনটি অকেজো হয়ে দীর্ঘদিন পড়ে আছে। দুটি অ্যাম্বুলেন্স সচল থাকলেও চালক আছেন মাত্র একজন। পাঁচজন পরিচ্ছন্নতা কর্মীর জায়গায় আছে মাত্র দুইজন। বিদ্যুতের বিকল্প হিসাবে একটি জেনারেটর থাকলেও সেটি নষ্ট হয়ে আছে। অভিযোগ রয়েছে– স্বাস্থ্য সেবাদানকারী এই প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত কোনো চিকিৎসক এই পরিবেশের মধ্যে তাদের জন্য বরাদ্দ করা আবাসিক ভবনে থাকেন না।
স্বাস্থ্য কেন্দ্রের এমন পরিবেশ নিয়ে কথা বললে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাক্তার মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, এই প্রতিষ্ঠানে নতুন চিকিৎসক নিয়োগ পাওয়ায় আপাততঃ চিকিৎসক সংকট নেই। সংকট রয়েছে পরিচ্ছন্নতা কর্মীর। সার্বিক পরিবেশ সম্পর্কে তিনি বলেন, প্রয়োজনী সংষ্কার কাজ করতে হলে প্রয়োজনী অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে। পর্যাপ্ত বরাদ্দ না পাওয়ার কারণে এই সমস্যার মধ্যে থাকতে হচ্ছে। জেনারেটর, অ্যাম্বুলেন্স প্রসঙ্গে এই কর্মকর্তা বলেন, বিষেশায়িত অ্যাম্বুলেন্সটি বিষয়ে করণীয় জানতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মতামত চাওয়া হয়েছে। তিনি স্বীকার করেন পাঁচটি অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যে তিনটি অকেজো রয়েছে। দুটি সচল থাকলেও চালক আছেন একজন। জেনারেটর বিষয়ে বলেন, এটি নিয়ে তিনি সমস্যায় আছেন। সেটি নিজ পকেট থেকে ১০ হাজার টাকা খরচ একবার সচল করা হলেও কিছু দিন পর আবার নষ্ট হয়ে গেছে। এই অবস্থায় বিদ্যুৎ চলে গেলে চরম ভোগান্তির মধ্যে সেবা কার্যক্রম চালাতে হয় বলে তিনি জানান।













