রশীদ করীম : এক বিস্মৃতপ্রায় লেখক

বিচিত্রা সেন | শনিবার , ২৯ নভেম্বর, ২০২৫ at ৬:৩৬ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশের উপন্যাস সাহিত্যে রশীদ করীম এক উল্লেখযোগ্য নাম, যদিও বর্তমান প্রজন্মের কাছে তিনি হয়তো বা অচেনা। অথচ তাঁর গল্পউপন্যাস ছিল একসময় বাঙালি মননশীল পাঠকদের পছন্দের প্রথম সারিতে। রশীদ করীমের উপন্যাস নিয়ে বাংলাদেশে প্রথম কাজ করি আমি। আমার মাস্টার্সে গবেষণাপত্র ছিল ‘রশীদ করীমের উপন্যাসে নাগরিক মধ্যবিত্তের জীবনচিত্র।’ বিষয়টি আমাকে মনোনীত করে দিয়েছিলেন শ্রদ্ধেয় শিক্ষক প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক ড. মহীবুল আজিজ স্যার। আমার তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন শ্রদ্ধেয় ড. শিপ্রা দস্তিদার ম্যাডাম। ১৯৯৪ সালে আমি রশীদ করীমের একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করি। সেসময় রশীদ করীম গুরুতর অসুস্থ। কঠিন ব্যাধি তাঁকে করে দিয়েছিল পঙ্গু। থেমে গিয়েছিল তাঁর লেখনী। মানসিকভাবেও অনেকটা দুর্বল হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। প্রথমে তিনি সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হননি। পরে তাঁর অত্যন্ত প্রিয়বন্ধু কবি শামসুর রাহমানের অনুরোধে আমার সঙ্গে দেখা করতে রাজি হন।

অত্যন্ত সুদর্শন রশীদ করীম প্রথম দর্শনে মানুষকে জয় করে নিতে পারেন। শারীরিক অসুস্থতা তাঁকে পঙ্গু এবং কিছুটা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে দিয়েছিল। তিনি দু একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু বান্ধব ছাড়া কারো সঙ্গে দেখা করতে চান না। কেন মানুষকে এড়িয়ে চলেন এ প্রশ্নের উত্তরে উপন্যাসিক বলেন, কথা এখন গুছিয়ে বলতে পারি না। তাছাড়া অনেক সময় আবোল তাবোল কথা বলি, কখনো কখনো ভুল করে ভুল তথ্য দিয়ে বসি, এই জন্যই কারো সঙ্গে এখন আর দেখা করি না। শামসুর রাহমান না থাকলে তোমার সঙ্গেও দেখা করতাম না। কবি শামসুর রাহমান তাঁর অত্যন্ত প্রিয় মানুষ। কবির আন্তরিক সহযোগিতায় রশীদ করীম গল্প করার ফাঁকে ফাঁকে তাঁর নিজের সম্বন্ধে যে তথ্য দিয়েছেন তাই আমি তুলে ধরলাম।

১৯২৫ সালের ১৪ই আগস্ট শুক্রবার কলকাতার ৩০ নং ইউরোপিয়ান এসাইলাম লেনে রশীদ করীম জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আব্দুল করীম। রশীদ করীম কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিসটিংকশনসহ স্নাতক লাভ করে। তাঁর চাকরিজীবনের উদ্বোধন করেন আবুল মনসুর আহমদ সম্পাদিত পত্রিকায় প্রথমে সহসম্পাদক পরে সহকারী সম্পাদক হিসেব। এই সময় তিনি ছাত্র ছিলেন। ১৯৪৯ সালে তিনি আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানি ক্যালটেক্সে যোগদান করেন। কলকাতার সঙ্গে সমস্ত বন্ধন ছিন্ন করে একেবারে স্থায়ীভাবে ঢাকা চলে আসেন ১৯৫০ সালের ১৫ মার্চ। ক্যালটেক্স কোম্পানিতে কেটেছে তাঁর চাকরি জীবনের সুদীর্ঘ ২৫ বছর। ১৯৭৫ সালে তিনি পদ্মা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজারের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ১৯৮৪ সালে মেঘনা পেট্রোলিয়াম এর জেনারেল ম্যানেজার থাকাকালীন চাকরি জীবন থেকে তিনি অবসর নেন। এরই মাঝে ১৯৫৬ সালে তিনি সালিমা মুরশেদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের একমাত্র সন্তান নাবিলা ইংরেজি সাহিত্যের কৃতী ছাত্রী। রশীদ করীমের সাহিত্য চর্চা শুরু হয় স্কুল জীবন থেকে। ক্লাসের ফার্স্ট বয় তরুণের অনুরোধে রশীদ করীম জীবনের প্রথম গল্প লিখেন। গল্পটা গল্প হয়েছে কিনা এই নিয়ে তিনি বেশ দ্বিধা দ্বন্দ্বের মধ্যে ছিলেন। পরে পাশের বাড়ির এক সুন্দরী কিশোরী যার প্রেমে পড়েছিলেন রশীদ করীম তার দ্বারা অনুমোদিত হলে গল্পটি লেখক এর কাছে গল্পের মর্যাদা পায়। তবে এই গল্পটি লেখা হয়েছিল স্কুলের হাতে লেখা পত্রিকার জন্য। পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর প্রথম গল্প ‘আয়েশা’। এই গল্পটি ১৯৪২ সালে পত্রিকায় ছাপা হয়। গল্পটি সুধীমহলে বেশ প্রশংসিত হয়। লেখক নিজে স্বীকার করেছেন তাঁর এই গল্প লেখার পেছনে প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিল পাশের বাড়ির সুন্দরী মেয়েটি। এরপর ১৯৪২ থেকে ৪৬ সাল পর্যন্ত তিনি সওগাত, মোহাম্মদী, পূর্বাশা, নবযুগ, মিল্লাত প্রভৃতি পত্রিকায় নিয়মিত গল্প লিখেছেন। ১৯৪৫ সালে নবযুগের ঈদ সংখ্যায় তাঁর ‘একটি মেয়ের আত্মকাহিনী’ নামে একটি গল্প প্রকাশিত হয়। গল্পটি পড়ে বুদ্ধদেব বসু রশীদ করীমকে ডেকে পাঠান আলাপ করার জন্য। ‘পূর্বাশা’ সম্পাদক সঞ্জয় ভট্টাচার্য তাঁর পত্রিকায় লেখা পাঠাবার আহ্বান জানান। আবু সাঈদ আইউবের প্রশংসা পেয়েছিল রশীদ করীমের গল্প ‘একটি মেয়ের আত্মকাহিনী’। এ গল্পের জোরেই সিগনেট প্রেস এর উদ্বোধনী উৎসবে নিমন্ত্রণ লাভ করার সৌভাগ্য হয়েছিল তাঁর। ১৯৪২ থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত গল্প লেখায় তাঁর কলম বেশ সচল ছিল। এ সময় তিনি অল ইন্ডিয়া রেডিওর কলকাতা কেন্দ্রের ‘রবিবারীয় সাহিত্য আসরে’ গল্প পাঠ করেছেন। এই অনুষ্ঠানে তিনি ছিলেন প্রথম মুসলমান গল্প পাঠক। কিন্তু হঠাৎ করে ১৯৪৬ এ তিনি গল্প লেখা বন্ধ করে দেন। এরপর পঞ্চাশের গোড়ার দিকে সৈয়দ নুরুদ্দিনের অনুরোধে ‘সংবাদ’ এর জন্য এবং ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘মাসিক মোহাম্মদী’র জন্য দুটি গল্প লিখেন। তারপর অনেক বছরের নীরবতা। ১৯৬১ সালে ‘উত্তম পুরুষ’ নামক উপন্যাসের মাধ্যমে পুনরায় সাহিত্যাঙ্গনে আবির্ভাব ঘটে রশীদ করীমের। প্রথম উপন্যাসে পাঠক এবং সমালোচকের সপ্রশংস মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হন তিনি। উপন্যাসটি ১৯৬১ সালে আদমজী পুরস্কার লাভ করে ১৯৬১ থেকে ১৯৯৩ এই ৩২ বছরে রশীদ করীম রচনা করেছেন বারোটি উপন্যাস। সংখ্যার দিক থেকে তাঁর উপন্যাস নগণ্য হলেও তাৎপর্যের দিক থেকে তা নয়।

রশীদ করীম যে শুধু ছোট গল্প ও উপন্যাস লিখেছেন তা নয়। সাহিত্য সমালোচনাতেও দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। রবীন্দ্রনাথের একজন রসজ্ঞ অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ সমালোচক হিসেবেও তিনি বিদগ্ধজনের কাছে পরিচিত। ‘অন্য দৃষ্টিকোণ’ গ্রন্থেও তাঁর এই প্রতিভার পরিচয় সুস্পষ্ট। ‘অতীত হয় নতুন পুনরায়’ তাঁর রকমারি নিবন্ধ সংকলন। অনুবাদক হিসেবে ও তার সফলতার পরিচয় তিনি দিয়েছেন শেক্সপিয়র, রবার্ট ফ্রস্ট, স্টিফেন স্পেন্ডার এর কবিতা অনুবাদ করে। তাঁর একমাত্র গল্পগ্রন্থ ‘প্রথম প্রেম’(১৯৮৪)। অসুস্থ হওয়ার আগে তিনি পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখতেন। সাহিত্য সাধনায় মূল্যবান অবদান রাখার স্বীকৃতি স্বরূপ রশীদ করীম পেয়েছেন আদমজি সাহিত্য পুরস্কার, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ স্বর্ণপদক এবং ১৯৮৪ সালের রাষ্ট্রীয় একুশে পদক।

যে পারিবারিক পরিমণ্ডলে রশীদ করীম বেড়ে উঠেছেন, সেটাই তাঁকে সৃজনশীল লেখক হতে সাহায্য করেছে। ঔপন্যাসিকের সেজ ভাই প্রখ্যাত সাহিত্যিক আবু রুশদ এর সুবাদে তাঁদের বাসায় এক সময় আসর বসতো দেশের প্রখ্যাত লেখক কবি শিল্পীদের। কৈশোর পার না হতেই আবু সায়ীদ আইয়ুব, সৈয়দ মুজতবা আলী, সৈয়দ আলী আহসান কবি আবুল হোসেন, ফররুখ আহমেদ, আহসান হাবীবের মত বরেণ্য ব্যক্তির ঘনিষ্ঠ সাহচর্য তাঁকে মননশীল লেখক হতে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। রশীদ করীমের কলকাতার পার্ক সার্কাসের বাড়িটা সেই সময় বাঙালি মুসলমানদের সাহিত্যের মিলন স্থল ছিল। এই বাড়ির অসামপ্রদায়িক পরিবেশে বড় হওয়াতে রশীদ করীম তাঁর বিশিষ্ট মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী হতে পেরেছেন।

কৈশোর থেকেই দেশবিদেশের প্রচুর বই পড়ে, সাহিত্যিক আড্ডা দিয়ে রশীদ করীম লাভ করেছিলেন প্রকৃত নাগরিক রুচি। খেলাধুলার প্রতি রয়েছে তাঁর আগ্রহ। ক্রিকেট তাঁর অত্যন্ত প্রিয় খেলা এবং ক্রিকেটার মুসতাক আলী তার অত্যন্ত প্রিয় খেলোয়াড়। ক্রিকেট দেখতে কিংবা শুনতে যেমন তাঁর ভালো লাগে, তেমনি ভালো লাগে ক্রিকেট সম্পর্কে বইপত্র সাময়িকী পড়তে। স্কুল জীবনের বাঁপায়ী চৌকস ফুটবলার রশীদ করীমের ফুটবল খেলাও ভালো লাগে। রবীন্দ্র সংগীত তাঁকে আকর্ষণ করে গভীরভাবে। সাহিত্য, সংগীত, খেলাধুলা ছাড়া ইতিহাস এবং রাজনীতি নিয়ে আলোচনায় তিনি গভীর আগ্রহী।

সমকালীন অন্যান্য লেখকের তুলনায় তার উপন্যাসের সংখ্যা কম কেন এ কথা জিজ্ঞেস করা হলে বললেন, বিশ্বের কোন বড় লেখকই বেশি উপন্যাস রচনা করেননি হয়তো বৃহৎ ঔপন্যাস রচনা করেছেন, আবার ছোট ছোট উপন্যাসও রচনা করেছেন অনেকে। তাছাড়া কম তো লিখিনি। বারোটা উপন্যাস কি কম? তার উপন্যাসে পুরুষ চরিত্রগুলোকে নিষ্প্রভ করে দিয়ে নারী চরিত্রগুলো উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে এই মত স্বীকার করেন কিনা জিজ্ঞেস করা হলে উপন্যাসিক তা স্বীকার করলেন। তাঁর নায়িকারা অস্থির চিত্তের, এতে কি বাস্তব জীবনের কেউ ছায়া ফেলেছে? এই প্রশ্নের জবাবে কবি শামসুর রাহমান হ্যাঁ সূচক উত্তর দিলেও রশীদ করীম এ প্রশ্নের জবাব দেবেন না বলে জানালেন। তাঁর উপন্যাসের বেশ কয়েকজন নায়িকা ভালোবেসে বিয়ে করে সুখী হতে পারেনি। তবে কি লেখক প্রেমের বিয়েকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখেন? এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বললেন প্রেম সম্পর্কে আমার নির্দিষ্ট কোন মত নেই। তোমার কথা যেমন সত্য আবার আমার অনেক নায়িকা পারিবারিক পছন্দের বিয়েতে সুখী হতে পারেনি। সুখী হওয়াটা ভাগ্যের ব্যাপার। তাঁর উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ পরোক্ষভাবে এসেছে। সরাসরি মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব আসেনি কেন? এ প্রশ্ন করলে তিনি বলেন যেহেতু তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব দেখার সুযোগ পাননি ওই সময় তাকে অবরুদ্ধ ঢাকায় চাকরি করতে হয়েছে তাই তাঁর পক্ষে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সরাসরি লেখা সম্ভব হয়নি। যা লেখা হয়েছে তা পরোক্ষভাবে এবং এতে অবরুদ্ধ ঢাকাই বারবার এসেছে। এই সময়ে শামসুর রাহমান বললেন, হানাদার বাহিনীর কবলে অবরুদ্ধ থাকাটাও মুক্তিযুদ্ধের একটি অংশ। লেখকের নায়কদের মাঝে কি লেখক এর ছায়া পড়েছে এই প্রশ্ন করা হলে তিনি উত্তর দিবেন না বলে জানালেন। এ প্রশ্নের মাধ্যমে আমার সাক্ষাৎকার পর্ব শেষ হয়।

লেখক: প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকোমর ব্যথার রোগীদের সচেতনতা জরুরি
পরবর্তী নিবন্ধহল্যান্ড থেকে