রবীন্দ্র-সংগীত

প্রসঙ্গে ভাববার কথা

| শুক্রবার , ১৩ মে, ২০২২ at ৬:৩০ পূর্বাহ্ণ

‘এক্ষণ’ পত্রিকায় সত্যজিৎ রায় লিখিত ‘রবীন্দ্রসংগীতে ভাববার কথা’ শীর্ষক প্রবন্ধের সূত্রে ‘আজকাল’ পত্রিকায় (২৯ মার্চ ১৯৮১) সুভাষ চৌধুরী একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। মাত্র ক’দিন আগে পার হওয়া রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সত্যজিৎ রায়ের জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আজাদীর সাহিত্য পাতার জন্য সেই বিশেষ সাক্ষাৎকার সামান্য সংক্ষেপিত আকারে পুনঃমুদ্রণ করা হলো

সুভাষ চৌধুরী: আপনি বলেছেন, ‘রবীন্দ্র-সংগীতের একটা স্বকীয় বৈশিষ্ট্য আছে সেটা আগে কোন ভারতীয় গানে ছিল না’- সেই বৈশিষ্ট্য কি?
সত্যজিৎ রায়: এমন অবস্থা কল্পনা করা খুব কঠিন যখন কোনো রামপ্রসাদী বা কীর্তন গান ছিল না, একজন এসে এইসব গান শুরু করে দিলেন। ওগুলো অবশ্য চিরকালই ছিল বলে আমরা ধরে নিই। কেউ এসে তৈরি করেছেন ভাবতেই অসুবিধা লাগে, অস্বস্তি লাগে কারণ সেগুলো সকলের চেনা, এতো পুরনো এমন সহজ সরল। কিন্তু কম্পোজার বলতে আমাদের যা অভিজ্ঞতা অর্থাৎ ছেলেবেলা থেকে যে-সব গান শুনে এসেছি যেমন থিয়েটারের গান, ব্রহ্মসংগীত- তা সবই মোটামুটি রাগাশ্রয়ী যা শুনলে প্রথমে সেই রাগটার কথা মনে করিয়ে দেয়, কোনো বিশেষ ব্যক্তির কথা অর্থাৎ গীতিকার বা সুরকারের কথা মনে করায় না। কথাটাকে সুরের ছাঁচে ঢেলে ফেলা হয়েছে। থিয়েটারের গান যা শুনেছি- মনে হতো এটা বাঙলা গান তবে রাগাশ্রয়ী ব্যক্তিগত সুরকারের যে খুব একটা বৈশিষ্ট্য সেখানে লক্ষ্য করেছি অর্থাৎ যার থেকে গানের সঙ্গে সঙ্গে সুরকারের নামটাও মনে গেঁথে যায়- আমার মনে পড়ছে না। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের গানে বারবার আমরা দেখতে পাচ্ছি তার কথার মেজাজ সুরের মেজাজ রাগাশ্রিত হলেও সেখানে আর একটু সহজ করে নেওয়া, মোলায়েম করে নেওয়া। পরের দিকের গানগুলোতে যে রূপ আরও স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়েছে। অর্থাৎ আলাদা করে চিনে নেবার মতো। কম্পোজারকে চিনে নেবার মতো। সারাজীবন ধরে ক্রমান্বয়ে গান রচনা করে গেছেন এমন উদাহরণও তো বিশেষ নেই। শুধুমাত্র আউটপুটের জোরেই তিনি একটি স্থান করে নিয়েছেন। অবশ্য নানা ধরনের প্রয়োজন নানা অনুপ্রেরণা তিনি পেয়েছিলেন বলেই তাঁর বৈশিষ্ট্য ক্রমশ ফুটে উঠেছে।

সুভাষ চৌধুরী: আপনি বলেছেন বাঙলা রাগসংগীত কীর্তন রামপ্রসাদী লোকসংগীত বা নিধুবাবুর টপ্পায় যে বাঙালী ভাব এটা(রবীন্দ্র-সংগীত) সে ভাবে নয়। এটা হলো রবীন্দ্রনাথের একান্ত নিজস্ব একটি বিশেষ শ্রেণীর বাঙালিয়ানার সাংগীতিক প্রকাশ। এটা কেন বলছেন?
সত্যজিৎ রায়: রবীন্দ্রনাথের পরিবেশ তো নিধুবাবুর পরিবেশ নয়। সেখানে তার মধ্যে তার সংস্কার, তার ঔদার্য, নানা রকমের জিনিসকে নিজের মতো করে নেবার ক্ষমতা- তা দেশি-বিদেশি সব সুরের ক্ষেত্রেই আর শুধু সুরেই নয় তার বাণীতেও তা প্রকাশ পেয়েছে। তাঁর পরিবেশ ছিল অনেক মার্জিত। সেটা ঠাকুরবাড়ির পরিবেশ অর্থাৎ যে সমােেজ তিনি মানুষ তার যে একটা ছাপ রয়েছে তা আরও একটু মার্জিত। সেটা হচ্ছে ঠাকুরবাড়ির রীন্দ্রনাথের গানের মেজাজ যেটা কথা আর সুর মিলিয়েই আসছে। সেটার সঙ্গে নিধুবাবুর টপ্পার মিল নেই। সেটা শ্রেণী অর্থাৎ সোস্যাল ক্লাস। সেই গানের কথা ও সুর শুনলেই বোঝা যাবে নিধুবাবু আর রবীন্দ্রনাথ এক সামাজিক স্তর থেকে আসেন নি। এটাই বলার উদ্দেশ্য।

সুভাষ চৌধুরী: প্রসঙ্গত এই প্রশ্ন তাহলে এসে পড়ে রবীন্দ্রনাথের গান সাধারণের মধ্যে অর্থাৎ জনসাধারণ বলতে আমরা যা বুঝি তার মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে না। এই দীর্ঘ দিনেও প্রায় শহর-কেন্দ্রিক হয়ে রইল সে কি কেবল এই কারণেই?
সত্যজিৎ রায়: সেটা ঐ কারণেই। কোনো দিনই হবে না। সমাজ যদি কোনোদিন এক হয়ে যায় তবে হবে। কিন্তু গ্রাম সমাজ ও শহর সমাজের মধ্যে প্রচণ্ড একটা তফাৎ তো রয়েই গেছে। গ্রাম সমাজ কিছুটা কিছুটা করে শহরের দিকে এগিয়ে আসছে তা বলে এমন তো হয় নি দুটো প্রায় একাকার হয়ে গেছে। শিক্ষাদীক্ষারও অনেক তফাৎ রয়ে গেছে। সেইজন্য আমার মনে হয় রবীন্দ্রনাথের গান শিক্ষিতদের গান। কারো বিচ্ছিন্নভাবে একটা সুর ভাল লাগল তিনি গুনগুনিয়ে গাইলেন সেটা স্বতন্ত্র কথা। কিন্তু যাকে বলে নিজের করে নেওয়া, যা নিজের মনে করে গাওয়া, সেটা শিক্ষিত বাঙালীর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। আমার সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। অন্তত এতদিন তো তাই দেখছি।

সুভাষ চৌধুরী: আপনি বলছেন গানই তাঁর একমাত্র সৃষ্টি যার পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে কাব্য উপন্যাসের তুলনায় বিবর্তনের মাত্রাটা এতে অনেক কম। একথা কি আপনি আজও মনে করেন?
সত্যজিৎ রায়: না। বদলেছে আবার বদলে গিয়ে যা হয়েছে সেটা চেঞ্জড বটে কিন্তু ইভোল্যুসন ওটাকে বলে- যেটা নৌকাডুবি বা শেষের কবিতায় যে পরিমাণ তফাৎ সেই তফাৎ গানে নেই। এ ক্ষেত্রে পরিমাণগত তফাতের কথাই উল্লেখ করতে চেয়েছি।

সুভাষ চৌধুরী: দুশো বছর আগের হিন্দুস্থানী সংগীতের শাস্ত্রসম্মত ও শিল্পগুণ-সম্পন্ন বিস্তারের যদি স্বরলিপি থাকত, আর আজকের দিনের ওস্তাদ যদি তা অবিকলভাবে আসরে পরিবেশন করতেন, তাহলে রবীন্দ্রনাথ কী বলতেন? অর্থাৎ নিজের সুর হুবহু গাইতে হবে?

সত্যজিৎ রায়: হ্যাঁ। কম্পোজার বলেই বলছি যেখানে কম্পোজ করার প্রশ্নটা আসছে। যাঁরা রাগের রূপটি নির্ণয় করে গেছেন তাঁদের একরকম কম্পোজার বলতে পারেন। গোড়ার যুগে তানসেন, বৈজু বাওরা যে স্ট্রাকচার কম্পোজ করে গেছেন তারপর গাওয়ার সময় থিওরির মধ্যেই সে স্বাধীনতা দেওয়া আছে। সেখানে কতকগুলো নিয়ম রক্ষা করে নিজের নিজের মতো বিস্তার করতে হবে। এখানে বিস্তারের প্রশ্ন তো আসছে না। এখানে উনি বিদেশী অর্থে কম্পোজার, যে অর্থটার আগে এখানে খুব বেশি ব্যবহার হয়নি। অর্থাৎ যেভাবে আমি কল্পনা করেছি, যেভাবে সেটাকে স্বরলিপিবদ্ধ করেছি, সেভাবেই গাইতে হবে। ঊনিশ বিশ হয় কিন্তু বিদেশী সুরকার পিয়ানোর সঙ্গে সংগীত লিখে যান, সেখানে একচুল এদিক-ওদিক করবার উপায় নেই। ইন্টারপ্রিটেটিভ স্বাধীনতা কেউ একটু সুরের দিক থেকে কেউ একটু স্ট্রেস-এর দিক থেকে নিতে পারে। মেট্রোনমিক লয় হুবহু কেউ অনুসরণ করেন না। অল্প-বিস্তর ধরুন শতকরা ২০ ভাগ স্বাধীনতা নিয়ে থাকেন প্রায় সকলেই। কেননা স্বরলিপিতে হুবহু লয় নির্ধারণের কোনো ব্যবস্থা কোনো পদ্ধতিতেই নেই। গায়কের অল্প-বিস্তর স্বাধীনতা সেখানে থাকবেই। অর্কেস্ট্রা-বহুল গানেই বলুন সেখানে গায়ক কি করছেন তার বিচার সেটুকুর মধ্যেই; কারণ অর্ধেকের বেশি কাজ করে দিয়ে গেছেন কম্পোজার নিজে। একে শুধু গেয়ে দেখাতে হচ্ছে। রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে অতোটা আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা নিয়ম নেই কারণ তিনি তো কোনো সঙ্গত-এর নির্দেশ দিয়ে যান নি। তিনি শুধু গান হিসেবেই লিখে দিয়ে গেছেন। যখনই তার সঙ্গত-এর প্রশ্ন উঠবে, যখনই তার একটুখানি বিরতির প্রশ্ন উঠবে সেখানে খানিকটা তো অদল-বদল হয়ে যাবে। শাস্ত্রীয় সংগীতে গায়কের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বলে কিছু নেই। তা থাকতেই পারে না। সেটাই ধর্ম। রীতি মানছি বলে উদ্ধার করছি তা নয়। সেখানেও প্রচণ্ড স্বাধীনতা রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ আপত্তি করেছিলেন, একই জিনিস গেয়ে যাবে কেন? আসলে উনি গান হিসেবে ভেবেছেন বলে বলেছেন। হয়ত ছেলেবেলায় তাঁকে আমাদের মতো ঘন্টার পর ঘন্টা রাগসংগীত শুনতে হয় নি। রবীন্দ্রনাথকে সম্ভবত পারিপার্শ্বিক চাপে তেমন করে আসরে গিয়ে গান শুনতে হয়েছে কিন্তু সেটার মধ্যে অনেক তফাৎ। ঘটনাচক্রে অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর ঐভাবে গান শোনার অভ্যাস গড়ে ওঠে নি। কেউ ভালো রাগসংগীত গাইছে বলে আগ্রহ করে তার গান ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে তিনি শুনেছেন বলে তো জানা নাই। বড়জোর কোনো একজন ভালো গাইয়ে বা বাজিয়েকে তাঁর কাছে এনে বলা হয়েছে ইনি ভালো গান, এঁর গান শুনুন ইত্যাদি। তাই ঐ অভ্যাস তাঁর গড়ে ওঠে নি। যদুভট্টের গান তিনি শুনেছেন কিন্তু তার বিস্তার সহযোগে খেয়াল গান কি তেমন করে শুনেছেন?

সুভাষ চৌধুরী: ‘রবীন্দ্রনাথ কথার সঙ্গে সুরের অর্ধনারীশ্বর সম্পর্কে’র কথা বলেছেন। সাধারণত সব দেশে সব কালেই গানের কথাকে সুরের বাহন হিসেবে মনে করা হয়। অর্থাৎ সুর্‌ই কথাকে চায়। রবীন্দ্রনাথের গানের পরিপ্রেক্ষিতে আপনার এই বক্তব্য কতখানি প্রযোজ্য?

সত্যজিৎ রায়: আমার কাছে এই জিনিসটা খুব পরিষ্কার। কথা সুর মিলিয়েই তো গান। যেহেতু এটা গান- কবিতা নয় তাই অবশ্যই সুরের প্রাধান্য বেশি। সুরটা বেরোচ্ছে কথা থেকে। এমন অনেক সময় দেখা যায় যদি রাগাশ্রয়ী গান হয় দুটো সম্পূর্ণ আলাদা ভাবের গান কথার দিক দিয়ে বিচার করলে কিন্তু একই রাগের ছাঁচে ঢেলে ফেলা হয়েছে।

সুভাষ চৌধুরী: ‘শুনেছি রবীন্দ্রনাথ সুকণ্ঠ ছিলেন। তিনি নিজেও একথা বলেছেন। তাঁর ছেচল্লিশ বছর বয়সে গাওয়া গ্রামোফোন রেকর্ডের বন্দেমাতরম্‌ গানে এর প্রমাণ আছে। কিন্তু এ গান শুনলে এটাও বোঝা যায় যে তাঁর গলার ‘‘কাজ’’ খুব বেশি ছিল না। অন্তত যে কাজে খেয়ালের তান হয়, তাতো নয়ই।’ -এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে এ কথা কি বলা যায় এই জন্যই রবীন্দ্রনাথের গানে তানের পরিমাণ অনুল্লেখ্য।

সত্যজিৎ রায়: কথাটা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না কেননা তান প্রয়োগ করলেই সেটা যে রাগাশ্রয়ী হয়ে যাবে বা রাগের অনুকরণ হবে তার তো কোনো মানে নেই। কিন্তু আমার মনে হয়েছে যে গান তাঁর গলায় আসছে এবং ক্রমে ক্রমে সেটাই কিন্তু রীতিতে দাঁড়িয়ে গিয়েছে যে তানটা কম। তান বলতে যেটা বোঝায় তা দক্ষিণী সুর-ভাঙা দু-চারটি গান যা করেছেন ‘বাজে করুণ সুরে’ সেখানে যেহেতু সুরটা ঐ রকম ছিল, সেই সুরের কথাটা সংযোগ করে যে গান তিনি রচনা করলেন তাতে তান রয়ে গেল। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ নিজের থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যে গান রচনা করেছেন তার মধ্যে তান খুবই কম। রবীন্দ্রনাথের নিজের গাওয়া বন্দেমাতরম্‌ শুনে আমার এই সিদ্ধান্ত।

সুভাষ চৌধুরী: এই প্রসঙ্গেই আপনি দুটি গানের ‘পথহারা তুমি পথিক যেন গো’ এবং ‘পরবাসী চলে এসে ঘরে’ উল্লেখ করে দ্বিতীয় গানটি সম্পর্কে বলেছেন এ গান রাগসংগীতের কথা মনে করায় না- এ খাঁটি রবীন্দ্র-সংগীত-কেন?
সত্যজিৎ রায়: ভালো-খারাপের প্রশ্ন ছেড়ে দিলে ‘পরবাসী চলে এসে ঘরে’ টাই রবীন্দ্র-সংগীত, কারণ ও-ধরনের গান কেউ আগে লেখেন নি ওটা উনিই লিখেছেন।
সুভাষ চৌধুরী: ‘রাগের এই অপ্রতিভ চেহারাটা অনেক রবীন্দ্র-সংগীতে পাওয়া যায়’-আমার বিশ্বাস এই ‘অপ্রতিভ চেহারা’ আপনি সচেতনভাবেই ব্যবহার করেছেন। কিন্তু কেন?

সত্যজিৎ রায়: রাগের কথা মনে করেই বলেছি। রাগের যে অন্তর্নিহিত সম্ভাবনা তার কথা মনে করেই বলেছি। রাগ মিশ্রনের প্রশ্ন উঠছে না। সে কথা আমি বলি নি। আমি বলেছি রাগের চেহারা কেমন ন্যাড়া হয়ে যায়। সুরগুলো লাগছে কিন্তু সুরের মধ্যে শ্রুতিগুলো লাগছে না তাই রাগের চেহারা এখানে ম্লান হয়ে যায়।
সুভাষ চৌধুরী: যদি একজন রাগসংগীতে প্রকৃত শিক্ষক এবং পারঙ্গম শিল্পীকে স্বাধীনতা দেওয়া যায় এবং তাহলে তার প্রবণতা রাগরূপের প্রতি যদি বেশি প্রকাশিত হয় সে ক্ষেত্রে গান হিসেবে রবীন্দ্র-সংগীতে তাঁর কণ্ঠে উপযুক্ত মর্যাদায় রূপগ্রহণ নাও করতে পারে তো?

সত্যজিৎ রায়: সেখানে অনেকখানি গায়কের উপর নির্ভর করতে হবে। বেশ-কিছু গান আছে যা এক-একজনের গলায় শুনলে আমার মনে হয়, এখানে আর একটু মেজাজ এলে ভালো হয়। গানের কথা যেভাবে গাইলে আরো বেশি খোলে, সুরগুলো যেভাবে লাগাচ্ছেন, তাতে যেন রূপ খুলছে না। উনি যেন ধরেই রেখেছেন ‘আমার গান ঘরে ঘরেই গাওয়া হবে’ আর তাই এই দিকটার কথা উল্লেখ করেন নি। তবে উনি তো কথা কম বলতেন, কার গান শুনে কি বলেছেন, বললেও তা কী অর্থে বলেছেন- তা তো সব সময়ে জানা যায় না। ‘বেশ ভালো হয়েছে’ বলছেন কিন্তু দেখা যাবে তার মধ্যে খানিকটা ক্ষোভ রয়েছে। তা সত্ত্বেও উনি এই কথা বলছেন কারণ সমালোচনা করার প্রশ্ন আসছে, তখন সেখানে তর্কের প্রশ্ন তলিয়ে দেখা প্রশ্ন এসে যাচ্ছে। উনি সেটি বোধহয় এড়িয়ে গেছেন। অর্থাৎ মোটামুটি সুরে তালে গাইছেন মিষ্ট কন্ঠ তাকেই ভালো গলা বলেছেন।

সুভাষ চৌধুরী: কোরাস গান সম্পর্কে এখানে আপনার কাছে আলাদাভাবে প্রশ্ন রাখছি। কোরাস গানের মান কি আগের চেয়ে উন্নত হয় নি?
সত্যজিৎ রায়: আমার গান শোনার অবকাশ আজকাল কমে গেছে তাই এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সহজ নয়। তবে এটুকু বলতে পারি যে ছেলেবেলায় আমার নিজের বাড়িতে আত্মীয়স্বজনদের গলায় গাওয়া যে কোরাস শুনেছি এবং ব্রাহ্ম সমাজে মাঘোৎসবে যে কোরাস শুনেছি, তার চেয়ে ভাল কোরাস আজকাল গাওয়া হয় কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ আছে।

সুভাষ চৌধুরী: রবীন্দ্রনাথ-প্রবর্তিত নতুন তালগুলির প্রসঙ্গে আলোচনায় আপনি বলেছেন, ‘কেন এমন অসাংগীতিক তালে উদ্ভব করলেন’?
সত্যজিৎ রায়: এই ধরনের গানগুলো কি খুব প্রচলিত হয়েছে? তুলনামূলকভাবে বিচার করলে দেখবেন অন্যান্য গানের মতো ততটা জনপ্রিয়তা পায়নি। এইসব তালে নিবদ্ধ গানগুলোর যতির অভাব, কেবল গাণিতিক দিকটির প্রতি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়াই হয়। তাতে কি কোন সৌন্দর্য সৃষ্টি হয়?
সুভাষ চৌধুরী: রবীন্দ্রনাথের গানে ‘‘এই যে বকুল পারুল চাঁপা টগর চামেলির সম্ভার, এই যে শরতের আলো, ফাল্গুনের রঙ, বরষার গুরু গুরু বসন্তের হাওয়ার হিল্লোল যা যা মনের দোলায় দেয় দোল, এই যে মনের বীণায় সুরের পরশ, হৃদয়ের তন্ত্রীতে বেদনার ঝংকার- এই যে দূরে যাওয়া কাছে আসা আধো চাওয়া আধো হাসা- এও কি ‘কৈসে পনিঘট জাঁউ’ আর ‘পিয়া পিয়া পাপিয়া’ আর ‘ভরু ভরু আঈ আঁখিয়া’র মতোই ফরমূলা নয়, ক্লিশে নয়- আজকের দিনে ঠুংরির গানের কথার মতোই যা অর্থহীন? এ কথায় বিদ্রোহের ছাপ কোথায়?’’

সত্যজিৎ রায়: না। কিন্তু মিড্‌ল পিরিয়ডের আনেক গানের সুর আগে এসেছে। সেক্ষেত্রে অনেক গান প্রসঙ্গে আমার বক্তব্য জাস্টিফাই করা যায় তবে সামগ্রিক বিচার শেষের দিকের গান সার্থক এ কথা বলা যায় না। এমন দু-একটা মন্তব্য পাবেন, কারণ লেখাটার সময় রবীন্দ্রসংগীতের সামগ্রিক চর্চার সুযোগ বা সময় ছিল না।
সুভাষ চৌধুরী: আপনি রবীন্দ্রনাথের গানের স্বরলিপি প্রসঙ্গে কতকগুলো প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন এবং ‘আমি চিনি গো চিনি তোমারে’ গানটার জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, দিনেন্দ্রনাথ এবং সরলা দেবীর স্বরলিপি পাশাপাশি রেখে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের স্বরলিপির পক্ষে মতামত ব্যক্ত করেছেন। সাধারণ গায়কের পক্ষে কি এইভাবে স্বরলিপির এই তফাৎটুকু বিচার করা সম্ভব।

সত্যজিৎ রায়: আমার মতে বিচার করার প্রশ্নই ওঠা উচিত নয়। স্বরলিপি একটাই থাকা উচিত। অবশ্য যা হয়ে গিয়েছে তা তো রাখতেই হবে।
সুভাষ চৌধুরী: নমুনা হিসেবে ‘মন্দিরে মম কে’। প্রথম ছত্রটিতে কয়েকটি অলংকরণ যোগ করে আপনি স্বরলিপির মধ্যে গায়কীর নমুনা রাখতে চেয়েছেন। তা কি সাধারণ গায়কের সাধ্যাতীত নয়?

সত্যজিৎ রায়: রবীন্দ্রনাথের গান মাঝারিদের মধ্যেই থাকছে। অথচ মাঝারিদের কর্ম নয়। দুটো জিনিস একসঙ্গে চাইছি বলেই এই গণ্ডগোল। জিনিসটার খুব বেশি প্রচার যদি চাই তাহলে আসল রূপ প্রকাশিত হবে এমন মনে করার কোনো কারণ নেই। কাজেই দুরকমই চলতে থাকলে এক-একজন প্রতিভাধর গায়কের কণ্ঠে এক-একটি গানের আশ্চর্য রূপ দেখতে পাব। আর তারই সংস্করণ দেখব সাধারণ গায়কদের মধ্যে এক-একজন প্রতিভাধর গায়কের গলায় আমরা আসল চেহারাটা, সুন্দর চেহারাটা বা শ্রেষ্ঠ চেহারাটা পাব যা অন্যদের ক্ষেত্রে পাব না। আর একটি জিনিস, রবীন্দ্র-সংগীত এখন যে ঘরে-ঘরে চলছে সেই ঘরে-ঘরে গাওয়াটাকে তো আমরা প্রামাণ্য বলে ধরতে পারি না।

সুভাষ চৌধুরী: কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে সাধারণ শ্রোতা তো জনপ্রিয় শিল্পীর কণ্ঠে গান শুনতে চাইছেন। এক্ষেত্রে জনপ্রিয় শিল্পীর কণ্ঠে কিছু সাদামাটা রূপ পরিবর্তন হলে সেক্ষেত্রে অবস্থা কি দাঁড়াচ্ছে?

সত্যজিৎ রায়: আপনি যে প্রশ্ন তুলেছেন তা সব আর্ট-এর একদম গোড়ার প্রশ্ন। তার মানে লোয়েস্ট কমন ডিনোমিনেটর-এর কাছে তার কি পছন্দ সেটা বাজারে চলবেই। কিন্তু রাগসংগীত যিনি শুনতে যাচ্ছেন তিনি তো নির্বাচন করেই যেতে পারবেন। রবীন্দ্র-সংগীতের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অন্যকথা। খুব সাধারণ লোকেরা তো জনপ্রিয় গায়কের গানটাই পছন্দ করবে- এটা তো পাশাপাশি থাকবেই। এটার কোন রাস্তা নেই। কোন সমাধান আছে বলে তো আমার মনে হয় না।
এখন সব স্কুলে যেখানে রবীন্দ্র-সংগীত শেখানো হয় সে-সব স্কুলে যদি পরিষ্কার ভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয় এটা পপুলারভাবে গাওয়া এবং আসল ভাবে গাওয়া। এই ভাবেই গানটা সবচেয়ে বেশি ফুটবে এই তফাৎটা তারা যদি ধরিয়ে দিতে পারেন সেখানে তেমন উপযুক্ত শিক্ষক যদি থাকেন, তাছাড়া আর কি করে হবে।
সুভাষ চৌধুরী: আপনি এরপরে উচ্চারণের প্রশ্নটা তুলেছেন। খুবই সঙ্গত প্রশ্ন। কিন্তু আগের তুলনায় এখন কি উচ্চারণ অনেক উন্নত হয়েছে বলে আপনার ধারণা?
সত্যজিৎ রায়: তফাৎ হয়েছে বলে আমার মনে হয় না। সকলের উচ্চারণ শুনে আমার মোটেই ভাল মনে হয় না। স্পষ্ট উচ্চারণ অনেকেই করেন না। খুব অল্প কয়েকজনই করেন। এমন কি যাঁরা বেশ ভালো গাইয়ে হিসেবে প্রতিষ্ঠিত তাদের অনেকেরই উচ্চারণ খুব স্পষ্ট নয়। আগেকার দিনের উচ্চারণ কিন্তু তুলনায় অনেক ভাল ছিল অর্থাৎ উচ্চারণের মধ্যে এতটা আড়ষ্টতা ছিল না। সাধারণভাবে বাচনভঙ্গির অবনতি ঘটেছে ফিল্মে। অভিনয় করাতেই তো ছেলেমেয়েদের কথার অনেক ত্রুটি পাই। উচ্চারণ সম্পর্কে সচেতনতা অনেক কমে গেছে। আগে থিয়েটারের শিক্ষায় উচ্চারণ একটা অঙ্গ ছিল এখন সে পরিমাণে নেই যা গানেও রিফ্লেক্টেড হচ্ছে।
সুভাষ চৌধুরী: আপনি একবার একটা ইন্টারভিউ-এ বলেছিলেন যে পারফরমার ইজ নেভার গ্রেটার দ্যান মিউজিক। রবীন্দ্রনাথের গান ক্ষেত্রে এখন কি তাই হচ্ছে বরং উল্টোটাই তো দেখছি।

সত্যজিৎ রায়: রবীন্দ্রনাথের গানের ক্ষেত্রে তা হচ্ছে না এইজন্য যে বিদেশে সংগীত পরিবেশনার মান খুবই উঁচু। সেখানে কি বাজছে লোকে সেটাই তাই আগে দেখে। যিনিই বাজান-না কেন তার উৎকর্ষ একটা মোটামুটি থাকবে। রবীন্দ্রনাথের গানের ক্ষেত্রে পারফরম-এ আকাশ পাতাল তফাৎ। কারণ ‘মরি লো মরি’ শুনব যখন অমিয়া ঠাকুরের গলায় তা শুনতে চাইব। সেই যে জোড়াসাঁকোর বাড়িতে শুনেছি দাঁড়িয়ে গাইতেন। আজও আমার কাছে তা স্মৃতি হয়ে আছে।
কৃতজ্ঞতা: চিত্রভাষা গ্যালারি’র আর্কাইভ থেকে লেখাটি সংগ্রহ করা হয়েছে।