রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য থেকে জানা যায়, জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি সময়ে তৈরি পোশাক খাত থেকে মোট রপ্তানি আয় হয়েছে দুই হাজার ৫৮০ কোটি মার্কিন ডলার। এ সময় ইইউতেও রপ্তানি কমেছে ৫.৪৯ শতাংশ। তবে সবচেয়ে হতাশাজনক হলো, উদীয়মান বাজারেও কমছে রপ্তানি আয়। ইপিবির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির সবচেয়ে বড় গন্তব্য ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (ইইউ)। আলোচ্য সময়ে ইইউভুক্ত দেশগুলোতে রপ্তানি হয়েছে এক হাজার ২৬৯ কোটি ডলারের পোশাক, যা মোট পোশাক রপ্তানির ৪৯.১৮ শতাংশ। তবে এই বাজারে সাড়ে ৫ শতাংশের মতো রপ্তানি কমেছে। ইউরোপের কয়েকটি বড় বাজারে খুচরা বিক্রি কমে যাওয়া এবং ক্রেতাদের অর্ডার কমানোর প্রবণতার প্রভাব এতে পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার যুক্তরাষ্ট্র। চলতি অর্থবছরের জুলাই–ফেব্রুয়ারি সময়ে দেশটিতে রপ্তানি হয়েছে ৫০৩ কোটি ডলারের পণ্য, যা মোট রপ্তানির ১৯.৫০ শতাংশ। তবে এই বাজারেও সামান্য পতন দেখা গেছে; আগের বছরের তুলনায় রপ্তানি ০.৭৪ শতাংশ কমেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চ সুদের হার ও মূল্যস্ফীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তাদের ব্যয় কমে যাওয়ায় পোশাকের অর্ডার কিছুটা কমেছে। তবে কয়েকটি বাজারে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। কানাডায় এই সময়ে পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৮৭ কোটি ১৫ লাখ ডলারের, যা আগের বছরের তুলনায় ৩.০৮ শতাংশ বেশি। একই সময়ে যুক্তরাজ্যে রপ্তানি হয়েছে ২৯৭ কোটি ডলারের, যেখানে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১.২২ শতাংশ। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এসব বাজারে তুলনামূলক স্থিতিশীল চাহিদা থাকায় প্রবৃদ্ধি বজায় রয়েছে। ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, অপ্রচলিত বা নন–ট্র্যাডিশনাল বাজারে রপ্তানি হয়েছে ৪২৪ কোটি ডলারের, যা মোট রপ্তানির প্রায় ১৬.৪৪ শতাংশ। তবে এসব বাজারে রপ্তানি ৬.৩৪ শতাংশ কমেছে। জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ভারত এবং মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি বাজারে অর্ডার কমে যাওয়ার প্রভাব এতে পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পণ্যভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, তৈরি পোশাক খাতের দুটি প্রধান পণ্যের ক্ষেত্রেই কিছুটা হ্রাস হয়েছে। নিটওয়্যার পণ্যের রপ্তানি কমেছে ৪.৫৬ শতাংশ, আর ওভেন পোশাকের রপ্তানি কমেছে ২.৭৯ শতাংশ। যদিও উভয় খাতই এখনো বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।
এদিকে, আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে পোশাক রপ্তানি ১০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার জাতীয় লক্ষ্য অর্জনে সরকারের পূর্ণ সহযোগিতার প্রত্যাশা করেছে তৈরি পোশাক খাতের মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)। একই সাথে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডকে বিশ্ববাজারে শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠার আশাবাদও জানিয়েছে সংগঠনটি।
বিজিএমইএ জানায়, ‘দেশের অর্থনীতির মূল প্রাণশক্তি তৈরি পোশাক শিল্প বর্তমানে এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে রয়েছে। এলডিসি উত্তরণ–পরবর্তী বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুসংহত করতে নতুন সরকারের দূরদর্শী নীতিগত সহায়তা ও ব্যবসা–বান্ধব দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।’
বিজিএমইএর নেতারা শিল্পের কৌশলগত রূপকল্প তুলে ধরে পত্রিকায় জানান, পোশাকশিল্প বর্তমানে শ্রমনির্ভর মডেল থেকে বেরিয়ে এসে মূল্য সংযোজিত পণ্য, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিগত মানোন্নয়নের মাধ্যমে রূপান্তরের লক্ষ্যে কাজ করছে। তারই অংশ হিসেবে কৃত্রিম তন্তু ও টেকনিক্যাল টেক্সটাইলভিত্তিক পোশাক তৈরির সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
বিজিএমইএ নেতারা জানান, তাঁদের বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ ইতিমধ্যে তৈরি পোশাকশিল্পে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ, বন্দর ব্যবস্থাপনায় দক্ষতার উন্নয়ন, কাস্টমস ও বন্ড প্রক্রিয়া সহজীকরণ, সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনা, ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত উন্নয়ন দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য সরকারের কাছে সুপারিশ করেছেন। আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে পোশাক রপ্তানি ১০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার জাতীয় লক্ষ্য অর্জনে বিজিএমইএ নেতারা যে ভূমিকা পালন করছেন, তাতে সরকারকে সহযোগিতা দিতে হবে। তার জন্য দরকার বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ করতে রপ্তানি আয় বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে। আমাদের এই খাতে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে, সেগুলো কাজে লাগাতে হবে। তৈরি পোশাক শিল্পে দীর্ঘদিনের অনিয়ম–অব্যবস্থপনা দূর করে এই খাতকে শক্ত কাঠামোর ওপর দাঁড় করাতে হবে।








