পাহাড়ের পর পাহাড় সবুজ বন। বনের ভেতর গর্জন, চাপালিশ, চাঁপা, গামারি, শিমুল, হরতকি, বহেরা, পাহাড়ি নিম, করই ও তেলশুরসহ নানা প্রজাতির দেশীয় বৃক্ষ। কোথাও গাছের ডালে দল বেঁধে ঘুরছে বানর, কোথাও শোনা যাচ্ছে হিল ময়না ও টিয়ার ডাক। বন বিভাগের নানা উদ্যোগ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে এসব বনাঞ্চলে বন্যপ্রাণীর বিচরণও আগের তুলনায় বেড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
খাগড়াছড়িতে বন বিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন বন রক্ষায় নিয়মিত টহল, গাছ কাটা ও বনজ সম্পদ আহরণ বন্ধে নজরদারি এবং বন্যপ্রাণী শিকার প্রতিরোধে স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করা হয়েছে। ফলে অনেক বনাঞ্চল এখন বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে গড়ে উঠছে।
খাগড়াছড়ির আলুটিলায় বন বিভাগের ১৭শ একর সংরক্ষিত বনভূমি রয়েছে। বনের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঝিরি ও ছড়াগুলোতে এখনো স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ রয়েছে। বড় গাছের পাশাপাশি রয়েছে নানা ধরনের ছোট গাছ, লতাগুল্ম, বাঁশ ও ঝোপঝাড়। এসব উদ্ভিদ ও গাছপালা পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর খাদ্য এবং আশ্রয়ের জোগান দিচ্ছে।
পাহাড়ি বন রক্ষায় শুধু বনকর্মীদের ওপর নির্ভর না করে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। বন সংলগ্ন গ্রামের বাসিন্দারাও বনের ওপর নজর রাখছেন। কেউ গাছ কাটতে গেলে, বাঁশ বা কাঠ নিয়ে যেতে চাইলে কিংবা বন্যপ্রাণী শিকারের চেষ্টা করলে বন বিভাগকে খবর দেওয়া হচ্ছে।
খাগড়াছড়ি আলুটিলা সংরক্ষিত বনের সংলগ্ন রিছাং ঝরনা এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা বিক্রম ত্রিপুরা বলেন, আমরা নিজেরাও এই বন রক্ষা করি। কেউ যাতে গাছ কাটতে বা কাঠ নিয়ে যেতে না পারে, সেদিকে গ্রামের মানুষ নজর রাখে। বন্যপ্রাণী শিকার বন্ধেও আমরা তৎপর থাকি। বন বিভাগ নিয়মিত বনের ভেতরে টহল দেয়। বন পাহারায় স্থানীয়রাও সহযোগিতা করছেন।
খাগড়াছড়ি সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মোশারফ হোসেন বলেন, খাগড়াছড়ি রেঞ্জের অধীন আলুটিলা মৌজায় ১৭০০ একর সংরক্ষিত বনাঞ্চল রয়েছে। মূলত স্বাধীনতা–পরবর্তী সময়ে এটাকে সংরক্ষিত বন ঘোষণা করা হয়েছে। এখানে সেগুন প্রজাতির গাছ ছাড়াও পাহাড়ের আদি প্রজাতি যেমন গুদা, গুডগুটিয়া, গর্জন, চাপালিশ, চাঁপা, শিঁউড়ি, ছাতিয়ানসহ বন্যপ্রাণীর খাদ্যের উপযোগী বিভিন্ন ধরনের গাছ রোপণ করা হয়েছে। এই সংরক্ষিত বনাঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের বন্যপ্রাণীও নিরাপদে বসবাস করছে। তার মধ্যে লজ্জাবতীসহ নানা ধরনের বানর, সাপ, গুইসাপ, বিভিন্ন ধরনের পাখিসহ কাঠবিড়ালি নিরাপদে বসবাস করছে। মাঝে মাঝে হরিণও দেখা যাচ্ছে। একটি প্রাকৃতিক বনের যে সকল বৈশিষ্ট্য থাকা দরকার, সংরক্ষিত বনের সকল বৈশিষ্ট্যই এখানে বিদ্যমান রয়েছে। এই বনকে নিরাপদে রাখার জন্য আমাদের টহল টিমসহ স্থানীয় লোকজনের সমন্বয়ে গঠিত টিম যৌথভাবে টহলের মাধ্যমে নিরাপদে রেখেছি। এখানে গাছ কর্তনসহ কোনো ধরনের ইলিসিট কিংবা কোনো ধরনের সমস্যা নেই। বর্তমানে এটা একটি নিরাপদ সংরক্ষিত বন হিসেবে আমরা পরিচালনা করছি।
তিনি বলেন, এখানে কেউ গাছ কাটে না। ফলে বনটি অক্ষত রয়েছে। এই বনে বিভিন্ন প্রকার ঔষধি বৃক্ষের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণীর বিচরণ রয়েছে। তাদের সুরক্ষায় আমাদের দল নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছে।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতা–পরবর্তী সময়ে ঘোষিত সংরক্ষিত বনাঞ্চলের পাশাপাশি খাগড়াছড়ির বিভিন্ন পাহাড়ি বনও বন্যপ্রাণীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল হয়ে উঠেছে। এসব বনে সেগুনের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় বৃক্ষ রয়েছে। বন বিভাগের পক্ষ থেকে দেশীয় প্রজাতির বৃক্ষ ও বাঁশের আবাদ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
খাগড়াছড়ির বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. ফরিদ মিঞা বলেন, খাগড়াছড়ি বন বিভাগের অধীন ৬ হাজার ২শ একর সংরক্ষিত বনভূমি আছে। এর মধ্যে আলুটিলা প্রাকৃতিক বনাঞ্চলে ১৭০০ একর বনভূমি আছে। এখানে বিলুপ্ত প্রজাতির বিভিন্ন স্পেসিস আছে। ধারমারা, আমলকি, হরিতকি, বহেরা, বট, পাকুড়সহ বন্যপ্রাণীর সহায়ক বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষ এখানে আছে। আমরা এগুলোকে আরো সমৃদ্ধ করার জন্য নেটিভ ও এভারগ্রিন স্পেসিস এবং বন্যপ্রাণীর যে ফল, ডুমুরসহ বিভিন্ন প্রজাতির ফলের চারা এখানে রোপণ করব। তাছাড়া এখানে বাঁশবাগান করব। টোটাল ৪০ একর এনরিচমেন্ট প্লান্টেশন, ৫০ হেক্টর করব বাঁশবাগান। এগুলোর ফলে এখানকার যে জীববৈচিত্র্য তা আরো বেশি সংরক্ষিত হবে। আমাদের এই বন আরো বেশি সমৃদ্ধ হবে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে বন রক্ষার কারণে আলুটিলার বনাঞ্চল অনেকটাই সুরক্ষিত রয়েছে। এই কার্যক্রম দীর্ঘমেয়াদে এগিয়ে নেওয়া হবে।












