
বিশিষ্ট রাজনীতিক, স্বাধীনতা সংগ্রামী, মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক সংসদ সদস্য মোখতার আহমদ ১৯৪১ সালে বাঁশখালী উপজেলার ২নং সাধনপুর ইউনিয়নের খোর্দ্দমোজাফ্ফরাবাদ গ্রামের স্বনামধন্য ব্যবসায়ী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম আবদুল আলী সওদাগর।
মোখতার আহমদ একজন বহুমাত্রিক রাজনীতিক ছিলেন। তিনি অনেক রাজনৈতিক কর্মী সৃষ্টি করেছেন; তাঁর হাতেগড়া অনেক কর্মী বিভিন্ন সময়ে মন্ত্রী, মেয়র, সংসদ সদস্য এবং প্রজাতন্ত্রের শীর্ষ কর্মকর্তা হয়েছেন।
তাঁর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন উজ্জ্বল মহিমায় উদ্ভাসিত। তিনি একজন সৎ, ত্যাগী, আদর্শের প্রতি নিবেদিত, পরিচ্ছন্ন রাজনীতিক ছিলেন। তিনি রাজনীতিকে অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেননি। তাঁর জীবনে চিত্তের বৈভব ছিল, কিন্তু বিত্তের ছোঁয়া ছিল না। শহরে তাঁর এক টুকরো জমিও নেই। বাঁশখালীতে পৈতৃক ভিটে নদীর ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে যায়। তবে এই বীর মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতি কখনো বিলীন হবার নয়। তিনি অবিভক্ত চট্টগ্রাম জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ও মুক্তিযুদ্ধকালীন বাঁশখালী, আনোয়ারা ও কুতুবদিয়া থানার কমান্ডার ছিলেন।
মোখতার আহমদ স্কুল জীবনে একজন দক্ষ ফুটবলার ছিলেন। বৃহত্তর চট্টগ্রামের বিভিন্ন প্রান্তে একাধিক টুর্নামেন্টে মিডফিল্ড পজিশনে খেলে খ্যাতি কুড়িয়েছেন। এক খেলায় পা ভেঙে যাওয়ায় তাঁর খেলোয়াড়ি জীবনের ইতি ঘটলে তিনি রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়েন। পরে স্বনামধন্য বাণীগ্রাম সাধনপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চট্টগ্রাম শহরে চলে আসেন। চট্টগ্রাম সরকারি কমার্স কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হন। কমার্স কলেজ থেকেই তিনি ইন্টারমিডিয়েট ও স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৬২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে বাঙালি জাতির মুক্তির জন্য গোপন সংগঠন নিউক্লিয়াস (পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ) গঠিত হলে মোখতার আহমদ চট্টগ্রাম জেলা ফোরামের সদস্য হন। তখন তিনি ১ দফার প্রবক্তা জননেতা মরহুম এম এ আজিজের সাথে সম্পৃক্ত হন। ১৯৬৪ সালে সামপ্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধে তিনি ছাত্রনেতা হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। স্কুল জীবন থেকেই তিনি বাঁশখালীর ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের স্বার্থরক্ষায় সচেষ্ট ছিলেন এবং তাদের সুখ-দুঃখের সাথে ছিলেন। তাদের সাথে তাঁর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আমৃত্যু অক্ষুণ্ন ছিল।
১৯৬৬ সালে মোখতার আহমদ বৃহত্তর চট্টগ্রাম জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম এস এম ইউসুফ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ সালে আইয়ুব বিরোধী গণঅভ্যুত্থানে বৃহত্তর চট্টগ্রাম জেলা সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক নির্বাচিত হয়ে তিনি ছাত্র-গণআন্দোলনে নেতৃত্ব দান করেন। এই কমিটিতে ছিলেন সাবেক মন্ত্রী আবদুল্লাহ আল নোমান চৌধুরী, আবু তাহের মাসুদ ও আবু বকর চৌধুরী প্রমুখ নেতৃবৃন্দ।
মোখতার আহমদের কথা ও কর্মে মিল থাকায় বঙ্গবন্ধু তাঁকে স্নেহ করতেন এবং ছাত্রলীগকে সংগঠিত করার জন্য পরামর্শ দিতেন। ১৯৬৯ সাল থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত তিনি বৃহত্তর চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর প্রধান ছিলেন এবং কেন্দ্রীয় প্রধান ছিলেন প্রাক্তন মন্ত্রী জননেতা মরহুম আবদুর রাজ্জাক। উল্লেখ্য, ঐতিহাসিক আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা (পাকিস্তানি শাসকদের ভাষায়) থেকে বঙ্গবন্ধুসহ সকলে মুক্তিলাভ করার সাথে সাথে বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতির উদ্দেশ্যে রেজিমেন্টেড ফোর্স গড়ে তোলার লক্ষ্যে আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করেন।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে আনোয়ারা, বাঁশখালী, কুতুবদিয়ায় আওয়ামী লীগের এমএনএ প্রার্থী ছিলেন মরহুম আতাউর রহমান খান কায়সার। সে নির্বাচনে বাঁশখালীর কৃতী সন্তান মোখতার আহমদ, দানেশ আহামদ চৌধুরী, মৌলভী সৈয়দ আহমেদ, শাহ-ই জাহান চৌধুরী এবং সুশীল কুমার রায় (ফেলুবাবু) প্রমুখের কঠোর পরিশ্রমে আওয়ামী লীগ প্রার্থী বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন।
১৯৭১ সালের ৩ মার্চ বঙ্গবন্ধু অসহযোগ আন্দোলন ঘোষণা করলে মোখতার আহমদ স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিনি রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনামূলক ঐতিহাসিক ভাষণ শোনার জন্য চট্টগ্রাম থেকে সদলবলে ঢাকা যান। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনে চট্টগ্রাম এসে মুক্তিযুদ্ধের জন্য ছাত্র-জনতাকে নিয়ে প্রস্তুতি শুরু করেন। বাঁশখালী সহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন থানায় মিছিল, সমাবেশ করে জনগণকে উজ্জীবিত করতে লাগলেন। ২৪ মার্চ তিনি আন্দরকিল্লার বন্দুকের দোকান ও আইস ফ্যাক্টরি রোডের অস্ত্রাগার লুণ্ঠনেও নেতৃত্ব দেন। সেখানে থেকে বেশ কিছু অস্ত্র ও গোলাবারুদ বাঁশখালীতে নিয়ে যান এবং স্থানীয় যুবকদের হাতে তুলে দেন।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাঙালিদের উপর নির্মম হত্যাযজ্ঞ শুরু করলে তিনি প্রতিরোধ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। পরে তিনি সশস্ত্র ট্রেনিং গ্রহণ করার জন্য বাঁশখালী তথা চট্টগ্রাম থেকে ছাত্র-যুবকদের রিক্রুট করে ত্রিপুরায় প্রেরণ করেন। সেখানে হরিণা ক্যাম্পে রিক্রুটকৃতদের কমিটেড ছাত্র-যুবকদের সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য দেরাদুন প্রেরণ এবং অন্যদের অন্যান্য স্থানে পাঠানোর জন্য নামের তালিকা তৈরি এবং বিদেশে অবস্থানরত বাঙালি বন্ধুদের আর্থিক সহায়তার অর্থ ভারতীয় ব্যাংক থেকে উত্তোলন করে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-যুবক ও শরণার্থীদের আর্থিক সহায়তা করতে তিনি মুখ্য ভূমিকা পালন করেন।
মোখতার আহমদ ভারত থেকে সশস্ত্র ট্রেনিং গ্রহণ করে পাকিস্তানি হানাদার কবলিত বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। ১নং সেক্টর কর্তৃক তিনি বাঁশখালী, আনোয়ারা ও কুতুবদিয়া থানার কমান্ডার নিযুক্ত হন। এই সময় তাঁর অধীনস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে ফটিকছড়ি, সীতাকুণ্ড, কালুরঘাট পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে শত্রু বাহিনীকে পরাজিত করেন।
১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার পরবর্তী ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত সামরিক সরকার তাঁর নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করলে প্রায় ৪ বছর তিনি আত্মগোপনে ছিলেন। ১৯৮২ সালে জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনে ১৫ দলীয় জোটের একটি গোপন বৈঠক থেকে ১০ জন নেতার সাথে তাঁকেও গ্রেফতার করা হয়। এদের মধ্যে চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগ নেতা মরহুম এম এ ওহাব, মরহুম আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু ও ন্যাপ নেতা মরহুম এম এ শহীদুল্লাহ প্রমুখ ছিলেন।
১৯৮৮ সালে আনোয়ারা ও পশ্চিম পটিয়া সংসদীয় আসন থেকে তিনি জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দের ২৮ মে তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে বন্দর রেস্ট হাউসে তাঁর অনুগত নেতাকর্মীদের নিয়ে জাসদ থেকে পুরনো দল আওয়ামী লীগে প্রত্যাবর্তন করেন এবং চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটিতে (১৯৯২-৯৬) সদস্য নির্বাচিত হন। মরহুম মোখতার আহমদ চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ও চট্টগ্রাম কমার্স কলেজ শহীদ মিনারের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তিনি একুশে মেলা পরিষদ চট্টগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলা পরিষদ চট্টগ্রাম, বৈশাখী মেলা পরিষদ চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম সাংস্কৃতিক সমন্বয় পরিষদ, চট্টগ্রাম প্রভৃতি সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা এবং স্বাধীনতা মেলা পরিষদ চট্টগ্রাম ২০০৪-এর চেয়ারম্যান ও বাণীগ্রাম সাধনপুর উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের সাবেক সভাপতি ছিলেন। ২০০৬ সালের ২১ অক্টোবর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
লেখক : সাংবাদিক, মুক্তিযোদ্ধা ও সাংস্কৃতিক সংগঠক











