মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা, সংকট ও সম্ভাবনা

বেকার তরুণদের কর্মসংস্থান :

মো. নাজমুল ইসলাম চৌধুরী | মঙ্গলবার , ১৩ অক্টোবর, ২০২৬ at ৮:২৬ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তির একটি হলো তরুণ জনগোষ্ঠী। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করছেন। কিন্তু শিক্ষার সঙ্গে চাকরির বাজারের চাহিদার অসামঞ্জস্য, পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাব, দক্ষতার ঘাটতি, শিল্পায়নের ধীরগতি, নিয়োগ প্রক্রিয়ার নানা জটিলতা এবং অভিজ্ঞতার সুযোগ না থাকায় অনেক শিক্ষিত তরুণ দীর্ঘদিন কর্মহীন থাকছেন।

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপের তথ্যভান্ডারেও কর্মসংস্থান, বেকারত্ব, তরুণদের শিক্ষা–কর্মসংস্থান–প্রশিক্ষণের বাইরে থাকা এবং অপ্রতুল কর্মসংস্থানের মতো বিষয়গুলো আলাদাভাবে এখানে উল্লেখ করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা জানিয়েছে, বাংলাদেশে ১৫–২৯ বছর বয়সী তরুণদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের বাইরে রয়েছে। একই সঙ্গে তরুণদের জন্য মানসম্মত ও নিরাপদ কর্মসংস্থান তৈরি করা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।

মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা কী বলছে?

শহর থেকে গ্রাম–চাকরিপ্রত্যাশী তরুণদের বড় একটি অভিযোগ হলো, শিক্ষা শেষ করেও কাজের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পাওয়া কঠিন। অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগে অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়; কিন্তু নতুন গ্র্যাজুয়েটের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ কোথায়–এই প্রশ্ন থেকেই যায়।

অন্যদিকে, অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দক্ষ কর্মী খুঁজে পাচ্ছে না। অর্থাৎ একদিকে শিক্ষিত বেকার তরুণ, অন্যদিকে দক্ষ জনবলের সংকট–এই দুই বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা, বিএসসি, কারিগরি, মেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং, আইটি, কৃষি, মেরিন, ইলেকট্রনিকস, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে শিক্ষিত তরুণদের বাস্তব দক্ষতা ও গবেষণাকে কাজে লাগানোর সুযোগ বাড়াতে হবে। শুধু সনদ নয়–দক্ষতা, প্রশিক্ষণ, ইন্টার্নশিপ এবং কাজের অভিজ্ঞতাকে কর্মসংস্থানের মূল ভিত্তি করতে হবে।

বিনিয়োগ বাড়লে কর্মসংস্থান বাড়বে :

কর্মসংস্থানের অন্যতম প্রধান উৎস হলো দেশি–বিদেশি বিনিয়োগ। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ২০২৫ সালে ১৯টি সম্ভাবনাময় খাত চিহ্নিত করে এফডিআই হিটম্যাপ প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে তৈরি পোশাক, ওষুধ, কৃষিপ্রক্রিয়াজাতকরণ, আইটি–সেবা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রনিকস, লজিস্টিকস, মেডিকেল ডিভাইস, সেমিকন্ডাক্টরসহ বিভিন্ন খাত রয়েছে। এখন প্রয়োজন শুধু বিনিয়োগের ঘোষণা নয়; প্রস্তাবিত বিনিয়োগ বাস্তবে কতদূর এগোল, কত কর্মসংস্থান হলো এবং স্থানীয় তরুণদের কতজন নিয়োগ পেলেন–তার নিয়মিত ফলোআপ ও প্রকাশ্য হিসাব। অচল বা বন্ধ শিল্পকারখানা, পড়ে থাকা শিল্পভূমি ও অব্যবহৃত যন্ত্রপাতি পুনরায় চালু করার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা দরকার। নতুন শিল্প স্থাপনের পাশাপাশি পুরোনো শিল্পকে সচল করা গেলে তুলনামূলক কম সময়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব।

সরকার, ব্যবসায়ী ও শিল্পমালিকদের যৌথ দায়িত্ব : কর্মসংস্থান শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়। সরকার, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, প্রশাসন, ব্যবসায়ী ও শিল্পমালিক, ব্যাংক–বীমা, এনজিও, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, গবেষক এবং উন্নয়ন সহযোগী–সব পক্ষকে একই কর্মপরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। সরকারের দায়িত্ব হবে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো, দুর্নীতি প্রতিরোধ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং স্বচ্ছ মনিটরিং নিশ্চিত করা।

কারিগরি শিক্ষায় নতুন জোর : বাংলাদেশের কর্মসংস্থান সমস্যার একটি বড় সমাধান হতে পারে কারিগরিমুখী শিক্ষা ও শিল্পের সঙ্গে শিক্ষার সরাসরি সংযোগ। ডিপ্লোমা ও বিএসসি পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার সময় থেকেই শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপ, অ্যাপ্রেন্টিসশিপ ও হাতে–কলমে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। কোন শিল্পে কী ধরনের দক্ষ কর্মী প্রয়োজন–সেই তথ্যের ভিত্তিতে কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর কোর্স ও আসন নির্ধারণ করা যেতে পারে।

বিদেশমুখী প্রবণতা ও দেশীয় সুযোগ : উচ্চশিক্ষা বা কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশে যাওয়া স্বাভাবিক ও বৈধ পথ। তবে দেশে যদি দক্ষ তরুণদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা, গবেষণা, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ ও সম্মানজনক কর্মসংস্থান তৈরি করা গেলে অনেক তরুণ দেশের মধ্যেই নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ পাবেন। বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতারণা, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, দালালচক্র ও অনিরাপদ কর্মসংস্থানের ঝুঁকি কমাতেও কার্যকর তথ্য ও সরকারি সহায়তা প্রয়োজন।

হতাশা নয়, নিরাপদ ভবিষ্যৎ : দীর্ঘদিন চাকরি না পাওয়া একজন তরুণের ওপর শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক ও মানসিক চাপও তৈরি করতে পারে। চাকরি পাওয়ার জন্য ঘুষ, রাজনৈতিক যোগাযোগ, প্রতারণা বা অনৈতিক প্রস্তাবের মুখোমুখি হওয়ার অভিযোগও মাঠপর্যায়ে শোনা যায়। এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশ জরুরি।

তরুণ ও অভিভাবকদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে : কর্মসংস্থান পরিকল্পনা শুধু দপ্তরে বসে তৈরি করলে হবে না। মাঠপর্যায়ের তরুণ, অভিভাবক, শিক্ষক, উদ্যোক্তা, চাকরিদাতা, শ্রমিক, গবেষক ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের সরাসরি মতামত নিতে হবে। প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নিয়মিতভাবে জানা যেতে পারে–কত তরুণ কাজ খুঁজছেন, কী বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন, কী দক্ষতা আছে, কী ধরনের কাজ চান এবং স্থানীয়ভাবে কোন খাতে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা : কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

শেষ কথা : বাংলাদেশের তরুণদের শুধু চাকরি খোঁজার মানুষ হিসেবে নয়, উৎপাদনশীল শক্তি, উদ্যোক্তা, গবেষক, প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ ও ভবিষ্যৎ শিল্পনেতা হিসেবে দেখতে হবে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের সদিচ্ছা, দক্ষ ও সৎ প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, ব্যবসায়ী ও শিল্পমালিকদের বিনিয়োগ, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাস্তবমুখী শিক্ষা এবং তরুণদের মেধা–সবকিছুকে একই লক্ষ্যে কাজে লাগাতে হবে। কর্মসংস্থানের প্রতিটি প্রকল্পের সঙ্গে নির্দিষ্ট লক্ষ্য, সময়সীমা, অর্থায়ন, দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান এবং কতজনের কর্মসংস্থান হবে–তার পরিমাপযোগ্য হিসাব থাকতে হবে।

বিনিয়োগের পর শুধু প্রকল্প উদ্বোধন নয়, প্রকল্পটি বাস্তবে কতটা কর্মসংস্থান তৈরি করল–সেটিরও নিয়মিত মূল্যায়ন প্রয়োজন। কারণ কর্মসংস্থান কেবল একটি অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এটি তরুণদের আত্মমর্যাদা, পরিবারের নিরাপত্তা, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই এখন সময়–বেকার তরুণের সংখ্যা গণনার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের বাস্তব সুযোগ গণনা করার মহা পরিকল্পনা গ্রহণ করা ।

লেখক: পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ

পূর্ববর্তী নিবন্ধগোফরান উদ্দীন টিটুর ‘নির্ঝরের স্বপ্ন’
পরবর্তী নিবন্ধচট্টগ্রাম মেডিকেলের কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগে জনবল সংকট ও প্রাসঙ্গিক কথা