মহাসড়কের পাশে ফিলিং স্টেশনে গাড়ির লাইন, যানজট

জ্বালানি সংকট । সিটি গেট থেকে ঢাকা পর্যন্ত বিভিন্ন পয়েন্টে যানজটের প্রভাব, সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে ঈদযাত্রায় বাড়তে পারে ভোগান্তি

হাসান আকবর | রবিবার , ১৫ মার্চ, ২০২৬ at ৫:৪৮ পূর্বাহ্ণ

জ্বালানি সংকটের কারণে চট্টগ্রামঢাকা মহাসড়কের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনের সামনে পণ্যবাহী যানবাহনের দীর্ঘ সারির কারণে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। গতকাল শনিবার ভোর থেকে মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে ফিলিং স্টেশন ঘিরে কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও কন্টেনারবাহী গাড়ির লাইন দেখা যায়। সড়কের একপাশজুড়ে শত শত ভারী যানবাহন দাঁড়িয়ে থাকায় দেশের অন্যতম ব্যস্ত এই মহাসড়কে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, চট্টগ্রাম নগরের সিটি গেট এলাকা থেকে শুরু করে ঢাকা পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে যানজটের প্রভাব দেখা যায়। জ্বালানি সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক না হলে আসন্ন ঈদযাত্রায় এই যানজট আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম বন্দর ও বিভিন্ন ইনল্যান্ড কন্টেনার ডিপো (আইসিডি) থেকে পণ্য নিয়ে বের হওয়া কয়েক হাজার ট্রাক ও কন্টেনার মুভার গতকাল ডিজেলের সন্ধানে ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে বাধ্য হয়। এতে মহাসড়কের একাধিক স্থানে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। যানজট নিয়ন্ত্রণে হাইওয়ে পুলিশের সদস্যদের বিভিন্ন পয়েন্টে হিমশিম খেতে দেখা যায়। হাইওয়ে পুলিশ সূত্র জানায়, গত কয়েক দিন ধরেই প্রতিদিন দুপুরের পর মহাসড়কের বিভিন্ন এলাকায় ফিলিং স্টেশনকে কেন্দ্র করে যানজট তৈরি হচ্ছে। যানবাহনের দীর্ঘ সারির কারণে স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে অতিরিক্ত চাপ নিতে হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, নগরের সিটি গেট থেকে শুরু করে ঢাকা অভিমুখে মহাসড়কের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনের সামনে ডিজেলের জন্য অপেক্ষমাণ গাড়ির দীর্ঘ লাইন। এসব গাড়ির কারণে মহাসড়কের ঢাকামুখী দুই লেনের একটি প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বাকি এক লেন দিয়ে ধীরগতিতে যান চলাচল করায় সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট। বিশেষ করে সীতাকুণ্ড এলাকার ফিলিং স্টেশনগুলোর সামনে কয়েক হাজার গাড়ির জটলা এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।

ঢাকাচট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ড অংশের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৮ কিলোমিটার। এই অংশে ঢাকামুখী লেনে রয়েছে অন্তত ১২টি ফিলিং স্টেশন। এসব পাম্প ঘিরেই শত শত ট্রাক ও পণ্যবাহী গাড়িকে ডিজেলের জন্য অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। অনেক চালক জানান, তাদের গাড়ির রিজার্ভ ট্যাংকের ডিজেলও শেষ হয়ে গেছে। এখন ডিজেল না পেলে এক কিলোমিটার পথও অতিক্রম করা সম্ভব নয়।

মহাসড়কের ভাটিয়ারী বাজার এলাকায় দায়িত্বরত এক পুলিশ সদস্য বলেন, প্রতিদিনই কোনো না কোনো স্থানে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। মূলত জ্বালানি সংগ্রহের জন্য মহাসড়কের ওপর গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকার কারণেই এই পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। তিনি জানান, ফিলিং স্টেশনগুলোতে পর্যাপ্ত তেল না থাকায় অনেক গাড়ি সড়কের পাশে সারিবদ্ধভাবে অপেক্ষা করছে। কোনো গাড়ির জ্বালানি শেষ হয়ে গেছে, আবার কেউ পরবর্তী যাত্রার জন্য তেল সংগ্রহের চেষ্টা করছে। এতে ফিলিং স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় যানবাহন অত্যন্ত ধীরগতিতে চলাচল করছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে ঈদে ঘরমুখী মানুষের যানবাহনের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে গেলে মহাসড়কের পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

পরিবহন মালিক, শ্রমিক ও পুলিশ সদস্যদের ধারণা, জ্বালানি সংকট দ্রুত কাটিয়ে উঠতে না পারলে ঈদযাত্রায় মহাসড়কে দীর্ঘ যানজট অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে। পরিবহন শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চট্টগ্রাম নগর বা বন্দর এলাকা থেকে পণ্য নিয়ে বের হওয়া অধিকাংশ ট্রাক সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন থেকে ডিজেল সংগ্রহ করে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ঢাকা বা দেশের অন্যান্য গন্তব্যে যায়। কিন্তু বর্তমানে একাধিক স্টেশনে দাঁড়িয়ে অল্প অল্প করে জ্বালানি নিতে হচ্ছে তাদের।

সীতাকুণ্ড উপজেলার বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের চারালকান্দি এলাকার সোনারগাঁ ফিলিং স্টেশনের সামনে অপেক্ষমাণ এক ট্রাকচালক বলেন, চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় যেতে হলে এখন বিভিন্ন স্থানে একাধিক ফিলিং স্টেশনে দাঁড়িয়ে ডিজেল সংগ্রহ করতে হচ্ছে। ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর তারা মাত্র ১০ থেকে ২০ লিটার ডিজেল পান। অথচ চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় যেতে একটি ট্রাকের ১৩৫ থেকে ১৪০ লিটার ডিজেলের প্রয়োজন হয়।

আরেকজন চালক জানান, একাধিক স্টেশনে তেল সংগ্রহ করতে গিয়ে আট ঘণ্টার যাত্রাপথ এখন দুই তিন দিন পর্যন্ত সময় নিচ্ছে। কখনো তিন থেকে চার ঘণ্টা অপেক্ষা করে স্টেশনে পৌঁছালে তেল নেই বলে জানানো হয়। তখন আবার অন্য স্টেশনে গিয়ে অপেক্ষা করতে হয়। এভাবে চলতে থাকলে ঈদের সময় সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছাবে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

সীতাকুণ্ডের ডিএবি পেট্রোল পাম্পের এক কর্মকর্তা জানান, গত দুই দিনে তারা মাত্র সাড়ে ৪ হাজার লিটার ডিজেল পেয়েছেন, যা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। আরও তেল আনার জন্য ভাউচার পাঠানো হলেও সরবরাহ পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, সীমিত মজুদের কারণে প্রতিটি গাড়িকে ১০ থেকে ২০ লিটার করে ডিজেল দিতে হচ্ছে। শুধু ডিজেল নয়, পেট্রোল ও অকটেনের অবস্থাও সংকটাপন্ন। মোটরসাইকেলপ্রতি মাত্র ২ লিটার অকটেন এবং ব্যক্তিগত গাড়িতে সর্বোচ্চ ৫ লিটার করে দেওয়া হচ্ছে। পর্যাপ্ত সরবরাহ না আসা পর্যন্ত কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী সীমিত পরিমাণেই তেল বিতরণ করতে হচ্ছে।

পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কে পরিবহন চলাচল আরও ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি আসন্ন ঈদযাত্রায় ঘরমুখো মানুষের দুর্ভোগ কয়েকগুণ বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা। বিপিসি আবারো বলেছে, দেশে জ্বালানির কোন সংকট নেই। শুধুমাত্র জরুরি পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে রেশনিং করতে হচ্ছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধইসলামী জীবনব্যবস্থায় শ্রমজীবীদের অধিকার সুরক্ষিত
পরবর্তী নিবন্ধবন্দর থেকে নিলামে মালামাল কিনে দেওয়ার কথা বলে ৬০ লাখ টাকা আত্মসাৎ