মনিকা ভিত্তি : এলিজি

শৈবাল চৌধূরী | সোমবার , ২৮ মার্চ, ২০২২ at ৬:১০ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশের প্রাগ্রসর দর্শকদের কাছে মনিকা ভিত্তির নাম পরিচিত। কেবল পরিচিতই নয়, আদরনীয় বটে। চলচ্চিত্র সাংসদের সূত্রে মনিকার অনেক ছবিই তাঁরা দেখেছেন। মাইকেলেঞ্জোলো আন্তোনিওনির ছবির অভিনেত্রী হিসেবে বিশ্ব চলচ্চিত্রে ছিলেন সমাদৃত। ডিসিকার যেমন সোফিয়া লোরেন, গদারের আনা কারিনা, ফেলিনির জুলিয়েত্তা মাসিনা, ক্রফোর জাঁ মরো এবং সত্যজিতের মাধবী। উল্লেখিত চলচ্চিত্রকারেরা স্বভাবতই অন্য অভিনেত্রীদের প্রধান চরিত্রে রেখে অনেক চলচ্চিত্র নির্মাণ করলেও উপরিউক্ত অভিনেত্রীরা তাঁদের অভিনেত্রী হিসেবে সমাদৃত। এর প্রধান কারণ পরিচালকের চিন্তাচেতনার সাথে অভিনেত্রীর অভিনয় শৈলির সামঞ্জস্য।
আন্তোনিওনির ক্যারিয়ারের শ্রেষ্ঠ একটি কাজ ‘লা নত্তে’ (The Night)। স্বামী-স্ত্রী ও দয়িতার ত্রিকোণ সম্পর্কের জটিল টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে মানব সম্পর্কের নিগূঢ় অনেক স্তরকে তুলে ধরেছিলেন চলচ্চিত্রকার। একটি রাতের ঘটনায় চিত্রায়িত ছবিতে সংলাপ খুব কম। দৈহিক অভিব্যক্তি এবং ক্যামেরার সাদাকালো সম্পাতে মানবমনের সূক্ষ্ম অনুভূতি ফুটিয়ে তুলেছিলেন বিশ্ব চলচ্চিত্রের সেরা তিন সেরা অভিনয় শিল্পী মার্সেল্লো মাস্ত্রোইয়ানি (স্বামী), জান মরো (স্ত্রী) এবং দয়িতা (মনিকা ভিত্তি)। কিন্তু মজার বিষয় হলো মনিকা অভিনীত চরিত্রটি অনেকটা নেতিবাচক হলেও দর্শকদের অনুকম্পাটুকু তিনিই আদায় করে নিতে সমর্থ হয়েছিলেন তাঁর অসাধারণ অভিনয়ের গুণে।

মনিকাকে কুইন অব ইতালিয়ান সিনেমা অভিধ্যায় অভিহিত করা হতো। তাঁর অভিনয় ক্ষমতা, সৌন্দর্য্য, ব্যক্তিত্ব তাঁকে স্বতন্ত্র করে তুলেছিল সোফিয়া লোরেন, জুলিয়েত্তা মাসানি, জিনা লোলোব্রিজিদার মতো ডাকসাইটে অভিনেত্রীর পাশাপাশি। খুব নির্বাচিতভাবে অভিনয় করেছেন মনিকা। পরিচালক হিসেবে আন্তোনিওনির ছবিতেই অভিনয় করেছেন বেশি। লা নত্তে ছাড়া মনিকা অভিনীত আন্তোনিয়নির উল্লেখযোগ্য অন্যান্য ছবি লাভেঞ্চুরা (The Adventure), দি একলিক্স, দি রেড ডেজার্ট, ইল গ্রিডো (The cry), দি মিস্ট্রি অফ ওবারওয়ার্ল্ড। অন্তর্মুখী চরিত্রের অভিনয়ে মনিকা বরাবরই পারদর্শী ছিলেন। তাঁর শান্তস্নিগ্ধ অবয়বে এ-ধরনের অভিনয় তিনি বাঙ্মময় করে তুলতে পারতেন। আন্তোনিওনির চলচ্চিত্রের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল মানবমনের গহনে আলোকপাত। যখনই এ-ধরনের চরিত্র দেখা দিয়েছে তাঁর চলচ্চিত্রে তিনি অবলীলায় ডেকে নিয়েছেন মনিকাকে। এই জুটির শ্রেষ্ঠ তিনটি কাজ ইলগ্রিডো, লাভেঞ্চুরা এবং লা নত্তে। তবে উচ্ছ্বসিত চরিত্রেও মনিকা যে স্বতঃস্ফূর্ত ছিলেন না তা নয়। তাঁর দৈহিক সৌন্দর্য ও প্রগলভ অভিনয় এই ধরনের চরিত্রের জন্যেও সমান মানানসই ছিল। আন্তোনিওনির ছবিতে ক্রমাগত অভিনয়ের মধ্য দিয়ে তাঁর যে নির্দিষ্ট ইমেজ গড়ে ওঠে সেটা ভাঙার জন্যে তিনি বিভিন্ন পরিচালকের ছবিতে নানাবিধ চরিত্রে অভিনয় করতে শুরু করেন। মারিও মনিচেল্লির বেশ কয়েকটি ছবিতে তিনি কমেডি চরিত্রে অভিনয় করেন। রজার ভাদিমের কমেডি ছবিতেও মনিকা অভিনয় করেছেন। হলিউডেও বেশকিছু ছবিতে তিনি অভিনয় করেছেন রিচার্ড হ্যারিস, ডার্ক বোগার্ড, টেরেন্স স্ট্যাম্প, টনি কার্টিস, আলবার্তো সর্দি, মরিস রোনেট এর মতো নামকরা সব অভিনেতার বিপরীতে। তবে তাঁর জমজমাট স্ক্রিন কেমিস্ট্রি ছিল মার্সেলো মাস্ত্রোইয়ানির সঙ্গে। মার্সেলোর পর মনিকার অভিনয় ভালো জমতো ফরাসি অভিনেতা অ্যাল্যাঁ দেলোঁর বিপরীতে।
ইতালির বাইরে মনিকা প্রথম অভিনয় করেন হলিউডে ১৯৬৬ সালে Modesty Blaise ছবিতে টেরেন্স স্ট্যাম্প ও ডার্ক বোগার্ডের সঙ্গে। জোসেফ লোসি পরিচালিত ছবিটি ছিল একটি জেমস বন্ড ফিল্ম। এই ছবির মধ্য দিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক তারকা হয়ে উঠেন এবং ফ্রান্স ও ব্রিটেনের কিছু ছবিতেও অভিনয়ের সুযোগ পান। তবে তাঁর মূল ক্ষেত্র বরাবরই ছিল ইতালি এবং তাঁর আসল জুটি ছিল চলচ্চিত্রকার মাইকেলেঞ্জোলো আন্তোনিওনির সঙ্গেই। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক যত পুরস্কার ও সম্মাননা মনিকা পেয়েছেন তার বেশির ভাগই আন্তোনিওনির ছবিতে অভিনয়ের বদৌলতে।
১৯৯২ সালে মনিকা ভিত্তি অভিনয় থেকে অবসওে যান। আন্তোনিত্তনিও তখন পক্ষাঘাতগ্রস্থ। ছবিও আর তেমন করছেন না। নিশ্চিত করে বলা না গেলেও এটা অনুমান করা মনে হয় অসঙ্গত নয়, মনিকাও হয়তো এ-কারণে অভিনয় থেকে দূরে সরে যান।
মনিকার প্রথম চলচ্চিত্রাভিনয় ১৯৫৪ সালে ত্রদোয়ার্দো আন্তন পরিচালিত ‘লাফ লাফ লাফ’ ছবিতে একটি অনুল্লেখ্য চরিত্রে। আরো কয়েকটি ছবিতে অভিনয়ের পর তিনি আন্তোলিওনির নজরে পড়েন। ১৯৫৭ সালে এই জুটির প্রথম ছবি ‘ইল গ্রিডো’ (The cry) । বস্তুত এই ছবিই মনিকাকে লাইমলাইটে নিয়ে আসে। যে আলো ক্রমশ উদ্ভাসিত হতে থাকে আন্তোলিওনির একের পর এক ছবিতে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে। তবে ১৯৬১ সালে আন্তোনিওনির ‘লা নত্তে’ (The Night) মনিকাকে বিশ্ব চলচ্চিত্রে যোগ্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করে। তবে সব সময় তিনি এই মর্যাদা রক্ষায় সচেষ্ট ছিলেন। ৩৮ বছরের দীর্ঘ ক্যরিয়ারে তাঁর অভিনীত ছবির সংখ্যা মাত্র ৩৬।
মনিকার জন্ম ১৯৩১ সালের ৩ নভেম্বর ইতালির রোমে পিতা এদেল ভিত্তিগলিয়া ও মা এঞ্জেলো সিসিয়ারেলির সংসারে। বাবা মায়ের দেয়া নাম মারিয়া লুইসা ভিত্তিগলিয়া। সিনেমায় এসে হয়ে যান মনিকা। পদবীকে ছোটো করে নাম হয় মনিকা ভিত্তি। স্বামী রবার্তো রুমোর সাথে রোমেই কাটিয়েছেন পুরো জীবন। জীবনযাপনে ছিলেন পরিশীলিত ও অন্তর্মুখীন। প্রকাশ্যে আসতে দেননি সংসারকে। ফলে তাঁর পারিবারিক জীবন সম্পর্কে তেমনি কিছু জানা যায় না। তাঁর ব্যক্তিজীবন ও শিল্পীজীবন দুয়ের মধ্যেই এই পরিশীলিত চর্চা খুঁজে পাওয়া যায়। ২০২২ সালের ২ ফ্রেব্রুয়ারি ৯০ বছর বয়সে নিভৃতেই তাঁর জীবনাবসান হয়েছে এবং নিজের ইচ্ছানুযায়ী কোলাহলমুক্ত পরিবেশে নিতান্ত সাদামাটাভাবে তাঁর অন্ত্যেষ্টি অনুষ্ঠিত হয় রোমের একটি সাধারণ সমাধিক্ষেত্রে।

তাঁর ব্যক্তিজীবন ও শিল্পীজীবন দুয়ের মধ্যেই এই পরিশীলিত চর্চা খুঁজে পাওয়া যায়। ২০২২ সালের ২ ফ্রেব্রুয়ারি ৯০ বছর বয়সে নিভৃতেই তাঁর জীবনাবসান হয়েছে এবং নিজের ইচ্ছানুযায়ী কোলাহলমুক্ত পরিবেশে নিতান্ত সাদামাটাভাবে তাঁর অন্ত্যেষ্টি অনুষ্ঠিত হয় রোমের একটি সাধারণ সমাধিক্ষেত্রে।