মাইকেল মধুসূদন দত্তকে বিবেচনা করা হয় ঊনবিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি কবি ও নাট্যকার হিসেবে। বাংলা সাহিত্যে পাশ্চাত্যের ভাবধারার সার্থক প্রয়োগ করেন মধুসূদন। বাংলা সাহিত্যে উপযুক্ত নাটকের অভাব অনুভব করার এক পর্যায়ে কলকাতার পাইকপাড়ার রাজাদের বেলগাছিয়া থিয়েটারের সঙ্গে জড়িত হন। তার পরই বলা চলে নাট্যকার হিসেবেই বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে পদার্পণ হয় মধুসূদন দত্তের । মহাভারতের কাহিনি অবলম্বনে পাশ্চাত্য রীতিতে রচনা করেন নাটক ‘শর্মিষ্ঠা’। একে বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম সার্থক ও আধুনিক মৌলিক নাটক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এটি তাঁর প্রথম নাটক । রামনারায়ণ তর্করত্নের সংস্কৃত নাট্যশৈলীর প্রথা ভেঙে মাইকেল মধুসূদন দত্ত পাশ্চাত্য শৈলীর অনুসরণে প্রথম আধুনিক বাংলা নাটক রচনা করেন। মাইকেল মধুসূদনের নাট্যচর্চার কাল ও রচিত নাটকের সংখ্যা দুইই সীমিত। ১৮৫৯ থেকে ১৮৬১ এই তিন বছর তিনি নাট্যচর্চা করেন। এই সময়ে তাঁর রচিত নাটকগুলি হল: শর্মিষ্ঠা, একেই কি বলে সভ্যতা, বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ, পদ্মাবতী, কৃষ্ণকুমারী। এছাড়া মৃত্যুর পূর্বে মায়াকানন নামে একটি অসমাপ্ত নাটক। শর্মিষ্ঠা নাটকের বিষয়বস্তু মহাভারতের আদিপর্বে বর্ণিত রাজা যযাতি, শর্মিষ্ঠা ও দেবযানীর ত্রিভুজ প্রেমের কাহিনী। শর্মিষ্ঠা একটি পৌরাণিক নাটক। রচিত হয়েছিল ১৮৫৯ সালে। পাশ্চাত্য নাট্যশৈলীতে লিখলেও মাইকেল এই নাটকে সংস্কৃত শৈলীকে পুরোপুরি বর্জন করেননি। শর্মিষ্ঠা নাটকের কাব্য ও অলংকার–বহুল দীর্ঘ সংলাপ, ঘটনার বর্ণনাত্মক রীতি, প্রবেশক, নটী, বিদুষক প্রভৃতির ব্যবহার সংস্কৃত শৈলীর অনুরূপ। ইংরেজি সাহিত্যের রোম্যান্টিক ধারার প্রভাবও এই নাটকে লক্ষ্য করা যায়। কিছু ত্রুটিবিচ্যুতি থাকলেও, সেই যুগের ইংরেজি–শিক্ষিত পাঠকসমাজে এই নাটকটি খুবই সমাদৃত হয়। নাটকটি রচিত হয় ১৮৫৯ সালে। বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক নাটক হিসেবে স্বীকৃত শর্মিষ্ঠা। নাটকটির কাহিনী মহাভারতের আদিপর্বে বর্ণিত রাজা যযাতি, শর্মিষ্ঠা ও দেবযানির ত্রিকোন প্রেমের কাহিনী কেন্দ্রিক। নাটকটি মহাভারতের কাহিনীকে উপজীব্য করে পাশ্চাত্য রীতিতে রচিত হয়ছিল। রচনার পর সাফল্যের সাথে পাইকপারা বেলগাছিয়া নাট্যমঞ্চে মঞ্চায়িত হয়। মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁর এই নাটকটি মহাকবি কালিদাসের প্রতি উৎসর্গ করেন। নাটকের চরিত্রসমূহের মধ্যে আছে: শর্মিষ্ঠা–দৈত্যরাজের কন্যা, দেবযানি–দৈত্যগুরু শুক্রাচার্যের একমাত্র কন্যা , যযাতি–চন্দ্রবংশীয় রাজা। কোপিল–দৈত্যগুরু শুক্রাচার্যের শিষ্য, পূর্ণিকা–দেবযানির একান্ত সহচরী, পুরু–রাজা যযাতির কনিষ্ঠপুত্র শুক্রাচার্য–দৈত্যগুরু ।
অসুর রাজের একমাত্র কন্যা শর্মিষ্ঠা এবং দৈত্যগুরু মহর্ষি শুক্রাচার্যের একমাত্র কন্যা দেবযানি পরস্পরের বাল্যসখি। ঘটনাচক্রে তাদের মধ্যে বিবাদ হলে একপর্যায়ে শর্মিষ্ঠা দেবযানিকে একটি কূপে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। একমাত্র কন্যার এই পরিণতির বিষয়ে জ্ঞাত হয়ে শুক্রাচার্য ক্রোধান্ধ হয়ে গেলে অসুররাজ্যকে রক্ষা করতে এবং দৈত্যগুরুর ক্রোধাগ্নিকে প্রশমিত করতে মহর্ষি নির্ধারিত শাস্তি মেনে নিয়ে শর্মিষ্ঠাকে সারাজীবনের জন্য গুরুকন্যা দেবযানির দাসত্ব বরণ করতে হয়। অপরদিকে যখন কূপে নিক্ষিপ্ত দেবযানি বাচার জন্য আকুতি করছিল তখন সেখান দিয়ে অতিক্রম করছিলেন চন্দ্রবংশীয় রাজা যযাতি। দেবযানির আর্তনাদে রাজা দেবযানিকে সেই পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করেন। ঘটনাস্থলেই উভয়ে উভয়ের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে। দেবযানির পরিচয় জেনে রাজা অনতিবিলম্বে সেই স্থান পরিত্যাগ করেন। দেবযানির পিতা শুক্রাচার্য সাধনালব্ধ জ্ঞানের দ্বারা আগে থেকেই কন্যার ক্ষত্রিয়কূলে বিবাহের বিষয়ে পূর্বাভাস পেয়েছিলেন বিধায় স্বীয় কন্যা দেবযানির সখী পূর্ণিকার মাধ্যমে রাজার প্রতি দেবযানির আসক্তির বিষয়ে অবগত হয়ে স্বীয় শিষ্য কপিলের মাধ্যমে রাজা যযাতির নিকট কন্যা দেবযানির বিবাহের প্রস্তাব প্রেরণ করেন। রাজা এবং দেবযানি উভয়র সম্মতিতেই তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং সুখে দিনাতিপাত করতে থাকে। স্বল্পকালের ব্যবধানেই দেবযানির ঘর আলো করে জন্ম লাভ করে এক পুত্র সন্তান।
দেবযানির সাথে দৈত্যকূল হতে শর্মিষ্ঠা দেবযানির দাসি হিসেবে রাজা যযাতির রাজধানী প্রতিষ্ঠানপুরীতে আসে। ঘটনাচক্রে রাজা যযাতির সাথে দাসীরূপী শর্মিষ্ঠার সাক্ষাৎ হয় এবং রাজা ও শর্মিষ্ঠা পরস্পরের প্রতি আকর্ষিত হন। আলাপচারিতায় রাজা শর্মিষ্ঠার প্রকৃত পরিচয় জানতে পারেন। রাজা এবং যযাতি গন্ধর্বমতে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। কিন্তু বিষয়টি দেবযানির নিকট গোপন রাখা হয়। সময়ের পরিক্রমায় শর্মিষ্ঠার গর্ভে ৩ জন পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। একদিন রাজা রাজ মহিষী দেবযানির সাথে বাগানে পরিক্রমণ কালে শর্মিষ্ঠার সন্তানদের শিশুসুলভ সরলতার কারণে রাজা ও শর্মিষ্ঠা গোপন প্রণয় সম্পর্কে অবগত হয়ে ক্রোধান্ধ হয়ে রাজধানী এবং রাজাকে পরিত্যাগ করে সকলের অজ্ঞাতসারে স্বীয় অনুচরী পূর্ণিকার সাথে দৈত্যরাজ্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে।
অন্যদিকে, বিবাহোত্তর সময়ে বহুকাল কন্যার সাক্ষাৎ না পেয়ে কন্যাবাৎসল পিতা দেবগুরু শুক্রাচার্য প্রতিষ্ঠানপুরীর উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। পথিমধ্যে দেবযানির সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। কন্যার পাগলপ্রায় ক্রোধান্ধ মূর্তি দেখে তিনি প্রকৃত তথ্য জানতে পেরে দেবযানিকে শান্ত করার প্রয়াস চালিয়ে ব্যর্থ হন। পিতা দৈত্যগুরু রাজা যযাতিকে অভিশাপ না দিলে দেবযানি দেহত্যাগ করবে এইরূপ শর্তারোপ করলে দৈত্যগুরু বাধ্য হয়ে যযাতিকে জরাগ্রস্ত হওয়ার অভিশাপ প্রদান করেন। পিতৃতূল্য ঋষিশ্রেষ্ঠ শুক্রাচার্যের অভিশাপে রাজা যযাতি জরাগ্রস্ত হয়ে পরমকষ্টে দিনাতিপাত করতে থাকে। অনুচর পূর্ণিকার কথায় দেবযানি স্বীয় ক্রোধান্ধ সিদ্ধান্তে অনুতপ্ত হয়ে পিতার কাছে অভিশাপমোচনের উপায় সম্পর্কে জানতে চাইলে দৈত্যগুরু জানান যে যযাতির কোন পুত্র পিতার অভিশাপ বরণ করলে রাজার শাপমোচন ঘটবে। শেষ পর্যন্ত দেবযানির দুই পুত্র এবং শর্মিষ্ঠার বড় দুই পুত্র পিতার অভিশাপ বরণে অস্বীকৃতি জানালে রাজা তাদের প্রতি রুষ্ঠ হন। অবশেষে শর্মিষ্ঠার কনিষ্ঠ পুত্র পুরু সানন্দচিত্তে পিতার অভিশাপ বরণ করলে রাজা জরামুক্ত হন এবং পুত্র পুরুকে সসাগরা এবং সদ্বীপা পৃথিবীর একচ্ছত্র অধিপতি হওয়ার আশির্বাদ প্রদান করেন।
সর্বশেষে, দৈত্যগুরু শুক্রাচার্য শর্মিষ্ঠাকে শাস্তিমুক্ত করেন এবং দেবযানি সপত্নী শর্মিষ্ঠাকে বরণ করে নেয় এবং নাটকের শুভসমাপ্তি হয়। কেবলমাত্র বাংলাকাব্যক্ষেত্রেই নয়, নাট্যসাহিত্যেও মাইকেল মধুসূদন দত্ত আধুনিকতাকে প্রতিষ্ঠা করেন। সমকালীন নাট্যধারার দুর্বলতাকে মনে রাখলে মধুসূদনের নাট্যকৃতির প্রশংসা করতেই হয়। মধুসূদনের পূর্বে বাংলা নাট্য সাহিত্যে প্রথম শ্রেণির নাটক তখনও কেউ লেখেননি। সরাসরি অনুবাদধর্মী নাটক রচনার দিকেই ছিল সমসাময়িকদের ঝোঁক বেশি। তাও আবার সংস্কৃত নাটকের অনুবাদ। প্রকৃত প্রস্তাবে মধুসূদনই বাংলা নাট্য সাহিত্যে মৌলিক পূর্ণাঙ্গ নাটকের নাট্যকার হিসাবে স্বীকৃত হতে পারেন। তাই নাট্যসাহিত্যের ধারায় মধুসূদনের কৃতিত্ব সাহিত্যিক ও ঐতিহাসিক উভয়দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। সমসাময়িক নিকৃষ্ট মানের যাত্রাগান ও নাটকের দুরাবস্থা মধুসূদনকে রচনায় প্রেরণা দেয়। অলীক নাট্যরূঙ্গে ব্যথিত হয়ে ‘শর্মিষ্ঠা’ নাটকের প্রস্তাবনায় নাট্যকার লিখেছেন–
“অলীক কুনাট্যরঙ্গে
মজে লোক রাঢ়ে বঙ্গে
নিরখিয়া প্রাণে নাহি সয়।
শ্রীহর্ষ প্রণীত ‘রত্নাবলী’ নাটকের ইংরাজী অনুবাদ করতে গিয়ে মধু কবির মনে নাটক লেখার বাসনা জাগে। যদিও মাদ্রাজে থাকার সময় ‘Rizia’ নামক একটি ইংরাজী নাটক কবি লিখেছিলেন, কিন্তু ছাপা হয়নি। এককথায় নাট্যসাহিত্যে মধুসূদনের আবির্ভাব অনেকটা আকস্মিকই বলতে গেলে।”












