ভূত

সত্যব্রত বড়ুয়া

শুক্রবার , ৮ নভেম্বর, ২০১৯ at ৫:৪৩ পূর্বাহ্ণ
39

ভূতে আমার বিশ্বাস নেই, কিন্তু ভূতের ভয় রয়েছে। একা ঘরে থাকতে ভয় পাই। মনে হয় ভূতেরা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। শীতকালে লেপের তলা হতে মাথাটা বের করবার সময় ভাবি এই বুঝি দেখতে পাবো একটা ভূত আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। গ্রামে রাতে একাকী হাঁটবার সময় মনে হয় ভূত আমাকে ‘ফলো’ করছে। মানুষ মরলে ভূত হয়। জানিনা পশু, পাখি, মাছ মরলে কি হয়। আমার ধারণা অন্যান্য প্রাণীরাও ভূত হয়ে আকাশে ঘুরে বেড়ায়। ভূত মানেইতো অতীত। মরলে তাই সবাইকে ভূত হতে হবেই। আপনি যেমন ভূত হবেন তেমনি হবে আপনার পোষা বেড়ালটাও। মুরগিটা হবে পেতনি। মা পেতনির গল্প খুব করতেন। তিনি বলতেন, পেতনিরা নাকি নাকিসুরে কথা বলে। আমি মনে করি আমরা বেঁচে থাকবার সময় যে ধরনের আচরণ করি মরে ভূত হলেও তাই করি। অভ্যেস এমন জিনিস যে তা মরলেও বজায় থাকে। মদখোর ভূত হওয়ার পরও মদ খায়। ঘুষখোর খায় ঘুষ। রাজনীতিবিদরা ভূতের রাজত্বে রাজনীতি করে। সেখানেও নির্বাচন হয়। হয় হরতালও। ভূত সন্ত্রাসীরা মানুষ সন্ত্রাসীদের সাথে মিশে সন্ত্রাস চালায়। লেখকরা ভূত হয়ে যাওয়ার পরও লেখালেখি করেন। ভূত থাকে ছাপাখানাতেও। বইতে তাই, ‘ছাপাখানার ভূতের’ জন্যে ভুল থাকে। অদ্ভুত কিছু ঘটলে আমরা বলি ‘ভূতুড়ে কান্ড’। ‘ভূতুড়ে গল্প’ লিখে অনেক লেখক খ্যাতিমান হয়ে যান। ছেলে বেলায় ভূতের গল্প শুনতে খুব ভালো লাগতো। ভূতের কাহিনি নিয়ে অনেক সিমেনা হয়েছে। সিনেমার ভূত গুলো দেখে মাঝে মাঝে ভয় পেতাম। মানুষ মরে যাওয়ার পর ভূত হলেও পৃথিবীর মায়া ছাড়তে পারেনা। ভূতরা তাই মাঝে মাঝেই পৃথিবীতে বেড়াতে আসে। আমাদের সাথে তারা মিশে যায়। আমাদের জনসংখ্যা যে দিন দিন বাড়ছে এর কারণ শুধু মানুষ নয়, ভূতও। আমাদের ১৭ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে অন্ততপক্ষে ৩ কোটি রয়েছে ভূত। চাকরি জীবনে এক ভদ্রলোকের সাথে আমার সখ্যতা জন্মেছিল। তিনি ভূতে বিশ্বাস করতেন। তাঁর স্ত্রী মরে যাওয়ার পরও নাকি প্রায় প্রতিদিন তাঁকে দেখতে আসেন। মাঝে মাঝে ভদ্রলোককে চা বানিয়ে খাওয়ান। একদিন তাঁর ঘরে ঢুকবার সময় মনে হলো এক ভদ্রমহিলা তাঁর সাথে বসে গল্প করছেন। তবে কী ইনি তাঁর সেই ভূত (পেতনি) স্ত্রী? ভয় পেয়ে কাঁপতে কাঁপতে চলে আসলাম। হঠাৎ একদিন ভদ্রলোক বাসা বদল করে চলে গেলেন। কোথায় গেলেন বুঝতে পারলাম না। কয়েক বছর পর একদিন রাস্তায় দেখা হয়ে গেল। পাশে শিশু সন্তান কোলে এক ভদ্রমহিলাকে দেখলাম। আমার সেই ভূতে বিশ্বাসী সুহৃদটি বললেন, ইনি তাঁর ভূত স্ত্রী। তিনি হেসে বললেন, তাঁর ভূতে কোনো বিশ্বাস নেই। আগে যে তিনি আমাকে স্ত্রীর মরে যাওয়ার কথা বলেছিলেন তা আসলে ‘ভূতুড়ে গল্প’। ভুল বুঝাবুঝির জন্যে তাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে গিয়েছিল। আবার স্ত্রী ফিরে এসেছে। এখন তাঁরা আনন্দেই আছেন। এর পর আর তাদের সাথে আমার কোনদিন দেখা হয়নি। জানিনা তাঁরা মরে ভূত হয়ে গেছেন কিনা। ভূত থাকুক বা নাই থাকুক, আমাদের দেশে কিন্তু এখনও ভূতের ওঝা রয়েছে। এরা ঝাড়ু পিটিয়ে ভূতে পাওয়া মানুষের শরীর হতে ভূত তাড়ায়। আসুন, ঝাড়ু পেটা করে ভূত তাড়াই। কিন্তু ‘সরষের মধ্যে ভূত’ থাকলে তা তাড়ানো যাবে কী?

x