ভূগোলের গোল

কোচিন : পার্ল অফ্‌ এরাবিয়ান সি

ডা: কিউ এম অহিদুল আলম

মঙ্গলবার , ১০ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৪:৪৫ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম থেকে আমরা ডাক্তারদের একটা গ্রুপ দক্ষিণ ভারতের শহর কোচিন-এ গিয়েছিলাম ন্যাপকন বা ফুসফুসের রোগ সম্পর্কিত একটা কনফারেন্সে। আমাদের গ্রুপে ছিলেন অধ্যাপক সুযত পাল, অধ্যাপক সাদেক, ডা. মাহফুজা, অধ্যাপক সোমেন, অধ্যাপক প্রতীক, ডা. সাইফুল, ডা. বিপ্লব, ডা. অরূপ। সবার সাথে সবার পরিচয় ছিল না। কিন্তু যাত্রার শুরু থেকে সবাই এক পরিবারের মতোই যেন হয়ে গেল। মুরুব্বিদের আদর যত্নে ডা. বিপ্লব আর ডা. প্রতীকের সদা উদগ্রীব এটিচুডের প্রশংসা না করে পারা যায় না। অধ্যাপক সুযত আবার আমার লেখক পরিচয়টা যুৎসইভাবে তুলে ধরতে উদগ্রীব।
যাত্রার প্রথম ধাক্কাটা আসল ঢাকা বিমানবন্দরে। স্পাইস জেটের ফ্লাইট তিন ঘণ্টা দেরি। আমাদের মুম্বাই কোচিন ফ্লাইট যে মিস হবে তার আভাস ঢাকা বিমানবন্দরেই আঁচ করলাম। সবাই তরুণ, তাই যা করে আল্লাহ বলে তিন ঘণ্টা দেরিতে মুম্বাই পৌঁছলাম। ভারতে অনেকগুলো প্রাইভেট এয়ারলাইন্স। সবার অবস্থায় সঙ্গীন। জায়েন্ট এয়ার জেট, কিংফিশার মুখ থুবড়ে বন্ধ হয়ে গেছে। অগত্যা আমাদেরকে মুম্বাইয়ে হোটেলে থাকতে হল। পরদিন বিকেলে কোচিন রওনা। কাজেই পুরোদিন পাওয়া গেল মুম্বাই ঘোরার। যারা প্রথমবার এল তাদেরকে ডা. সুযত গাইড লাইন দিলেন। সবাই ছোট ছোট গ্রুপে মুম্বাই দেখলেন। ভারতে বাংলাদেশিদের জন্য মোবাইলের সিম কার্ড পাওয়া একেবারে অসম্ভব। এয়ারপোর্টে মিললেও দাম কেন চার গুণ বেশি অজ্ঞাত। ভারতে ব্যুরোক্রেসি ঔপনিবেশিক- যুক্তির তারা খুব ধার ধারেন না। আইনের হেফাজতকারী। আজকে যেখানে মোবাইল ফোন আর জীবন রক্ষাকারী বাতাস প্রায় সম-জরুরি সেখানে মোবাইল সিম পেতে ভারতীয় আইন কতটুকু যুক্তিযুক্ত তা দেখা যাক। তবে এ কারবার আমি পৃথিবীর কোন দেশে দেখিনি। দুইজন ভারতীয় নাগরিকের টেলিফোন প্রয়োজন। একজন বিদেশির কিভাবে দুজন ভারতীয় নাগরিকের টেলিফোন থাকতে পারে তা আমার বোধগম্য নয়। যেখানে বিদেশির পাসপোর্টের কপি থাকছে সেখানে দুই ভারতীয় নাগরিকের টেলিফোন কেন প্রয়োজন তা একমাত্র তারাই জানেন।
ভারতের এয়ারপোর্টের চেক-ইন অনেকটা ‘কেয়ামত সে কেয়ামত’-এর মত। খুব ধীর। অনেকে কার্নেকটিং প্লেনও মিস করেন। এখানে বলে রাখা ভাল মার্কিন মুল্লুকে ১/১১ এর পর তারা সারা বিশ্বের এয়ারপোর্টে এ ধরনের চেক-ইন চালু করে। এর জন্য এয়ারলাইনগুলো মার্কিনীদেরকে বার্ষিক একটা ফিসও দেয়।
আমরা রাত ৮টায় কোচিন পৌঁছলাম। অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন ও কোচিন ঐতিহ্যের স্থাপত্যের নিদর্শন দৃশ্যমান। কোচিন আরব সাগরের দক্ষিণ পশ্চিমের অত্যন্ত প্রাচীন বাণিজ্য কেন্দ্র ও বন্দর। কোচিন এয়ারপোর্টের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটি ভারতের সবচেয়ে দীর্ঘতম রানওয়ের অধিকারী। একজন ব্যক্তি এই রানওয়ে নির্মাণ করেন। তার নাম ইউসুফ আলী। তার ব্যবসা পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ও আফ্রিকায়। এর নাম লুলু। পুরো কেরলায় লুলুর বহু প্রতিষ্ঠান। আমাদের কনফারেন্স ও তার প্রতিষ্ঠিত কনভেনশন হলে। সেখানে একত্রে ৬০০০ মানুষের অনুষ্ঠান চলতে পারে। ৬টি হলে। আমাদের কনফারেন্সে উপস্থিতি ছিল প্রায় তিন হাজার। কোচিনে ইউসুফ আলীর হোটেল গ্রান্ড হায়াতসহ বহু সুপার কাপ আছে। কোচিনের লুলু শপিং মল এশিয়ার বৃহত্তম।
কোচিন শহরের পরতে পরতে ইতিহাস। এখানে যিশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার পরপরই খ্রীস্টনিটি, ইহুদি ও আরবদের গমনাগমন দেখা যায়। এখানকার সেন্টফ্রান্সি গীর্জা ও ইহুদিদের সিনাগগ ইতিহাস সমৃদ্ধ। পাক-ভারত উপকূলে কোচিনেই প্রথম ইউরোপিয়ানদের ব্যবস্থা কেন্দ্র গড়ে ওঠে। সুরাত ও চেন্নাইয়ের বহু পূর্বে। প্রথম ইউরোপিয়ান হচ্ছে পর্তুগিজরা। তারা মূলত: লং, এলাচি ও অন্যান্য মসলাদির খোঁজে কোচিন আসে। কোচিন থেকে উত্তরে কালিকটে ভাস্কো-ডা-গামা ‘কাপাড বিচে’ ১৪৯৮ সালে অবতরণ করেন। ভাস্কো-ডা-গামার সমাধি ফের্ট কোচির সেন্ট ফ্রান্সিস চার্চে ছিল। ১৫৩৯ সালে অর্থাৎ তার মৃত্যুর ১৫ বছর পরে তার শবদেহ পর্তুগালে নিয়ে যাওয়া হয়।
পর্তুগিজদের পরে ডাচরা ও তারপরে ব্রিটিশরা কোচিন দখল করে। পাক ভারত উপমহাদেশে প্রথম মিউনিসিপ্যালটি চালু হয় কোচিনে ১৬৬৪ সালে ডাচদের দ্বারা।
বর্তমানে কোচিন অত্যন্ত প্রভাবশালী একটি শহর। শিল্প, বাণিজ্য, পেট্রো কেমিকেল, ভারতীয় নৌ বাহিনীর সাউদার্ন কমান্ড, ইপিজেডসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এখানে অবস্থিত। ভারতের ৪র্থ বৃহত্তম ব্যাংক ফেডারেল ব্যাংকের প্রধান অফিসও কোচিনে।
এটি মাত্র ২২ লক্ষ লোকের শহর। মেট্রো রেল চালু আছে কয়েক বছর থেকে। কোচিন সম্বন্ধে কয়েকটি তথ্য সত্যিই অবাক হবার মত। পৃথিবীর ৪৪০টা শহর ২০২৫ সালের মধ্যে বিশ্বের জিডিপির ৫০% প্রস্তুত করবে। এই ৪৪০ শহরের মধ্যে ভারতের ২৮টা শহর আছে। তার মধ্যে কোচিন ওপরের দিকে। অক্টোবর ২০১৯ সালে পৃথিবীর ট্যুরিস্ট গন্তব্যের ১০টি শহরের মধ্যে কোচিনের স্থান ৭ম।
কোচিন আরব সাগরের তীরে। একে আরব সাগরের ‘হীরে’ বলা হয়। কোচিন শহরের কাছেই বিখ্যাত ব্যাক-ওয়াটার অর্থাৎ সাগরের গাড়ি। এখানে অসংখ্য নৌকা বা হাউজ বোটে বিশ্বের তাবৎ দেশের ট্যুরিস্টা ভেসে বেড়ায়। দু’পাশে শুধু নারকেল গাছ আর নারকেল গাছ। এক প্রশান্ত পরিবেশ। এটা আসলেই না দেখলে বোঝার উপায় নেই। নৌকাগুলোর ভিতরে হোটেল রুমের মত ৪ স্টার, ৫ স্টার সুবিধাও আছে। পর্যটকদেরকে নৌকায় রান্না করা মাছ দিয়ে ভাত পরিবেশন করা হয়। আরেকটা উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হচ্ছে নৌকার ইঞ্জিনগুলো সাউণ্ড-প্রুফ। কোন শব্দ দূষণ নেই, আবার তেল, পেট্রোল-ডিজেল ও পানিতে পড়ে না, তারা পরিবেশ দূষণ সম্বন্ধে অত্যন্ত সচেতন।
কোচিনের অদূরে পাহাড়ি অঞ্চল আথিরা পিল্লী নামক স্থানে অত্যন্ত মনোরম দুটো জলপ্রপাত আছে। সেখানে প্রচুর পর্যটকদের সমাবেশ ঘটে। ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এক সুচিন্তিত মেলবন্ধন দেখলাম কোচিনে। সবচেয়ে সুন্দর হল মানুষের ঘরগুলো, চার্চ ও মসজিদগুলো। ইউরোপেও এত সুন্দর ঘর ও চার্চ দেখা যায় না। এই অঞ্চলে খ্রিস্টানের সংখ্যা বেশি, মুসলিমদের মসজিদগুলোও মনোরম। এখানে গরুর গোস্ত নিষিদ্ধ নয়। আমাদের এখানে চিকেন আর মাটন বিরানি খায় লোকজন। কোচিনে চিকেন আর বিফ বিরানি দেখলাম। ওদের এই বিরানি অত্যন্ত সুস্বাদু। তাদের সমবায় সমিতির দোকানগুলো একশ বছর পুরানো। ওগুলো এখনো বড় কর্পোরেটদের সাথে পাল্লা দিয়ে ব্যবসা করছে। শুধু মসলার সুপার শপও দেখলাম। আরেকটি বিখ্যাত খাবার ‘কালিকট হালুয়া’। ফেরার পথে সবাই টুকটাক কিনেছিলাম। কিন্তু ডা. বিপ্লবের লাগেজ তিন জনে শেয়ার করতে হয়েছিল। সে হালুয়াই কিনেছিল কয়েক ফিলে। নবীন-প্রবীণের এই ভ্রমণ বেশ উপভোগ্য ছিল।

x