ভূগোলের গোল

ডাঃ কিউ এম অহিদুল আলম | মঙ্গলবার , ২০ ডিসেম্বর, ২০২২ at ১০:২৭ পূর্বাহ্ণ

লুংগীতে কমফোর্ট

আমি বরাবর ভোর-সকালে মর্নিং ওয়াক করা মানুষ। দুই যুগ আগেও মানুষ এত সকালের হাঁটাটা হাটত না, এখন চট্টগ্রাম-ঢাকার সকালে সবুজ-ঘেরা স্থানগুলো লোকে লোকারণ্য। আমার বর্তমান বসবাসটা চট্টগ্রাম শহরের আদি আবাসিক এলাকার একটি। আমার সাথে যারা হাঁটতেন দশ বছর আগে তাদের সবাই প্রয়াত -এ কথা বললে পরের দিন অনেকে আর হাঁটতে রাজী হয় না কারণ মৃত্যু ভয়।

আমি বিগত ৩০ বছর যাবত থাকা বর্তমান আবাসিক এলাকায় মর্নিং ওয়াক করি। আমি সহ পাঁচজন হাঁটতাম। একজন ছিলেন তৎকালে বাংলাদেশের প্রখ্যাত শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ শাহাদাৎ স্যার। বাকিরা আমার থেকে বয়সে ১৫ বছরের বড়। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে শাহাদাৎ স্যার আগা গোড়া লুংগী পরিহিত। সেই যুগের বিলাতের এম- আর, সিপি। আমি মনে সাহস পেলাম। লুংগী ছাড়লাম না, আসলে সকালে একবার বদলানো, হেঁটে এসে আবার বদলানো শুধু ঝামেলার কারণেই লুংগী ছাড়লাম না। শাহাদাৎ স্যার প্রয়াত। এই এলাকায় এখন হাঁটার মানুষ বেড়ে গিয়েছে। সবার আলোচনার বিষয় লুংগী-পরা ডাক্তার।

আমার লুঙ্গীটা যেন ‘ব্র্যান্ড’ হয়ে গেছে। কয়েকদিন আগে এক তরুণ মর্নিং ওয়াকার আমাকে থামিয়ে বলল – I wonder how you continue to walk with Lungi for so long yrs, তরুন আমার সাথে লুংগী পরা অবস্থায় একটা ফটো তুলতে চাইল। সে এইটা সমস্ত গ্রুপে ছড়িয়ে দিল। সে আমাকে আবার লুংগী সম্বন্ধেও লিখতে বলল। লুংগী শব্দটা মূলতঃ বার্মা ভাষার ‘লৌঙ্গী’ থেকে আগত। কিছু দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ুর ‘ভৈস্তি’ নামক পরণ লুংগীর পূর্বসূরী। তামিলনাড়ুর জেলে সমপ্রদায় এই লূণ ব্যবিলন সহ পশ্চিম আফ্রিকায় রফতানী করত। ব্যবিলনের প্রত্নতাত্তিক নিবন্ধে ‘সিন্ধু’ শব্দের উল্লেখ দেখা যায় যার অর্থ- পোশাক। চেন্নাই এর বিখ্যাত আবু বকর লুংগী সম্ভবতঃ আদি লুংগীরই আধুনিক সংস্করণ।

ভারত, বাংলাদেশ, বার্মা, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা প্রভৃতি অঞ্চলে লুংগী বিভিন্ন পরিবর্তিত রূপে ব্যবহৃত হয় ।

কেরালায় লুংগীকে মুন্ডু বলে। ওখানে বিয়ে-শাদিতে, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান, পূজা পার্বণে মুন্ডু পরা হয়। তবে সাদা ও পাড় ওয়ালা লুংগী বিশেষ অনুষ্ঠানে ও সাধারণ লুংগী সব সময় পরা হয়। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানেও মুন্ডু পরা হয়। মজার ব্যাপার হল লুংগী হাঁটুর উপরে ভাজ করে চলা কেরালাতে মোটেই এটিকেট- বহির্ভূত নয়। তামিলনাড়ুতে হাঁটুর বরাবর গোছ মেরে হাঁটে, পাঞ্জাবে লুংগীকে “তেহমত” বলে। ওরা লুংগী পড়ে জবরদস্ত নাচে।

থাইল্যান্ডে পুরুষের লুংগীকে পা কাওমা বলে, মহিলাদের লুংগীকে আ-প-টুং বলে। মালয়েশিয়ার লুংগীগুলো জমকালো। এই লুংগীকে ‘বাজু কুরং বলে। এটা তাদের জাতীয় পোশাক। একই রকম লুংগী ইন্দোনেশিয়াতে এবং ব্রুনাইতেও পরে।

প্রতিবেশি বার্মাতে লুংগী জাতীয় পোশাক, মহিলারা এক ধরনের লুংগী পরে ওটাকে ‘থামি’ বলে। এই থামি পুরো চট্টগ্রাম অঞ্চলের মহিলারা পরত যা আজকাল দেখা যায় না। তবে রোহিঙ্গা মহিলাদের এখনো থামি পড়তে দেখা যায়, বার্মিজরা শার্ট ‘ইন’ করেই লুংগী পড়ে। দক্ষিণ চট্টগ্রামে দুই দশক আগেও মানুষ শাট ইন করে লুংগী পড়ত।

কালের বিবর্তণে লুংগী গেয়ো ড্রেস হয়ে গিয়েছে। আমাদের সবারই- বাপ-দাদা লুংগী পড়েছেন। স্কুলেও লুংগী পড়ে যাওয়া হত। কোন হীনম্মন্যতা থেকে লুংগী নির্বাসনে গেল বোঝা দুষ্কর, বঙ্গবন্ধু কে সকালে নাস্তা খাওয়ার আগে চট্টগ্রামে- শাজাহান হোটেলে আমি লুংগী পরা অবস্থায় বসে ছাত্রদের সাথে কথা বলতে দেখেছি, খুব সম্ভবত ১৯৬৯-৭০ সালে। কোলকাতার মেট্রো সিনেমা ছিল ‘এলিটদের’ সিনেমা হল। শেরে বাংলা ফজলুল হক প্রথমবার কোলকাতার মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হলে কলকাতার কসাইরা দল বেঁধে হক সাহেরের কাছে এক বায়না ধরল। তখন লুংগী পরে মেট্রো সিনেমায় ঢোকা যেতনা, কসাইদের তো আর প্যান্ট নেই। তারা মুখ্যমন্ত্রীর সাথে লুংগী পরে মেট্রো সিনেমায় ঢোকার পারমিশন চাইল। মুখমন্ত্রী নিজেও লুংগী পরে কসাইদেরকে নিয়ে মেট্রো সিনেমায় এক সিনেমা দেখলেন, হক সাহেব বৃটিশদের সামনে লুংগীর কদর বাড়িয়ে দিলেন।

বাংলাদেশের আরেক নেতা মাওলানা ভাসানী লুংগী আর মাথায় তালপাতার টুপী পরতেন। অনেক রাজনীতিবিদ নির্বাচনী প্রচারে মাওলানা সহেবকে নিতেন ভোট-প্রচারনায়। লুংগী-টুপী আমজনতার কাছের জিনিস, ওটা দেখেই মওলানার প্রার্থীকে জনতা জিতিয়ে আনতেন, তারপর এম-পি- মন্ত্রী হওয়ার পর এরাই বলতেন ধুর! লুংগী টুপিওয়ালা কি বোঝে?

একবার চীন থেকে সফর শেষে ফেরার পথে করাচীতে মওলানা ভাসানী একটা বিরতি করেন। করাচীর মেয়র ভাসানী সাহেবকে একটা নাগবিক সম্বর্ধনা দেন। তিনি যখন লুংগী-টুপি নিয়ে মঞ্চে ওঠেন পাবলিক বলে ওঠে,ইয়ে কেয়া লীডার আয়া বাংগাল ছে, ইয়ে তো এক মিসকিন হ্যায়। উনি যখন রাজনৈতিক বক্তব্য শুরু করেন পাবলিক বলতে থাকে, কেয়া বাত হায়। ইয়ে তো পলিটিশিয়ান হায়, ভাসানি সাহেব যখন বিশ্বপরিস্থিতি নিয়ে মার্কিনী আর রাশিয়ানদের ধোলাই করলেন তখন পাবলিক বলে ওঠে, লুংগী ওয়ালেতো বড় স্টেটমান হ্যায়।

ভাসানী ইউরোপ গিয়েছিলেন লুংগী কিন্তু ছাড়েননি। এরশাদের আমলে জাতিসংঘে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত লুংগী পরে পরিচয় দিয়েছিলেন মহাসচিবকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এককালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ডঃ সৈয়দ সিরাজুল ইসলাম সাহেব কানাডার লেইকহেড ভার্সিটিতে কর্মরত অবস্থায় এক কানাডীয় সহকর্মীকে একটা লুংগী উপহার দেন। পরের দিন ঐ অধ্যাপক লুংগী পরে ক্লাসে এসেছিলেন। তার মন্তব্য বেশ আরামদায়ক (comfortable) পরিধেয়। ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অফ মালয়ে পৃথিবীর ১১৫টি দেশের শিক্ষক-ছাত্র আছে, ওখানে অনেকে মালয়ী লুংগী বা সারোং পরে দিব্যি ক্লাস করেন। কোন বাধা নেই, এক বসনিয়ান ছাত্র লুংগী পরার পর মন্তব্য দুনিয়ার সবচেয়ে আরামদায়ক পোশাক-লুংগী।

লুংগী পরে সবচেয়ে বিব্রত বোধ করতাম সত্তর দশকে পূর্ব ইউরোপে অধ্যয়নকালে। সেখানে একই হোস্টেলে ছেলে-মেয়ে থাকত। আমার ফ্লোরে কিছু ভিয়েতনামী মেয়ে থাকত। ওরা লুংগী পড়ত। পুরুষ মানুষ বাংলাদেশে লুংগী পরে, এটা তাদের কাছে অত্যন্ত হাস্যকর ব্যাপার ছিল। লুংগী পড়া আমাকে দেখলেই একজন আরো ৫/৭ জনকে ডেকে বের করত আর হাসিতে ফেটে পড়ত। কাজেই হোস্টেলে লুঙ্গি পরলে ভিয়েতনামি মেয়েরা যাতে না দেখে সেদিকে খুব সতর্ক থাকতাম।

তবে লুঙ্গি যে একেবারে ফেলনা নয় তা প্রকাশ্যে আসে শাহরুখ খান এর ২০১৩ সালের হিট ছবি “চেন্নাই এক্সপ্রেস” এর একটা গান লুঙ্গি ডান্স এর মাধ্যমে। নামী-দামী মুম্বাই নায়করা লুংগীকে একেবারে মাত করে দিয়েছেন। এর পরও লুংগী নিয়ে উন্নাসিকতা অবশ্য পরিত্যাজ্য।

পোশাকের তিনটি গুণ থাকা চাই, ১) লজ্জা নিবারন ২) ক্ষতিকর প্রকৃতি থেকে রক্ষা (৩) সৌন্দর্য উপকরণ। লুংগী তো স্বাধীন-স্বকীয়তার প্রতীক। আমাদের পূর্বপুরুষ লুঙ্গি পড়েছেন। প্যান্ট, ট্র্যাক পাজামা পরাধীনতার যুগের উপহার Disgusting মনোভাব কেন পরনে থাকবে সেটা বোধগম্য, রবীন্দ্র উপলব্ধি দিয়ে বললে পাশ্চাত্যের লুঙ্গী পরনে কোন লোককে টাকা দিলেও সে কাঁটা চামচ ছাড়া হাতে খাবে না, আবার ধুতি-লুংগীও পরবে না। আমাদের আচার-আচরণে পাশ্চাত্যের নিঃশর্ত অনুকরণ অবধারিত। তবে কোন তাত্ত্বিক কারণে নয়, আমি, মর্নিং ওয়াকের লুঙ্গি পড়াটা স্রেফ comfort বা আরামদায়ক বলে, ছাড়তে নারাজ।

লেখক : কলামিস্ট, প্রাবন্ধিক, চিকিৎসক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধএকটি ধ্রুবতারা যার আরেক নাম ‘মুশতারী শফী’
পরবর্তী নিবন্ধবৃহৎ দেশগুলোতে পোশাক রপ্তানির প্রবৃদ্ধি উৎসাহব্যঞ্জক