আমি গ্রামের স্কুলে লেখাপড়া করেছি। তবে স্কুলটা ছিল চৌকস, শিক্ষকরা ও ছিলেন জ্ঞানের ভান্ডার। এটা ষাটের দশকের কথা, শিক্ষকদের একটা বড় অংশ বামপন্থী ধ্যান ধারণার, স্কুল লাইব্রেরীতে নামিদামি অনেক বই ছিল। প্রতি বৃহস্পতিবার ১৫ দিনের জন্য বই বরাদ্দ হতো। ১৫ দিন পর শিক্ষকরা ওই বই সম্বন্ধে ছাত্রদের থেকে জানতেন। বাংলা প্রথম পত্রের শিক্ষক বঙ্কিমের গল্প কি পড়াতেন তার হয় তো সামান্যই বুঝতাম গ্রামের সন্তানরা। তবে মানুষটা বেজায় রসিক ছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশে আমার শিক্ষক ইউএনও হয়েছিলেন।
ভদ্রলোক আমার পাশের গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত সমাজকর্মী ও রাজনৈতিক সম্বন্ধে এক হাসির গল্প করতেন। এই সমাজকর্মী ১৯৬১ সালে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের সফরসঙ্গী হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছিলেন। তখন তিনি আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জনসনের সাথে হ্যান্ডশেক করেছিলেন। এরপর থেকে তিনি নাকি যেই হাতে হ্যান্ডশেক করেছিলেন অর্থাৎ ডান হাতে আর ভাত খেতেন না। আমি অপেক্ষমান জনতার কাতার থেকে বৃটেনের প্রয়াত রানী এলিজাবেথের হাতের “হ্যান্ডসেক নয়” দ্রুত স্পর্শ পেয়েছিলাম। প্রেসিডেন্ট জনসনের হ্যান্ডশেক আর আমার হাত-স্পর্শ “হিমালয় আর ছাগলের ঘাস খাওয়ার মত তুলনা”। অতএব আমি ডান হাতেই ভাত খাই। সেই গল্প পরে।
রানী এলিজাবেথ আইয়ুব খানের সাথে পূর্ব পাকিস্তান আসলে তাকে রমনা গার্ডেনে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সেই সংবর্ধনায় সারাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিশিষ্ট নাগরিকদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। আমার প্রয়াত পিতা ও দাওয়াতনামা হাতে এই সংবর্ধনায় ছিলেন।
ছাত্র জীবনে বুলগেরিয়ায় ডাক্তারি পড়ার সময় আমাদের একটা ইন্টারন্যাশনাল ছাত্র কার্ড দেওয়া হত। এই কার্ড ব্যবহার করে ট্রেনে সস্তায় ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যাওয়ার এক সুযোগ থাকতো। দীর্ঘ ছুটিতে ছাত্ররা বভিন্ন দেশে যেত। আমি মাঝে মাঝে বিলাত যেতাম। শনিবার রোববার “গরিব ছাত্র” হিসেবে লন্ডন দেখার চেষ্টা করতাম। একটু ঘুরতাম সেন্ট্রাল লন্ডনে। একদিন ওয়েস্ট এনডে হাটতে ছিলাম। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। লেচেস্টার স্কয়ারে অডিয়ন সিনেমা হলের সামনে দেখলাম ছাতা খুলে অনেক দর্শক দাঁড়িয়ে আছে। জিজ্ঞেস করলাম এখানে কি হচ্ছে ভাই। বললেন মেরলিন মনরোর একটা ফিল্ম এর ‘প্রিমিয়ার শো’ হবে। তাই সবাই দাঁড়িযে আছে রানীকে কাছ থেকে দেখার জন্য। ছাতা হাতে আমি ও রং তামাশা দেখার জন্য দাড়িয়ে গেলাম। ছাতা হাতে ব্রিটিশরা রাজপ্রসাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে অন্য টুরিস্টদের সাথে। আবার কখনো রানীর অশ্ব-শাকট যাবে। শুনলেই রাস্তার দু’পাশে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। যাহোক দেখলাম এক এক অভিজাত অতিথি গাড়ি থেকে নামেন। পাইক-পেয়াদারা দরজা খুলে দেয়। সবাই হাততালি দেয়। আমিও তামাশা দেখতে দেখতে লাইনের সামনে চলে এলাম। সবশেষে রানী অশ্ব-শাকটে নামলেন। সবাই করতালি দিলাম। জনতার লাইনে এলেন। আমরা সামনের সারির সবাই হাত এগিয়ে দিলাম। কারোটা লাগলো, কারোটা শূন্য। আমার হাতটা ও আর দশটা হাতের মত গ্লাভস ওয়ালি হাতের স্পর্শ করেছিলাম। রানী অডিয়ন সিনেমার ভিতরে ঢুকলে জনতা আবারও যে যার কামে ছুটলো। আমি ও বৃষ্টি ভেজা ফুটপাত দিয়ে বাঙালের মত হেঁটে চললাম। রানীর হস্তস্পর্শন (কর্মমদন নয়) তখন আমার মনে কোন অনুভূতিই ঊর্দেক করিনি। এখন ভাবি, আরে উনি তো দীর্ঘ রাজত্বকারী এক রানী আরে!
উনার দীর্ঘ সত্তর বছরের রাজত্বের রানী ১৫ জন প্রধানমন্ত্রী সাথে কাজ করেছেন। তাদের প্রথম ছিলেন উইনস্টর্ন চার্চিল। এই জাদরেল নেতাকে ব্রিটিশদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব বলে একটি সার্ভেতে উঠে এসেছে। চার্চিল উল্টা সিধা মন্তব্য করেননি এমন কোন নজির নেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে ‘দ্যা গ্রেট বেঙ্গল ফেমিন’ বা বাংলায় দুর্ভিক্ষের খবর চার্চিলের কাছে পৌঁছেলে তার মন্তব্য ছিল এত মানুষ মরলে গান্ধী (ন্যাংটা ফকির এই নামেই চার্চিল তাকে ডাকতেন) মরেনি কেন? রানীর প্রথম প্রধানমন্ত্রী চার্চিল অভিষেকের পরে বলেছিলেন – She is a childসে একটা ছুকরী! কিছুদিন পর আবার বলেছিলেন ফিল্ম জগতের লোকজন সারা বিশ্ব চুষে বেড়ালে ও রানীর মত মানুষ পাবে না। চার্চিলের মৃত্যুর পর রানী নিজ হাতে একটি প্রশংসামূলক পত্র লিখেছিলেন। দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী এন্থনি মাত্র দুই বছর ছিলেন। তৃতীয় প্রধানমন্ত্রী মেকমিলন রানীর ধ্যান ধারণার বিরোধী ছিলেন। তবে মার্কিন নভোচারী গ্লেন মহাশূন্য গেলে ১৯৬২ সালে দুইজন একত্রে রেডিওতে খবর শুনছিলেন চতুর্থ প্রধানমন্ত্রী আলেস ডর্গনাস ও রানী দুইজনেই কুকুর প্রেমিক ছিলেন ও কুকুর বিষয়ক আলাপ করতেন। পঞ্চম প্রধানমন্ত্রী হ্যারল্ড উইলসন রানী যেখানে মৃত্যুবরণ করেন সেখানে রানীর সাথে ‘পিকনিক’ এ গিয়েছিলেন। ষষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হীথ দু-চার কথায় রানীর সাথে সাক্ষাৎ শেষ করতেন। সপ্তম প্রধানমন্ত্রী ক্যালাহান রানীর রসবোধক আলাপ উপভোগ করতেন। অষ্টম প্রধানমন্ত্রী থ্যাচারকে রানী বেশ সমীহ করতেন এবং রাজকীয় প্রটোকলের বাইরে তার শেষকৃত্যে যোগ দেন। ৯ম প্রধানমন্ত্রী জন মেজরের সময়ে রানীর চার্লস ডায়ানার বিচ্ছেদ, ডায়না মৃত্যু ঘটে। জান মেজর ডায়নার দুই সন্তানের খোঁজখবর নিতেন বিধায় রানী তার উপর বেশ খুশি ছিলেন। দশম প্রধানমন্ত্রী রানীর বারবিকিউ পার্টিতে যোগ দিয়ে ওদের পারিবারিক রান্না, রানী বাসন ধোয়া ইত্যাদি নিয়ে ‘অ ঔড়ঁৎহবু’ বইয়ে লিখেন ও রানী তার উপর বেজায় নাখোশ হন। ১১ তম প্রধানমন্ত্রী গার্ডন ব্রাউন এর সাথে কেবল আনুষ্ঠানিক সম্পর্কই ছিল। ১২ তম প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরণ রানীর টেলিফোন আলাপ নিউ ইয়র্ক মেয়রকে উদ্ধৃত করলে রানীর কাছে ক্ষমা চাইতে হয়, ক্যামেরণ রানীর বড় নাতির ক্লাসমেট ও বিখ্যাত ইটন কলেজের ছাত্র। ১৩ তম প্রধানমন্ত্রী ও দ্বিতীয় মহিলা প্রধানমন্ত্রী ব্রেঙিট পরবর্তী অবস্থায় পদত্যাগ করলে রানী দুঃখিত হন। ১৪ তম প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের কার্যকলাপে রানী মর্মাহত হন। কিন্তু তার সন্তান লাভে তাকে শুভেচ্ছা কার্ড পাঠান। ১৫ তম প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাস, তার শপথ নেওয়ার পরপরই রানী প্রয়াত হন।
এ প্রসঙ্গে রাজা-বাদশাদের জৌলুসের বিপরীতে দিল্লির আধ্যাত্মিক সাধক নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার জীবনের একটা দিক উল্লেখ করতে হয়, নিজামুদ্দিন আউলিয়ার ৪৪ বছরের বুজুর্গ জীবনে দিল্লির মসনদে ৯ জন বাদশাহ ছিলেন। তাদের প্রত্যেকে নিজামুদ্দিন আউলিয়াকে রাজ দরবারে যাওয়ার আমন্ত্রণ করতেন। কিন্তু কোন বাদশাই এই আধ্যাত্মিক সাধককে রাজ দরবারে নিতে পারেননি।
৭০ বছর রাণী থাকা সহজ কথা নয়। কিছু মানুষ রাজতন্ত্রের বিরােধী থাকলেও রানী আসলেই ব্রিটিশ ঐতিহ্য, এলিগেন্স ও আভিজাত্যের প্রতীক। আমার পাশের এলাকার মুরুব্বী জনসনের সাথে কর্মমোদন করে আর ডানহাতে ভাত খাননি। আমি রানীর গ্লাভস পড়া হাতের স্পর্শ (করমর্দন নয়) পেয়েও বাংগালেই রয়ে গেলাম। ডানহাতে খাওয়া চালিয়ে যাচ্ছি।
লেখক : প্রাবন্ধিক, চিকিৎসক, কলামিস্ট











