বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের চট্টগ্রাম সফরকে কেন্দ্র করে দলীয় নেতাকর্মীদের উচ্ছ্বাস–আনন্দের পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে অনেকের মাঝেই ছিল কৌতূহল। দলীয় রাজনীতি না করলেও তারেককে একটু দেখতে, তাঁর বক্তব্য শুনতে সমাবেশে এবং ইয়ুথ পলিসি টকে গিয়েছিলেন অনেকে। আর তারেকও ছিলেন উচ্ছ্বসিত। জ্বর–কাশিতে আক্রান্ত হলেও তাঁর উজ্জ্বলতা কমেনি। শনিবার রাতে চট্টগ্রামে এসে তিনি উঠেছিলেন হোটেল রেডিসন ব্লুতে। রাতে নগর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সাথে বৈঠক করার কথা থাকলেও সেটা করেননি। তবে গতকাল সকালে ‘দ্য প্ল্যান : ইয়ুথ পলিসি টক উইথ তারেক রহমান’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে সাবলীলভাবে কথা বলেন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এবং বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।
পলোগ্রাউন্ডের সমাবেশ ঘিরে দেখা গেছে উৎসবের আমেজ। ভোর থেকে নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ড, উপজেলা, কক্সবাজার ও তিন পার্বত্য জেলা থেকে ব্যানার, ফেস্টুন, রঙবেরঙের পোশাক পরে, বাদ্য বাজিয়ে মিছিল নিয়ে লোকজনকে আসতে দেখা গেছে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠে পলোগ্রাউন্ড মাঠ।
দেশে ফেরার এক মাস পর চট্টগ্রামে তারেক : প্রায় ১৭ বছর লন্ডনে নির্বাসনে কাটিয়ে গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন তারেক রহমান। এক মাস পর ২৫ জানুয়ারি চট্টগ্রামে সমাবেশ করলেন তিনি। দেশের মাটিতে ফিরে প্রথম বক্তব্যে তারেক রহমান মার্টিন লুথার কিংকে উদ্ধৃত করে বলেছিলেন, আই হ্যাভ আ প্ল্যান। তাঁর সেই বক্তব্য প্রশংসিত হয়েছিল। চট্টগ্রামেও তিনি কলেজ–বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে ‘দ্য প্ল্যান : ইয়ুথ পলিসি টক উইথ তারেক রহমান’ শীর্ষক একটি অনুষ্ঠান করেন। তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাগুলোও শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরেন।
নিজেই বললেন জ্বর ও কাশির কথা : ইয়ুথ পলিসি টক অনুষ্ঠানে মঞ্চে উঠে তিনি সালাম দিয়ে সবাই কেমন আছে জানতে চান। শিক্ষার্থীরা উচ্ছ্বসিত হয়ে ভালো থাকার কথা জানান। শিক্ষার্থীদের পাল্টা প্রশ্ন ছিল, আপনি কেমন আছেন? তারেক রহমান হাসলেন। বললেন, একটু জ্বর আর কাশি আছে। তবুও ভালো আছি। আলহামদুলিল্লাহ।
‘ভাইয়া’ বললে ভালো লাগবে, ‘স্যার’ বলার দরকার নেই : প্রশ্ন পর্বের শুরুতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী তাসনুবা তাশরি মাইক হাতে নিয়ে ‘স্যার’ সম্বোধন করে প্রশ্ন করতে যাচ্ছিলেন। তারেক রহমান তাকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, আপনি বা আপনারা যারা আমাকে প্রশ্ন করবেন, হয় আমাকে ‘ভাইয়া’ বলতে পারেন অথবা ‘আংকেল’ বলতে পারেন।
তাঁর কথা শোনার পর করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে রেডিসনের মেজবান হল। তারেক রহমান একটু হেসে বলেন, বয়সের হিসাবে ‘আংকেল’ বলতে পারেন। তবে ‘আংকেল’ ডাকটি শুনতে খুব একটা পছন্দ করব না। ‘ভাইয়া’ বললে ভালো লাগবে, স্যার বলার দরকার নেই। ‘স্যার’ ডাকা তরুণী পরবর্তীতে ভাইয়া সম্বোধন করে প্রশ্ন করেন, নির্বাচিত হলে উদ্যোক্তাদের সহায়তায় কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে? অর্থায়নের বিকল্প কোনো পথ আছে?
অনেরা ক্যান আছেন? : পলোগ্রাউন্ডের সমাবেশে বক্তৃতা করতে উঠে সবাইকে দুইবার সালাম দেন তারেক রহমান। এরপর হাত প্রসারিত করে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলেন, অনেরা ক্যান আছেন? এই প্রশ্নও তিনি দুইবার করেন। উচ্চারণ সঠিক না হলেও তারেকের চাটগাঁইয়া বলার চেষ্টায় উপস্থিত লাখো জনতা উচ্ছ্বসিত হন।
স্ত্রীর বানানো পতাকা বিক্রি করেন প্রদীপ : যেখানে রাজনৈতিক সমাবেশ সেখানেই প্রদীপ দাশ পতাকা বিক্রি করেন। এই পতাকা বিক্রি করে সংসার চলে। সমাবেশে আসা লোকজন প্রদীপের কাছ থেকে বিএনপির লোগো, প্রতীক ও দলীয় প্রধানের ছবি সম্বলিত পতাকা কিনছেন। অনেকে সেখানে গিয়ে পতাকা ধরে ছবিও তুলেছেন।
প্রদীপের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার মুরাদনগরে, থাকেন ঢাকার কদমতলীতে। ঢাকা শহরে ঘুরে ঘুরে পতাকা বিক্রি করেন তিনি। সাধারণত টিএসসি ও শহীদ মিনারের সামনে পতাকা বিক্রি করেন জানিয়ে প্রদীপ দাশ বলেন, রাজনৈতিক সমাবেশ হলেই পতাকা নিয়ে চলে যাই, সেটা দেশের যেখানেই হোক। গ্রাম–শহর কোনো কথা নেই, রাজনৈতিক সমাবেশে পতাকা বিক্রি করতে ছুটে যাই।
দুই মেয়ে, এক ছেলের বাবা প্রদীপ ২০০৬ সাল থেকে পতাকা বিক্রিকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন। তার স্ত্রী পতাকাগুলো তৈরি করে দেন, তিনি ঘুরে ঘুরে বিক্রি করেন। বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশেও পতাকা বিক্রির অভিজ্ঞতা আছে। বছর দশেক আগে যখন এখানে খালেদা জিয়ার সমাবেশ হয়েছিল তখনো এসেছিলাম। শেখ হাসিনার সমাবেশেও এসেছিলাম। ক্রিকেট খেলায়ও আসি। যেহেতু এটা পেশা তাই যখনই যার বড় সমাবেশ কিংবা খেলা থাকে সেখানে চলে যাই।
শনিবার রাত ৯টায় তিনি চট্টগ্রামে আসেন। সরাসরি পলোগ্রাউন্ড মাঠের কাছে চলে যান। রাত থেকে পতাকা বিক্রি হচ্ছিল। সকাল থেকে বিক্রি অনেক বেড়েছে। ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরে ঢাকার তিনশ ফিটে তারেক রহমানের সমাবেশের ঘোষণার পর তিন দিন ধরে সেখানে ছিলেন তিনি। সিলেটে ছিলেন দুদিন। বিক্রি ভালো হয়েছে।
প্রদীপ দাশ বলেন, ঢাকায় কদিন আগের সমাবেশে সব মিলিয়ে সাত–আট হাজার পতাকা বিক্রি হয়েছে। চট্টগ্রামে আজ তিন–চার ঘণ্টায় এর চেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে। চট্টগ্রামের সমাবেশ শেষে ফেনী ও কুমিল্লার দাউদকান্দি ও রাতে কাঁচপুরের নির্বাচনী সভায় পতাকা নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে আছে বলে জানালেন প্রদীপ দাশ।
বিরানিসহ নানা খাবারের পসরা : বিএনপির সমাবেশ উপলক্ষে লোকে লোকারণ্য পলোগ্রাউন্ড মাঠসহ সন্নিহিত এলাকা। সমাবেশস্থল থেকে বেশ দূর পর্যন্ত মাইক। ভিড়ের জন্য অনেকে ভিতরে যেতে পারেননি। এমন হাজার হাজার মানুষ পলোগ্রাউন্ড মাঠ–সংলগ্ন রাস্তা থেকে টাইগারপাস পর্যন্ত এলাকায় অবস্থান করেন। টাইগারপাস এলাকা থেকে পলোগ্রাউন্ড মাঠের প্রবেশপথ পর্যন্ত পুরো সড়ক সকালে পূর্ণ হয়ে যায়। বিভিন্ন এলাকার হাজার হাজার নেতাকর্মী ব্যানার–ফেস্টুন নিয়ে এসেছেন। কারো হাতে বিএনপির নির্বাচনী প্রতীক ধানের শীষও দেখা গেছে। নানা স্লোগানে তারা মুখর রাখেন এলাকা।
এই ভিড়ে নানা ধরনের খাবারের পসরা নিয়ে বসেছেন ব্যবসায়ীরা। বাদাম বিক্রেতা, চা বিক্রেতা ও নাশতা বিক্রেতারা বিক্রিতে ব্যস্ত ছিলেন। বিরানি বিক্রি করছিলেন আবদুল হক নামে একজন। তিনি বলেন, ৫০০ প্যাকেট বিরানি নিয়ে এসেছি। প্রতি প্যাকেট ১০০ টাকা করে বিক্রি করেছি। প্রচুর বিক্রি হয়েছে।
প্লাস্টিকের ধানের শীষ : পলোগ্রাউন্ডের সমাবেশে বিএনপির নির্বাচনী প্রতীক ধানের শীষের বিক্রি ছিল চোখে পড়ার মতো। প্লাস্টিকের তৈরি ধানের শীষ নিয়ে নারায়ণগঞ্জ থেকে চট্টগ্রামে আসেন মোজাম্মেল হক। একদিন আগে চট্টগ্রামে এসে গতকাল ভোর থেকে তিনি পলোগ্রাউন্ড মাঠের আশেপাশে ধানের শীষ বিক্রি করছিলেন।
মোজাম্মেলের বাড়ি নারায়ণগঞ্জের বাংলাবাজারে। কাজ করেন একটি পোশাক কারখানায় শ্রমিক হিসেবে। তিনি বলেন, ২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমান দেশে ফেরার পর ঢাকার তিনশ ফিট এলাকায় প্রতীক বিক্রি শুরু করি। সেখানে ভালো বিক্রি হয়েছে। ২২ তারিখ সিলেটের সমাবেশেও গিয়েছিলাম। সেখান থেকে গিয়েছিলাম হবিগঞ্জে। সেখান থেকে চট্টগ্রাম চলে এসেছি। তিনি বলেন, অফিস থেকে ছুটি নিয়েছি। সমাবেশে প্রতীক বিক্রি করছি–এমন ছবি প্রকাশ হলে চাকরিতে সমস্যা হতে পারে।
বেশ কয়েক ধরনের প্লাস্টিকের ধানের শীষ এনেছেন মোজাম্মেল। ৬০, ১০০ ও ২০০ টাকা করে এগুলো বিক্রি করেছেন। সিলেটে প্রতীক বিক্রি করে ১৬ হাজার টাকা লাভ করার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখানেও ভালো বিক্রি হচ্ছে।
চট্টগ্রামের সমাবেশের পর ফেনী ও কুমিল্লার সমাবেশে প্রতীক বিক্রি করতে যাওয়ার আগ্রহের কথা জানিয়ে মোজাম্মেল বলেন, রাতে নারায়ণগঞ্জ চলে যাব।












