ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও খেলাপি ঋণ

তরুণ কান্তি বড়ুয়া | বুধবার , ২১ অক্টোবর, ২০২৬ at ৯:৫১ পূর্বাহ্ণ

ব্যাংকিং ব্যবস্থা এমন এক প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে ব্যাংক এবং ব্যাংক সম্পর্কিত আর্থিক প্রতিষ্ঠান সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আমানত গ্রহণ করে। আমানতকৃত অর্থ প্রয়োজনবোধে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসায়ীদের ঋণ দিয়ে থাকে। এছাড়াও বিভিন্ন ক্ষেত্রে অর্থ স্থানান্তর, বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়, প্রতিষ্ঠান পরিচালনা, সম্পদ ব্যবস্থাপনার মতো আর্থিক পরিষেবা প্রদান করে থাকে ব্যাংক। অর্থনৈতিক নিরাপত্তা লক্ষ্যে বিভিন্ন ধরনের হিসাব, যেমন চলতি, সঞ্চয়ী ও স্থায়ী হিসাব খোলার বিধান রেখে গ্রাহকের উদ্ধৃত্ত অর্থ গচ্ছিত রেখে ব্যাংক আর্থিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা বিধান করে। জমাকৃত অর্থ ব্যক্তিগত প্রয়োজন মেটানো ছাড়াও ব্যবসায়িক, কৃষিক্ষেত্রে ঋণ প্রদান এবং বিনিয়োগ সুবিধা বৃদ্ধির কাজে অবদান রাখে।

চেক, ড্রাফট এবং ইলেকট্রনিক ট্রান্সফারের মাধ্যমে একস্থান থেকে অন্যস্থানে টাকা পাঠানো বা বিল পরিশোধের বিষয়টাও ব্যাংক নিজ দায়িত্বে করে থাকে। আধুনিক যুগে ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি ইন্টারনেট এবং স্মার্টফোনের মাধ্যমে ব্যাংকিং ও মোবাইল ব্যাংকিং খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ইদানীং বেশ কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে নানান অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাটের কথা বেশি করে শোনা যাচ্ছে। এটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে শুধু ঝুঁকি নয় বরং বিরাট এক বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি জনমনে নানান বিভ্রান্তি ও আস্থাহীনতার সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে কয়েক বছর ধরে বেশ কিছু সমস্যা পরিলক্ষিত হয়ে আসছে।

১. প্রথমত সমস্যা হচ্ছে বিনিয়োগ না থাকার কারণে দেশের কোটি কোটি উদ্ধৃত্ত টাকা অব্যবহৃত পড়ে থাকা। ২. দ্বিতীয়ত ব্যাংক কর্তৃক প্রদত্ত ঋণ সময়মত গ্রাহকদের পরিশোধ করতে না পারা কিংবা গ্রাহককে ঋণ দেওয়ার ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট মেনে না চলা। অনেকসময় ব্যাংকগুলো একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ঋণ প্রদান করে থাকে যারফলে ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে ঝামেলার সৃষ্টি হয়ে থাকে। ৩. তৃতীয়ত ব্যাংকগুলোতে অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত বিনিয়োগের জন্য ঋণ বরাদ্ধ করতে সঠিকভাবে প্রাসঙ্গিক কাগজপত্র যাচাই বাছাই করা হয়না। ফলশ্রুতিতে গ্রাহকদের মাঝে ঋণ খেলাপির প্রবণতা দেখা দেয়। ব্যাংক গুলো ঠিকমতো জামানত দেখছে না। লাভের চেয়ে লোকসান গুনতে হচ্ছে বিপুল অংকের। লাভের পরিমাণ দৃশ্যনীয় নয় বিধায় রাজস্ব আদায় কম হচ্ছে। ৪. ঋণ খেলাপি ও মন্দঋণ ব্যাংক কাঠামোকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। ৫. ব্যাংকের আইটি সুবিধা সুরক্ষিত নয়। ব্যাংকিং খাতকে শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছে দিতে হলে আইটি প্রযুক্তির বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উন্নত করা প্রয়োজন। ৬. মূলধন ঘাটতি ও অর্থ উত্তোলনে বা মূল টাকা উত্তোলনে সৃষ্ট সমস্যাগুলো জনগণকে অনিশ্চিত অবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ফলশ্রুতিতে গ্রাহকরা ব্যাংকে অর্থ রাখতে শুধু নিরুৎসাহিত হচ্ছে না বরং ভীতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে ব্যাংকে তাঁদের বিনিয়োগকৃত আমানতের পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে। ৭. মূলধন ঘাটতি অনেক ব্যাংককে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বাধাগ্রস্ত করছে। ৮. আমানত সংগ্রহ প্রতিযোগিতায় ব্যাংকের সমতা রক্ষার অভাব। ৯. ব্যবস্থাপনায় সংকট বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত বেসরকারি ব্যাংকগুলো পরিচালনায় পরিচালকদের অযাচিত হস্তক্ষেপ। ১০. ব্যাংকগুলোতে প্রায়শ সিবিএ নেতাদের অযাচিত হস্থক্ষেপ। ব্যাংক সেক্টরে বড় ধরনের সমস্যা হলো অধিক পরিমাণ খেলাপি ঋণের লাগামহীন প্রভাব। নিয়োগ, পদোন্নতির ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতির দৌরাত্ম্য এবং স্বচ্ছতার অভাব। প্রচলিত নিয়ম ভেঙে যাচাই বাছাই না করে প্রভাবশালী ব্যক্তি বা শক্তিশালী কোম্পানি বা সংস্থাকে জবাবদিহি ব্যতিরেকে বড় ঋণ পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া। আইন শৃঙ্খলার শিতিলতা এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবে উচ্চ খেলাপি ঋণ ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সরকারের ঘোষিত নীতিমালার ইতিবাচক বাস্তবায়নে গঠিত কমিশন যথার্থ ব্যবস্থা নিলে জাতীয় অর্থনীতিতে ধ্বংসনামা ঋণ খেলাপির ব্যর্থ অবস্থান থেকে দেশ উত্তরণের পথ খুঁজে পাবে।

ব্যাংক সেক্টরে আরো একটি দৃশ্যনীয় সঙ্কট হচ্ছে ক্ষমতা ও স্বাধীন মতামত প্রয়োগে বাংলাদেশ ব্যাংককে নানান চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হওয়া। নীতি নির্ধারণ ও কার্যক্রম বাস্তবায়নে এ প্রতিষ্ঠানটির স্বাধীন কার্যক্রম পদে পদে বাধার সম্মুখীন হয়। ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে ব্যাংক কোম্পানি আইনের আওতায় স্বায়ত্বশাসিত সংস্থা হিসাবে ব্যাংকিং খাত নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা প্রাপ্ত হয়েও বাংলাদেশ ব্যাংকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।

সাম্প্রতিক অভুত্থান দেশের সকল স্তরে পুনর্জাগরণ ও সংস্কারের বাতাবারণ সৃষ্টি করেছে। এর প্রেক্ষাপটে ব্যাংক খাত সংস্কারে যথাযত নজর দেওয়ার বিষয়টি প্রনিধানযোগ্য যেহেতু দেশের অর্থনীতির সব কার্যক্রম এর সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ব্যাংক খাতে অত্যন্ত নাজুক পরিস্থিতি ও মারাত্মক সমস্যা হচ্ছে মাত্রাতিরিক্ত খেলাপি ঋণের পরিমাণ। নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাবহেতু স্বজনপ্রীতির প্রভাব দৃশ্যনীয় প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। প্রচলিত প্রথা ভেঙে প্রভাবশালী ব্যক্তি শক্তিশালী কোম্পনিগুলোকে নজরদারি ও জবাবদিহিতার আওতায় না এনে বড় ঋণ পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া, প্রতিষ্ঠানিক আইন শৃঙ্খলা ও সুশাসন বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং ক্ষেত্রবিশেষে উচ্চ খেলাপি ঋণ প্রদান ব্যবস্থা ব্যাংক খাতের আর্থিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তাই নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনতে ফিনান্সশিয়াল ইউনিটে ক্ষমতাকে যথাযথভাবে প্রয়োগের ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি। যেসব ক্ষেত্রে বড় আকারের দুর্নীতি ও অনৈতিক অর্থ লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে সেসব ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগ করে এসব অনিয়ম রোধ করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব মতে গত জুন শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। মাত্র ৩ মাসে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পরিমাণ বেড়ে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটিতে উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ ব্যাংক থেকে দেওয়া প্রতি ১০০ টাকায় ৩৩ টাকা ফেরত আসছে না। খেলাপি ঋণের আনুপাতিক পরিসংখ্যানে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি দেশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিনানসিয়াল স্টাবিলিটি রিপোর্ট ২০২৫ অনুযায়ী বছরশেষে সংকটাপন্ন ঋণের পরিমাণ ১০ লাখ ৯১ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা। তখন মোট বিতরণ করা ঋণ ছিল ১৮ লাখ বিশ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রায় ৬০% ঋণই কোনোনা কোনোভাবে সংকটাপন্ন। বাংলাদেশের মতো খেলাপি ঋণের ৭২% দেশের ১০টি ব্যাংকেই সীমাবদ্ধ। যার ফলে ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকি যেমন বেড়েছে তেমনি সেসব ব্যাংকে আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার সদিচ্ছা ও সক্ষমতা কমে গেছে। ঋণ খেলাপীদের বৃহৎ অংশ দেশে কিংবা দেশের বাইরে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষেরা জানান বিভিন্ন উপায়ে প্রভাব সৃষ্টির কারণে অনিয়ম দুর্নীতিতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েই চলেছিল যার চিত্র এখন প্রকাশ্যে আসতে শুরু হয়েছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে ঋণ নীতিমালা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করায় খেলাপি ঋণের প্রকৃত হিসাবও দৃশ্যমান হয়েছে। ইতোমধ্যে তফসিল ও এককালীন ঋণ পরিশোধে কিছুটা ছাড় দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণ কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি সরকার ঝুঁকিগ্রস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি গঠন করে খেলাপি সম্পদ বিক্রির মাধ্যমে অর্থ উদ্ধারের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের জুন ভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী দেশের ব্যাংক খাতের মোট ঋণের প্রায় এক তৃতীয়াশ এখন খেলাপি। খেলাপি ঋণের হারের দিক থেকে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে একীভূত ব্যাংকগুলো।

খেলাপি ঋণ প্রসঙ্গে ট্রাস্ট ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং ব্রাক ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান সাদিক মঈনুদ্দিন বলেছেন দেশে ৫০ হাজার টাকা ঋণের জন্য কৃষকদের জেলে যেতে হয়। অপরপক্ষে বড় ঋণ খেলাপিদের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার যুক্তিযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না।

তাঁদের মতে ইচ্ছাকৃত খেলাপীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া খেলাপি ঋণ কমানো সম্ভব নয়। এককালীন পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হলেও বড় ঋণ খেলাপিদের অনেকেই এ সুযোগ গ্রহণে অনীহা প্রকাশ করছে। কারণ তাঁদের ঋণের বড় অংশ দেশের বাইরে পাচার হয়ে গেছে অথবা অন্যত্র ব্যয় হয়েছে। তাই দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার লক্ষ্যে অর্থ ফিরিয়ে এনে ঋণ পরিশোধের মাধ্যমে ব্যাংকের দায় মুক্ত করতে হবে। তাই খেলাপি ঋণের সর্বগ্রাসী অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে হলে স্বপ্রণোদিত হয়ে ঋণ গ্রহীতাদের খেলাপি ঋণ পরিশোধে আন্তরিক ভাবে এগিয়ে আসতে হবে। তাছাড়া সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কঠোর নীতিমালা প্রনয়ন পূর্বক যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

লেখক : শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট। প্রাক্তন অধ্যক্ষ, রাংগুনিয়া সরকারি কলেজ ও বর্তমানে রেক্টর, বনফুল আদিবাসী গ্রীনহার্ট কলেজ, মিরপুর, ঢাকা

পূর্ববর্তী নিবন্ধচতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রযুক্তিতে গড়ে উঠতে পারে নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও সমৃদ্ধ চট্টগ্রাম
পরবর্তী নিবন্ধমীরসরাইয়ে চীনা প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন শুরু