বুলবুল

রেজাউল করিম

বুধবার , ২৮ আগস্ট, ২০১৯ at ১১:২৪ পূর্বাহ্ণ
57

অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। সাহিত্যের সব শাখায় তাঁর বিচরণ অবাধ। তিনি ‘বিদ্রোহী কবি’ এবং আধুনিক বাংলা গানের জগতে ‘বুলবুল’ নামে খ্যাত। কাব্য রচনায় তাঁর অবদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ব্যতিক্রমধর্মী কবিতার জন্যই ‘ত্রিশোত্তর আধুনিক কবিতা’র সৃষ্টি সহজতর হয়েছিল। নজরুল সাহিত্যকর্ম এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অবিভক্ত বাংলায় পরাধীনতা, সামপ্রদায়িকতা, সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ, মৌলবাদ এবং দেশি-বিদেশি শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেন। এজন্য ইংরেজ সরকার তাঁর কয়েকটি গ্রন্থ ও পত্রিকা নিষিদ্ধ করে এবং তাঁকে কারাদণ্ড দেয়। নজরুলও আদালতে লিখিত রাজবন্দীর জবানবন্দী দেন। প্রায় চল্লিশ দিন একটানা অনশন করেন, ইংরেজ সরকারের জেল-জুলুমের প্রতিবাদ জানিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেন এবং এর সমর্থনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে গ্রন্থ উৎসর্গ করে শ্রদ্ধা জানান। নজরুল এক বিস্ময়। কবিতা কিংবা গানে নয়, নজরুল ছিলেন নির্ভীক।
বড়, ছোটো সবার জন্য তিনি গান রচনা করেছেন। তিনি একাধারে গীতিকার, সুরকার, সংগীত পরিচালকও। ‘মোমের পুতুল মমীর দেশের মেয়ে নেচে যায়/ বিহবল চঞ্চল পায়/ খর্জুর-বীথির ধারে/ সাহারা মরুর পারে/ বাজায় ঘুমুর ঝুমুর ঝুমুর মধুর ঝঙ্কারে/ উড়িয়ে ওড়না ‘লু’ হাওয়ায়/ পরী-নটিনী নেচে যায়/ দুলে দুলে দূরে সুদূর/ সুর্মা-পরা আঁখি হানে আস্‌মানে/ জ্যোৎস্না আসে নীল আকাশে তার টানে/ ঢেউ তুলে নীল দরিয়ায়/ দিল-দরদী নেচে যায়/ দুলে দুলে দূরে সুদূর’। ছোটদের গানে তিনি ভৌগলিক পরিচিতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য, সংস্কৃতি তুলে ধরেছেন, যা শিশুসুলভ অন্তরকে বিকশিত করে। শিশুদের স্বপ্ন দেখিয়েছেন। শিশুর মন প্রজাপতির মতো। সে উড়তে চায় রঙিন পাখা মেলে। পড়াশোনায় তার মন বসে না। ‘প্রজাপতি প্রজাপতি, প্রজাপতি প্রজাপতি/ কোথায় পেলে ভাই এমন রঙিন পাখা/ টুকটুকে লাল নীল ঝিলিমিলি আঁকাবাঁকা/… কোথায় পেলে ভাই এমন রঙিন পাখা/ মোর মন যেতে চায় না পাঠশালাতে/ প্রজাাপতি, তুমি নিয়ে যাও সাথী করে তোমার সাথে প্রজাপতি’।
নজরুলের শিশুতোষ রচনার মধ্যে অনেক ক্ষেত্রে দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হতে দেখা যায়। তিনি কোমলমতি শিশুদের মধ্যে অমিত সম্ভাবনার শক্তি দেখতে পেতেন। তিনি শিশুদের অন্তর্গত অগ্নিময় শক্তির স্ফুরণ তাঁর শিশুতোষ রচনায় ঘটাতেন। তিনি ছোটোদের দুর্বল ভাবতেন না। তিনি শিশুদেরকে শক্তিময় হবার, জ্বলে উঠবার প্রেরণা যোগাতেন। তাদের সম্ভাবনাকে প্রজ্বলিত করবার বাণী উচ্চারণ করেছেন। ‘ তুমি নও শিশু দুর্বল/ তুমি মহৎ মহীয়ান/ জাগো দুর্বার, বিপুল বিরাট/ অমৃতে সন্তান’। গানের ব্যাপারে আত্মপ্রত্যয়ী ছিলেন নজরুল। তিনি বলেছিলেন, ‘সাহিত্যে দান আমার কতটুকু তা আমার জানা নেই, তবে এটুকু মনে আছে, সংগীতে আমি কিছু দিতে পেরেছি। সংগীতে যা দিয়েছি সে সম্বন্ধে আজ কোন আলোচনা না হলেও ভবিষ্যতে যখন আলোচনা হবে তখন আমার কথা সবাই মনে করবেন এ বিশ্বাস আমার আছে’। নজরুলের বহু গানের কথা ও সুর হারিয়ে গেছে। দুই খিলি জর্দাপান খাইয়েই নাকি গান লিখিয়ে নেওয়া যেত তাঁকে দিয়ে। গানের জগতে নজরুল ছিলেন মাত্র বারো বছর, আর এই অল্প সময়কালেই, বিপণনযোগ্য বাংলা গানের ভুবনকে শাসন করেছেন। তাঁর গান ছিল স্বতস্ফূর্ত, সরল, আবেদনে প্রত্যক্ষ আর তাই শিক্ষিত, আশিক্ষিত সকলকেই স্পর্শ করে তাঁর গান। সাংগীতিক জীবনে অবিশ্বাস্য তিন হাজারেরও বেশি গান লিখেছিলেন আর তাঁর গানের রেকর্ডের সংখ্যা ১৭শ। রাগাশ্রয়ী আধুনিক গান, প্রেম সংগীত, ছোটদের গান, কীর্তন, আগমণী, শামা সংগীত, গজল, কাওয়ালি, ইসলামি গান সব ধরনের গান তিনি রিখেছেন। ‘ও মন রমযানের রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’-এ গানটি আজো ঈদুল ফিতরের গান হিসেবে পরিচিত। ‘চানরাত’ থেকে গানটি বাজতে থাকে, গাইতে থাকে।
১৯২৭ সালে কলকাতা বেতারের যাত্রা শুরু হয়। বাংলা চলচ্চিত্র তখনও নির্বাক। ঠিক এই সময়েই অসামান্য সাঙ্গীতিক প্রতিভা নজরুলকে ‘শিকার’ করলো গ্রামফোন কোম্পানি। নজরুলেরও স্থায়ী উপার্জনের প্রয়োজন ছিল। কলের গানের বণিক নিংড়ে নিলো নজরুলকে। সেই সময় নজরুলের লেখা এবং তাঁর প্রশিক্ষণে গান রেকর্ড করার জন্য লাইন পড়ে যেতো, কারণ তাঁর রচনা ও সুর মানেই ছিল সেই শিল্পীর অবধারিত সাফল্য ও লোকপ্রিয়তা। তিরিশের দশকে সেকালের শিল্পীরা আঙ্গুরবালা, ইন্দুবালা, কমলা ঝরিয়া, কাশেম মল্লিক, আব্বাসউদ্দীন, যুথিকা রায়, মৃণালকান্তি ঘোষ, ধীরেন দাস, ফিরোজা বেগম, সুপ্রভা সরকার এবং আরো অনেকেই নজরুল গানের সার্থক শিল্পী রূপে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন। এঁরা সকলেই নজরুলের প্রশিক্ষণে গ্রামোফোনে গান গেয়েছেন।
নজরুল ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা কাজী ফকির আহমদ ছিলেন মসজিদের ইমাম ও মাজারের খাদেম। নজরুলের ডাক নাম ছিল ‘দুখু মিয়া’। শৈশবে পিতার মৃত্যু হলে নজরুল পরিবারের ভরণ-পোষণের জন্য হাজী পালোয়ানের মাজারের সেবক এবং মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজ করেন। তিনি গ্রামের মক্তব থেকে নিম্ন প্রাথমিক পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হন। শৈশবের এ শিক্ষা ও শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে নজরুল অল্প বয়সে ইসলাম ধর্মের মৌলিক আচারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হওয়ার সুযোগ লাভ করেন। পরবর্তী জীবনে বাংলা সাহিত্য ও সঙ্গীতে ইসলামি ঐতিহ্যের রূপায়ণে ওই অভিজ্ঞতা সহায়ক হয়েছিল।
ছোটবেলায় নজরুল ছিলেন ডানপিটে। লেটো দলের কাজে ব্যস্ত থাকলেও তাঁর দুরন্তপনার কমতি ছিল না। আজকের শিশু পৃথিবীর আলোয় এসেছে, আমরা তার সাজানোর তরে একটি বাগান চাই-নজরুল শিশুদের মনস্তত্ত্ব বুঝে অনেক সাহিত্য রচনা করেছেন।‘ভোর হলো দোর খেলো খুকুমনি ওঠরে/ ঐ ডাকে জুঁই শাখে ফুলখুকী ছোটরে/ খুকুমনি ওঠরে।’ নজরুল উপলব্ধি করেছেন, শিশু-মন আশ্চর্য কল্পনাপ্রবণ। শিশু কল্পনার রথে চড়ে উড়ে যেতে চায় সূর্যিমামার আগে। ‘আমি হবো সকাল বেলার পাখি/ সবার আগে কুসুম বাগে/ উঠবো আমি ডাকি।’ শিশুর মন কখনো উড়ে যেতে চায় চাঁদে, কখনো ভিন্ন কোনো দেশে আবার কখনো বরফে ঢাকা অচিন দুনিয়ায়। ক্লিক করলে দুনিয়া এখন হাতের মুঠোয়। নজরুল দুনিয়াকে হাতের মুঠোয় আনতে লিখেছেন-‘থাকবো নাকো বদ্ধ ঘরে/ দেখবো এবার জগৎটাকে/ কেমন করে ঘুরছে মানুষ/ যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে।’
বাংলাদেশের মুক্তি-সংগ্রামে তাঁর গান-কবিতা অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। ‘কারার ঐ লৌহকপাট/ ভেঙে ফেল, কর রে লোপাট/ রক্ত-জমাট/ শিকল পূজার পাষাণ-বেদী/ ওরে ও তরুণ ঈশান/ বাজা তোর প্রলয় বিষাণ/ ধ্বংস নিশান/ উড়ুক প্রাচীর প্রাচীর ভেদি’। কিংবা, ‘মোরা ঝঞ্ঝার মত উদ্দাম, মোরা ঝর্ণার মত চঞ্চল/ মোরা বিধাতার মত নির্ভয়, মোরা প্রকৃতির মত সচ্ছল/ আকাশের মত বাঁধাহীন/ মোরা মরু সঞ্চার বেদুঈন/ বন্ধনহীন জন্মস্বাধীন, চিত্ত মুক্ত শতদল/ মোরা সিন্ধুুজোয়ার কলকল/ মোরা পাগলাঝোরার ঝরা জল/ মোরা দিলখোলা খোলা প্রান্তর/ মোরা শক্তি অটল মহীধর/ হাসি গান শ্যাম উচ্ছল/
মোরা বৃষ্টির জল বনফল খাই, শয্যা শ্যামল’।
গান নজরুলের ঝড়ো জীবনের প্রধান সঙ্গী। গান তো নয় দেশাত্মবোধের চারণমন্ত্র। ১৯১৯ সালে নেতাজি সুভাষচন্দ্র স্মৃতিচারণ করেছিলেন, ‘আমরা যখন যুদ্ধে যাবো, তখন সেখানে নজরুলের যুদ্ধের গান গাওয়া হবে। আমরা যখন কারাগারে যাবো, তখন তাঁর গান গাইবো’। গান তিনি ছেলেবেলা থেকেই গাইতেন, সুর করতেন। ১৯২০ সালে করাচির সেনানিবাস থেকে ফিরে আসার পর গান শুনিয়েই জয় করে নিয়েছিলেন কলকাতার বিদগ্ধ মহলকে। সভা-সমিতি কিংবা ঘরোরা সাহিত্য আড্ডায় তাঁর গানই থাকতো প্রবল আকর্ষণের কেন্দ্রে। মুজাফফর আহমেদ লিখেছেন ‘কারখানার শ্রমিকরা পর্যন্ত ডেকে নিয়ে যেতেন নজরুলকে’।
নজরুলের প্রথাগত কোন সংগীত শিক্ষা ছিল না। বাল্যেই পিতৃহারা, লেটোর দলে গান গাওয়া, রুটির কারখানায় কাজ করা কিংবা রেলের গার্ড সাহেবের ঘরে ফরমাস খাটা নজরুলের সামনে সে সুযোগ আসেনি। যেমন ছিলনা তাঁর কোন প্রথাগত ছাত্রজীবন। লেটোর দলে ঘুরে বেড়ানো বাউন্ডুলে নজরুল বাংলার মাটি থেকে লৌকিক সুর আত্মস্থ করেছিলেন। আবেগ-অনুভূতি, প্রেম, বিদ্রোহ, কল্পনা সবই নজরুলগীতির প্রাণ ভ্রোমরা। ‘অঞ্জলি লহ মোর সংগীতে’-যেন বাংলার প্রকৃতিকে আত্মস্থ করে বিকশিত হয়েছে তাঁর সংগীত প্রতিভা। ১৩৮৩ বঙ্গাব্দের ১২ ভাদ্র ঢাকার তৎকালীন পিজি হাসপাতালে কবি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের উত্তর পাশে দাফন করা হয় কবিকে।

x