প্রয়োজন দ্রুত রোগ নির্ণয় ও যথার্থ ব্যবস্থাপনা

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু

ডা. সোনিয়া সুলতানা

বৃহস্পতিবার , ১২ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৫:১৯ পূর্বাহ্ণ

প্রতিটি শিশুই সমঅধিকার নিয়ে পৃথিবীতে আসে। বিশেষ চাহিদা সম্পন্নবলেই যে একটি শিশুকে অন্ধকারে থাকতে হবে তা নয়। তারও অধিকার রয়েছে সমাজের মূলধারায় যুক্ত হবার। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কিভাবে আমার বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে পারি। উত্তরটিও খুব সহজ। শিশুটি কি ধরনের বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন তা দ্রুত খোঁজে বের করা এবং বিশেষজ্ঞের পরামর্শ মতে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা। আর এটা যদি আমরা নিশ্চিত করতে পারি তবে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুরাও তাদের ব্যক্তিগত সামাজিক ও জাতীয় জীবনে সফলতা লাভ করতে পারে।
প্রতিবন্ধিতার বিভিন্ন ধরন রয়েছে। যেমন, অটিজম, ডাউন সিনড্রম, সেরিব্রাল পালসি, মূক ও বধির, বাক প্রতিবন্ধী, অন্ধত্ব, মানসিক প্রতিবন্ধী ইত্যাদি। প্রতিবন্ধিতার ধরন অনুযায়ী এদের ব্যবস্থাপনা ও একেক ধরনের। তাই প্রথমেই তাদের বিশেষ চাহিদাটি শনাক্ত করতে হবে। বাবা মা একটু সচেতনভাবে শিশুটিকে লক্ষ্য করলেই বোঝা সম্ভব শিশুটির বেড়ে ওঠার কোন অস্বাভাবিকতা রয়েছে কিনা। একটি শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধির কয়েকটি ধাপ রয়েছে যাকে আমরা Developmental Milestones বলে থাকে। যেমন, দেড় মাস বয়সে শব্দ শুনলে সেই দিকে তাকানো অথবা Sound Response, তিন মাস বয়সে হাসতে শেখা বা Social Smile, ৫-৬ মাস বয়সে বসতে শেখা আর মুখ দিয়ে বিভিন্ন শব্দ করা (যেমনঃ আ, বা, বুবু, তাতা ইত্যাদি), ৯ মাস বয়সে দাঁত ওঠা ও হামাগুড়ি দেওয়া, ১০ মাস বয়সে দাঁড়াতে শেখা, ১ বছর বয়সে দু’ একটি শব্দ বলতে শেখা (যেমনঃ মা, বাবা, দাদা, মাম ইত্যাদি) আর সেই সাথে এক পা দুপা হাটতে শেখা, দুবছর বয়সে দুই শব্দের বাক্য বলতে শেখা (যেমনঃ মা যাব, দুদু দাও, কলা খাব ইত্যাদি)। এছাড়াও Eye contact বা চোখাচোখি করা (কেউ ডাক দিলে তার দিকে তাকানো), অনুকরণ করে খেলা করা (যেমনঃ কেউ বল ছুঁড়ে দিলে সেও বলটা আবার ছুঁড়ে দেওয়া), সমবয়সী অন্য শিশুদের সাথে খেলা করা, কোনো কাজে মনোযোগ বা Attention দেওয়া এসবই স্বাভাবিক বৃদ্ধির লক্ষণ। যদি এর যে কোনটিতে অস্বাভাবিকতা পরিলক্ষিত হয় সাথে সাথে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।
এবারে আসি বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুর যথাযথ পরিচর্যা বলতে আমরা কি বুঝি। একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অথবা থেরাপিস্ট কেবলমাত্র প্রয়োজনীয় চিকিৎসা কিংবা উপদেশ দিতে পারেন, কিন্তু আসল পরিচর্যা করবেন বাবা মা। তাই বাবা মাকে বুঝতে হবে বিষয়টা। প্রতিটি বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুর চাহিদা ভিন্ন ভিন্ন। কারও যদি শারীরিক পরিচর্যার প্রয়োজন হয়, কারও প্রয়োজন মানসিক যত্নের। সর্বপরি পরিবারে সকলের আন্তরিক প্রচেষ্টা থাকতে হবে। পারিবারিক পরিবেশ বা ভাই বোনের সাথে সম্পর্ক এসবই একজন বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য বিশেষ জরুরি।
বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুর জন্য একটি নিয়মিত জীবন যাপন বা Routine Lifestyle প্রয়োজন। হঠাৎ আসা পরিবর্তন তাদের জীবনকে এলোমেলো করে দেয়। Peering বা স্বাভাবিক কোন শিশুর সাথে বন্ধুত্ব এসব শিশুর বৃদ্ধিকে তরান্বিত করে। বিশেষায়িত স্কুল অথবা Inclusive Education System বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের স্বাভাবিক সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। তাই শিশুটিকে ঘরে বসিয়ে না রাখে অবশ্যই স্কুলে পাঠাতে হবে।
যদি আপনার শিশুরটি নির্দিষ্ট কোন বিষয়ের (যেমনঃ ছবি আঁকা, নাচ, গান, কম্পিউটার বা খেলাধুলা) প্রতিটি বিশেষ আকর্ষণ থাকে, তবে অবশ্যই তাকে সে বিষয়ে শিক্ষা দিতে হবে যেন সে ভালো ফলাফল করতে পারে। লেখাপড়া করেই যে কেবলমাত্র জীবনে সাফল্য অর্জন করা যায় তা নয়, যেকোন বিষয়েই সাফল্য অর্জন করতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, দ্রুত শনাক্ত করণ ও যথাযথ ব্যবস্থাপনা বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুর জীবনে আর স্বাভাবিক শিশুর মতন নিয়ে আসতে পারে সফলতা। বিশেষ করে ৪ বছরের পূর্বে কথা বলা না শিখলে অথবা ৬ বছরের পূর্বে শ্রবন প্রতিবন্ধির চিকিৎসা না হলে তাদের জন্য সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। তাই আর দেরি না করে আজই আপনার শিশুর বিশেষ চাহিদার ধরণ শনাক্ত করুন। আর লোকলজ্জার ভয় না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শক্রমে উপযুক্ত যত্ন নিয়ে আপনার বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুটিকে সমাজের মূলধারায় সম্পৃক্ত করুন। কেননা তারও অধিকার রয়েছে সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচবার।
লেখক : শিক্ষক, যোগাযোগ বৈকল্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

x