বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে পদক্ষেপ নিন

| শুক্রবার , ১৩ মে, ২০২২ at ৬:০০ পূর্বাহ্ণ

সম্প্রতি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘গ্লোবাল রিস্ক রিপোর্ট ২০২২’ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হচ্ছে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও জীবিকার সংকট। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, করোনায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে অনেকদিন ধরেই বিনিয়োগে মন্দাভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। তাছাড়া, আগের ব্যবসা-বাণিজ্য যেমন সংকুচিত হয়েছে; তেমনি নতুন করে কোনো কিছুর প্রসারও খুব একটা ঘটেনি।এতে কাজের নতুন ক্ষেত্র সৃষ্টির সুযোগ হ্রাসের পাশাপাশি অনেকেই চাকরিচ্যুত হয়েছেন। এছাড়া অনেকের বেতন-ভাতাও কমেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য প্রকাশিত হয়েছে পত্রিকান্তরে। সেই তথ্য অনুযায়ী, ‘দেশে প্রতিবছর গড়ে ২৬ থেকে ২৭ লাখ মানুষ নতুন করে শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। এ হিসাবে করোনাকালীন দুই বছরে অন্তত ৫২ থেকে ৫৪ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও তাদের বেশিরভাগেরই কর্মসংস্থান হয়নি। আইএলওর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৩ কোটি, করোনাজনিত ক্ষতি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব না হলে কয়েক বছরে যা দ্বিগুণ হয়ে ৭ কোটিতে দাঁড়াবে। এটি আমাদের জন্য একটি অশনিসংকেত।’

বিনিয়োগে মন্দাভাবের কারণে যেভাবে অর্থনৈতিক অগ্রগতি হওয়ার কথা, ঠিক সেভাবে হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনার ক্ষতি কাটাতে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তাঁরা বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ টানতে প্রতিযোগী দেশের সঙ্গে তুলনা করে নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে। একই সঙ্গে দেশের উদ্যোক্তাদের সুবিধা দিলে তা বিদেশি বিনিয়োগ টানতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। যেসব আইন বিদেশি বিনিয়োগ আনার ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি করে সেগুলোর সংস্কার করতে হবে। ওয়ান স্টপ সার্ভিসকে কার্যকর করতে হবে। ব্যবসা শুরুর জটিলতা নিরসন করতে হবে। ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়ার জটিলতা নিরসন করতে হবে। অন্যান্য বিধিবিধান বিনিয়োগবান্ধব হতে হবে। সব মিলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। যে কোনো দেশে বিনিয়োগ বাড়াতে হলে আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি উন্নত অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকা জরুরি। বাংলাদেশে এক ধরনের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকলেও অন্যান্য দিক থেকে পিছিয়ে আছে। শিল্পকারখানার জন্য যে জমি দরকার, তা সহজে পাওয়ার উপায় নেই। অন্যদিকে সরকারি অনুমোদন নিতে উদ্যোক্তাদের ঘাটে ঘাটে ভোগান্তির শিকার হতে হয়। এসব কারণেই বিশ্বব্যাংকের সহজ ব্যবসার সূচকে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে আছে।

বিশ্ব অর্থনীতিতে যেভাবে স্থবিরতা নিয়ে এসেছিল মহামারি করোনাভাইরাস, তা কেটে ওঠার পথে এখন প্রায় সকল দেশ। এ করোনাকালে বৈশ্বিক বিনিয়োগ কমেছিল ৩৫ শতাংশ। তবে পরিস্থিতির ক্রমোন্নতির ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য, আমদানি-রফতানি ও দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে ধীরে ধীরে গতি ফিরছে। মহামারির ধাক্কা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতি। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা-আঙ্কটাডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, করোনাকালে বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ কমেছিল ১১ শতাংশ। তবে বর্তমানে করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় ফের বাড়ছে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ।

পুঁজিবাজার নিয়েও অনেকে আশাবাদী। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন পুঁজিবাজার প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরতে প্রস্তুত। আমাদের বাজারে নতুন পণ্য, নতুন বন্ড, সুকুক বন্ড, মুনি বন্ড, অবকাঠামো বন্ড, সবুজ বন্ড, ব্লু বন্ড আসছে। সেখানে বিদেশি বিনিযোগকারীদের বিনিয়োগ করার সুযোগ রয়েছে। তাদের এখান থেকে বিনিয়োগ করে সুবিধা নেওয়ার জন্য প্রচুর বিকল্প জায়গা রয়েছে। বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশকে বেছে নেওয়ার মূলত ৫টি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে- দ্রুত অর্থনীতির বৃদ্ধি, বৈশ্বিক অস্থিরতা কাটিয়ে ওঠার সক্ষমতা, স্থিতিশীল বৈদেশিক মুদ্রার হারসহ অনুকূল সুদের হার, প্রত্যাবাসনের জন্য কোনও প্রাক-অনুমোদন নেই এবং বিনিয়োগের জন্য একটি সম্পদশালী ইতিবাচক অর্থনীতি।

অনেকে মনে করেন, বাংলাদেশে পর্যটনও একটি বড় ধরনের বিনিয়োগের আকর্ষণীয় খাত। বাংলাদেশের কুয়াকাটা একটি বিশেষ পর্যটন অঞ্চল। যেখানে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত দেখা যায়। এছাড়া কক্সবাজার বৃহত্তম সমুদ্র সৈকত, সিলেট, জাফলং, টাঙ্গুয়া হাওর, সুন্দরবন ম্যানগ্রোভ অঞ্চলের মতো আকর্ষণীয় পর্যটন জোন রয়েছে বাংলাদেশে। তাছাড়াও প্রাকৃতিক অনেক সুন্দর সুন্দর এলাকা বাংলাদেশে রয়েছে। ফলে বড় ধরনের বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে পর্যটন খাতে। মোট কথা হলো, বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশ একটি উপযুক্ত দেশ। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য যা যা করা দরকার, তার ব্যবস্থা করে এক্ষেত্রে অগ্রসর হওয়া জরুরি।