বায়ুদূষণ রোধে সুষ্ঠু পরিকল্পনা প্রয়োজন

| বুধবার , ২৩ নভেম্বর, ২০২২ at ৬:৪১ পূর্বাহ্ণ

দৈনিক আজাদীর ২০ নভেম্বর শেষ পাতায় ছবিসহ একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। শিরোনাম : ওটা কুয়াশা নয়, বাতাসে মিশে যাওয়া ধুলোবালি। এতে বলা হয়েছে, কয়েকদিন ধরে ভোররাত ও সকালে চট্টগ্রাম মহানগরসহ আশেপাশের উপজেলায় ‘কুয়াশা’ পড়ছে। এমনকি ভোররাতে শীতও অনুভূত হচ্ছে। এমনটাই দাবি সাধারণ মানুষের। তবে আবহাওয়াবিদগণ বলছেন, এখনো শীতকালীন কুয়াশা পড়ছে না। যেটাকে কুয়াশা মনে হচ্ছে তা বাস্তবে বাতাসের সাথে মিশে যাওয়া ধুলোবালি। তাছাড়া চট্টগ্রামে শীতের আমেজ অনুভূত হতে পারে চলতি মাসের শেষ সপ্তাহ বা আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে। পতেঙ্গা আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস কর্মকর্তা ও সিনিয়র আবহাওয়াবিদ বিশ্বজিৎ চৌধুরী আজাদীকে বলেন, শহরের আশেপাশে যে ধুলোবালি আছে তার প্রভাবে কুয়াশার মতো দেখা যাচ্ছে। তবে সেটা হালকা সময়ের জন্য। তাপমাত্রা এখনো আমরা নরমাল পাচ্ছি। সর্বোচ্চ তাপমাত্রা এখনো ৩১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপর পাচ্ছি, যার কারণে শীত এসেছে বলা যাবে না। ভোর রাতে দেখা যাওয়া হালকা কুয়াশা প্রসঙ্গে ব্যাখা দিয়ে তিনি বলেন, এটা আসলে কুয়াশা না। মূলত আশেপাশে যে ধুলোবালি আছে সেগুলো হালকা উপরে উঠে সাপপেন্ডেড এয়ার পার্টিকুলার হিসেবে জমা হচ্ছে। সেটাকে মনে হচ্ছে হালকা কুয়াশা।

আসলে ধুলোবালিতে ছেয়ে গেছে পুরো নগর। বায়ুদূষণ এখন মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বলা যায়, বায়ু দূষণ এক নীরব ঘাতক। দূষিত বায়ুর কারণে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। বায়ু দূষণের জন্য শ্বাসকষ্ট ছাড়াও পেটের সমস্যা, ফুসফুসজনিত সমস্যা, চামড়ার সমস্যা, হাঁপানি বা এলার্জিজনিত সমস্যা, চোখ ও নাকের সমস্যা, যে কোনো সংক্রমণ, গর্ভকালীন সমস্যা এমনকি ক্যান্সারও হতে পারে। তবে শিশুদের ক্ষেত্রে এ দূষণ খুব মারাত্মক প্রভাব ফেলে যা তাদেরকে সারা জীবন ধরে বয়ে বেড়াতে হয়। দূষণ ও পরিবেশগত ঝুঁকির কারণে যেসব দেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সেসব দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, সমপ্রতি সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘আইকিউএয়ার’ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। বিশ্বের ১১৭টি দেশ-অঞ্চলের ৬ হাজার ৪৭৫টি শহরের বায়ুর মান পর্যবেক্ষণ করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। মূলত বাতাসে প্রতি ঘনমিটারে মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর সূক্ষ্ম বস্তুকণা পিএম-২.৫-এর পরিমাণ দেখে তালিকাটি করা হয়েছে। ২০২১ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে বাতাসের প্রতি ঘনমিটারে পিএম ২.৫-এর মাত্রা ৭৬.৯। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মান অনুযায়ী, প্রতি ঘনমিটারে যা থাকার কথা ১০-এর কম। বর্তমানে এই দূষণের পরিমাণ এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যা বলার মতো না।

‘আইকিউএয়ার’ প্রতিবেদনে আবারো বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে। আইকিউআরের প্রতিবেদনে আমরা উদ্বিগ্ন হলেও আমরা বিস্মিত না কেননা ২০১৮ সাল থেকে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশের নাম। শুধু দেশ হিসেবে নয়; নগরী হিসেবে আমাদের রাজধানী ঢাকাও বিশ্বের দূষিত স্থান হিসেবে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছে। ঢাকার বায়ুমান কেমন সেইটা নাক, মুখ ও চোখ দিয়েই বুঝা যায় এ জন্যে গবেষণাগারে পরীক্ষা করার প্রয়োজন হয় না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বায়ুদূষণ এখন বিশ্বের বৃহত্তম পরিবেশগত স্বাস্থ্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত। বায়ুদূষণের কারণে বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর প্রায় ৭০ লাখ মানুষ মারা যায়। বায়ু দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব অনেক। দূষিত বায়ুতে আমাদের নিঃশ্বাস নিতে সমস্যা হয়। বায়ু দূষণের ফলে সবচেয়ে খারাপ প্রভাব পড়ছে মানুষের প্রজনন ক্ষমতা ও সার্বিক স্বাস্থ্যের ওপর। দূষিত বায়ু আমাদের শরীরে নানা রকম রোগ সৃষ্টি করে থাকে। বায়ুদূষণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে শিশুরা। এক পরিসংখ্যান বলছে গত বছর পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ৪০ হাজার শিশুর মৃত্যুর জন্য সরাসরি দায়ী বায়ুদূষণ।

তাই বায়ুদূষণ রোধ করার জন্যে এখনই সুষ্ঠু পরিকল্পনা করতে হবে। যানবাহন থেকে দূষণ এবং কালো ধোঁয়া নির্গমন রোধ করার জন্য কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর খোঁড়াখুঁড়ি কাজের সমন্বয় সাধন করা ও বায়ু দূষণের ভয়াবহতা সম্পর্কে অবহিত করতে সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। মোট কথা, দূষণরোধ করার জন্যে সকলকেই এগিয়ে আসতে হবে।