অসুস্থ পুত্র হুমায়ুনের সুস্থতার জন্য মোঘল সম্রাট বাবর সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রাণভিক্ষা করেছিলেন। মোগল সাম্রাজ্যের ইতিহাস অনুসারে পুত্র সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং বাবর মৃত্যুবরণ করেন। সন্তানের জন্য আত্মত্যাগের এ ঘটনা পিতৃস্নেহের এক অনন্য উদাহরণ। এ ত্যাগ ও পিতৃস্নেহকে কবি গোলাম মোস্তফা তার ‘জীবন–বিনিময়’ কাব্যে বর্ণনা করেছেন এভাবে : ‘মরিয়া বাবর অমর হয়েছে, নাহি তার কোন ক্ষয়/ পিতৃস্নেহের কাছে হয়েছে মরণের পরাজয়।’
বাবা; মাত্র দুটি অক্ষরের একটি শব্দ। কিন্তু এর ব্যাপকতা গভীর। এই এক শব্দেই লুকিয়ে আছে সন্তানের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা, নির্ভরতা ও ত্যাগের গল্প। বাবা; যিনি নিজের আরাম–আয়েশ ও স্বপ্ন সবকিছু বিসর্জন দেন সন্তানের স্বপ্ন বাস্তবায়নে এবং সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে। বাবা; যিনি সন্তানের ভরণ–পোষণের জন্য হাঁড়ভাঙ্গা খাটুনি ও বিরামহীন পরিশ্রম করে ক্লান্ত হন। দিন শেষে বাড়ি এসে সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে ভুলে যান সারা দিনের ক্লান্তিকর মুহূর্তগুলো।
একটি শিশু জন্মের পর প্রথম পরিচয় পায় তার পরিবারে। যে পরিবারের ভিত্তি হলেন বাবা। সন্তানের প্রথম হাঁটা শেখা থেকে শুরু করে জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রতিটি ধাপে থাকে বাবার উপস্থিতি। এটা কখনো সামনে, কখনো আড়ালে থেকে। আবার বাবার ভালোবাসা সবসময় প্রকাশ্যে আসে না। কারণ বেশির ভাগ বাবা অনুভূতি নয়, দায়িত্ব দিয়ে প্রকাশ করেন তার ভালোবাসা। দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রম, ভবিষ্যতের চিন্তা আর নীরব ত্যাগের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে সন্তানের প্রতি তার গভীর মমতা ও দায়বদ্ধতা। সন্তানের প্রতি বাবার যেমন ভালোবাসা তেমনি বাবার প্রতিও প্রতিদিন–প্রতিক্ষণ সন্তানের হৃদয়ে পুঞ্জীভূত থাকে গভীর প্রেম। কখনো এই ভালোবাসার প্রকাশ ঘটে, কখনো প্রকাশ ঘটে না। তবে সব সংকোচ ভুলে গিয়ে আজ বাবার প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ ঘটাবে সন্তানরা। কারণ, আজ বিশ্ব বাবা দিবস। এদিনের পৃথিবীর প্রতিটি বাবার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও শুভেচ্ছা।
প্রতি বছর জুন মাসের তৃতীয় রোববার বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৫২টি দেশে পালিত হয় দিবসটি। পিতার প্রতি সন্তানের ভালোবাসা প্রকাশের জন্য দিনটি বিশেষভাবে উৎসর্গ করা হয়। যদিও পিতার প্রতি সন্তানের ভালোবাসা প্রকাশের জন্য বিশেষ কোনো দিনের প্রয়োজন হয় না। কেউ কেউ বলছেন, অনেক ছেলে–মেয়ে আছে যারা পিতা–মাতার দেখাশোনার প্রতি খুব একটা মনোযোগী নন। দিবসটিতে এসব সন্তানকে তাদের বাবার প্রতি একটু হলেও আগ্রহী করে তুলে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাব্বির আজাদীকে বলেন, বর্তমান সময়ে পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামোয় বাবার ভূমিকা আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শুধু উপার্জনকারী হিসেবে নয়, একজন বন্ধু, পথপ্রদর্শক ও অভিভাবক হিসেবেও বাবারা সন্তানের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। সন্তানদের মানসিক বিকাশ, শিক্ষাজীবন ও মূল্যবোধ গঠনে বাবার সক্রিয় অংশগ্রহণ ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিশ্ব বাবা দিবসে তাই প্রতিটি সন্তানের উচিত বাবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। কারণ একটি ভালোবাসার কথা, একটি আলিঙ্গন কিংবা একটি ছোট্ট শুভেচ্ছাও একজন বাবার কাছে অমূল্য হয়ে উঠতে পারে।
বিভিন্ন গবেষণা থেকে জানা গেছে, বাবার সান্নিধ্যে সন্তান যত বেশি থাকবে তার অংক এবং প্রযুক্তির জ্ঞান তত বাড়বে। বাবার সাহচর্যে সন্তান খেলাধুলার প্রতিও আগ্রহী হয়ে ওঠে।
বাবা দিবসের ইতিহাস সম্পর্কে জানা গেছে, আমেরিকার সোনোরা লুইথ স্মিথ ডডই প্রথম জুন মাসের তৃতীয় রোববার বাবা দিবস পালন করেন। এর কারণ ছিল, তিনি যখন ষোলো বছরে পা রাখেন তখন তার মা মারা যান। এরপর সামরিক বাহিনীতে কর্মরত তার বাবা ভার তুলে নেন সন্তানদের মানুষ করতে। তিনি সোনোরাসহ তার ছয় সন্তানকে কখনো বুঝতে দেননি মায়ের অভাব। এ সময় থেকে সোনোরার হৃদয়ে জন্ম নেয় প্রচণ্ড পিতৃভক্তি। একসময় সোনোরা জানতে পারেন মা দিবস থাকলেও বাবা দিবস নেই। ১৯০৯ সালে সোনোরা মা দিবসে তার বাবার শূন্যতা অনুভব করেন। এরপর থেকে তিনি সিদ্ধান্ত নেন বাবা দিবস পালন করার। পরের বছর তিনি জুন মাসের তৃতীয় রোববার স্থানীয় স্পেকেইন মিনিস্টারিয়ান অ্যাসোসিয়েশনস ও ক্রিশ্চিয়ান যুব অ্যাসোসিয়েশনস নামে দুটি সংগঠনের সহযোগিতায় পালন করেন বাবা দিবস। এরপর প্রতি বছর ঘটা করে পালিত হচ্ছে বাবা দিবস।
শুরুতে দিবসটি নিয়ে নানা বিরোধিতা থাকলেও ১৯১৬ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট লিন্ডন জনসন জুন মাসের তৃতীয় রোববারে রাষ্ট্রীয়ভাবে বাবা দিবস পালনের ঘোষণা দেন। ১৯৭২ সালে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিঙন স্থায়ীভাবে বাবা দিবসকে রাষ্ট্রীয় দিবস বলে ঘোষণা দেন। এদিকে বাবা দিবস নিয়ে প্রচলিত অন্য একটি কাহিনিতে আছে, পশ্চিম ভার্জিনিয়ার চার্লস ক্লেটন বাবা দিবসের প্রতিষ্ঠাতা।











