জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে শুক্রবার থেকে ধর্মঘট করছে বাস-ট্রাক-কাভার্ডভ্যান মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলো। শুক্রবারের পর গতকাল শনিবারও জনভোগান্তি দেখা যায় নগরীর বিভিন্ন সড়কে। ভোগান্তি চরমে ওঠে যখন ব্যক্তিগত পরিবহন থেকে রিকশা সব গাড়ি পরিবহন শ্রমিকদের বাধার মুখে পড়ে ফিরে যেতে বাধ্য হয়। পরিবহন ধর্মঘটের দ্বিতীয় দিনেও প্রায় অচল ছিল চট্টগ্রাম। সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় এমন পরিস্থিতিতে সারা দেশের মতো চট্টগ্রামেও তৈরি হয় অবর্ণনীয় এক অবস্থা। তবে আজ রোববার বেলা ১১টায় সরকারের সাথে পরিবহন মালিক শ্রমিক নেতৃবৃন্দের বৈঠকের কথা রয়েছে।
পরিবহন ধর্মঘটের কবলে পড়ে পথে পথে দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন সাধারণ মানুষ। শিশু ও বয়স্কদের অবস্থা ছিল সবচেয়ে করুণ। স্থবির হয়ে পড়ে মানুষের জীবিকা ও অন্যান্য জরুরি প্রয়োজনে ভ্রমণ। শুধু তাই নয়, গণপরিবহন না থাকায় বিপাকে পড়তে হয় কর্মজীবীদের। নগরী থেকে দূরপাল্লার বাস চলাচল পুরোপুরি বন্ধ ছিল। নগরীর মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে যাত্রীদের। এছাড়া সিএনজি টেক্সিতে যারা চড়েছেন তাদেরকে পড়তে হয়েছে শ্রমিকদের তোপের মুখে। অনেক জায়গায় আটকে দেওয়া হয় তাদের। গত ৩ নভেম্বর রাতে জ্বালানি তেলের দাম ১৫ টাকা বাড়িয়ে দেয় সরকার। এমন সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর ৫ নভেম্বর সকাল থেকে বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও লরি চালক-মালিকেরা গাড়ি চলাচল বন্ধ রাখার ঘোষণা দেন। এই ঘোষণার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে চট্টগ্রামেও নগর, উত্তর, দক্ষিণসহ সব এলাকার মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলো গাড়ি চালানো বন্ধ রাখে। এদিকে ডিজেল ও কেরোসিনের মূল্য বৃদ্ধিতে জীবন যাত্রার ব্যয় ও পরিবহন ভাড়া বেড়ে যাওয়ার শঙ্কাও তৈরি হচ্ছে। ট্রাক, বাসসহ পরিবহনের জ্বালানি হিসেবে ডিজেলের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ট্রাক ভাড়া বাড়লে পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়ে যাবে। দাম বাড়বে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের। চাপ পড়বে সীমিত আয়ের মানুষের ওপর।
পরিবহন ধর্মঘটের দ্বিতীয় দিনেও চট্টগ্রাম জুড়ে যাত্রীরা পড়েছেন চরম দুর্দশায়। বাসের অপেক্ষায় তারা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেছেন। কিন্তু বাসের দেখা আর পাননি। কয়েক গুণ বেশি ভাড়া দিয়ে টেক্সি কিংবা মোটরসাইকেলে করে কাছের গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হতে দেখা গেছে অনেককে। এছাড়া ভরসা হিসেবে ছিল রিকশা। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে রিকশাচালক ও টেঙি চালকরা বেশি ভাড়া হাঁকছিলেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দ্বিগুণ ভাড়া নেওয়া হয়েছে। সিএনজি টেঙিগুলো ২০০ টাকার ভাড়া ৫০০ টাকা চাইতেও দ্বিধা করছে না। চড়তে চাইলে এই ভাড়া না দিয়েও উপায় নেই।
জনবহুল কয়েকটি স্থান ঘুরে দেখা গেছে, গণপরিবহন না থাকায় পুরো সড়কই ছিল রিকশার দখলে। রিকশাচালকদের দম ফেলার সময় নেই। একটু দরদাম করলেই ফিরিয়ে নিচ্ছেন মুখ। অন্যদিকে মোটরসাইকেল চালকরাও সুযোগ পেয়ে অ্যাপস বন্ধ করে চুক্তিতে যাত্রীদের যেতে বাধ্য করেছেন। ১০-১২ জন যাত্রী নিয়ে নিয়মিত চলাচল করা সিএনজিচালিত টেম্পোগুলোতেও বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ মিলেছে। এসব বাহনে ৫ টাকার ভাড়া ১০ টাকা এবং ১০ টাকার ভাড়া ১৫ টাকা আদায় করতে দেখা গেছে।
নয়ন চক্রবর্তী নামে এক যাত্রী জানান, সকাল ৯টার দিকে শাহ আমানত সেতু থেকে বাঁশখালী গুনাগরি পর্যন্ত সিএনজি টেঙিতে জনপ্রতি ভাড়া দাবি করা হচ্ছে ২০০ টাকা, যা সাধারণ সময়ে জনপ্রতি ৬০ টাকা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যাত্রী সমাগম বাড়তে থাকায় পরে ৩০০ টাকাও দাবি করা হয়।
বাস না পেয়ে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে কাপ্তাই রাস্তার মাথা এলাকায় জটলা বেঁধে অপেক্ষা করছিলেন বেশ কিছু মানুষ। তারা অভিযোগ করেন, টেঙি চালকরা অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছেন। সেখানে অপেক্ষায় থাকা আব্দুল হাকিম নামে এক ব্যক্তি বলেন, আগ্রাবাদে এক আত্মীয়ের বাসায় যাওয়ার জন্য সকালে রাঙ্গুনিয়া থেকে অনেক কষ্ট করে শহরে এসেছি। এমনিতে ২২০ থেকে ২৫০ টাকায় টেঙি পাওয়া গেলেও আজ তারা দাবি করছে ৫০০ টাকা।
কাজির দেউড়ি মোড়ে আবদুল্লাহ রায়হান নামে এক ব্যক্তি জানান, তিনি পটিয়ায় যাওয়ার জন্য শাহ আমানত সেতু পর্যন্ত সিএনজি টেঙি নিতে চাইলে ৩০০ টাকা দাবি করা হয়, যেটা স্বাভাবিক সময়ে যায় ১২০ থেকে ১৫০ টাকা।
অন্যদিকে নগরীর ভেতরেও বাস চলাচল করছে না। গতকাল দিনভর নগরীর মুরাদপুর, জিইসি মোড়, অঙিজেন, আগ্রাবাদ, বহদ্দারহাট, কাপ্তাই রাস্তার মাথা ও টাইগারপাস এলাকায় বাস চলাচল তেমন একটা দেখা যায়নি। হঠাৎ দু-একটি বাস চললেও সেগুলোতে মানুষ যে যেভাবে পেরেছে ঠাসাঠাসি করে উঠেছে।
গতকাল সকালে টাইগারপাস, নতুন ব্রিজ, বাকলিয়ার তুলাতলী, মুরাদপুর, টাইগারপাস, দেওয়ানহাট, আগ্রাবাদ, ইপিজেড, বাহির সিগন্যাল, কালুরঘাট সিঅ্যান্ডবিসহ বেশ কিছু এলাকায় পরিবহন শ্রমিকেরা অবস্থান নিয়ে রাস্তায় বের হওয়া সিএনজি টেঙি, গ্যাসচালিত বাস, প্রাইভেট কার, এমনকি অ্যাম্বুলেন্স চলাচলেও বাধা দেয়। সড়ক অবরোধ করে শ্রমিকরা বিক্ষোভ করে। এ সময় বিভিন্ন ব্যক্তিগত পরিবহন আটকা পড়ে। বাধ্য হয়ে সড়কের মাঝখানে নামিয়ে দেওয়া হয় যাত্রীদের।
আগ্রাবাদ আখতারুজ্জামান সেন্টারের ব্যবসায়ী রুহুল আমিন সকাল সাড়ে ৯টায় নতুন ব্রিজ থেকে ৪ নম্বর রুটের বাসে রওনা হন দেওয়ানহাটের উদ্দেশ্যে। বাকলিয়া তুলাতলী এলাকায় অবস্থান নেওয়া পরিবহন শ্রমিকরা তাদের নামিয়ে দিয়ে আটকে রাখেন গাড়ি। রুহুল আমিন জানান, আজ দোকান খোলা। যেভাবেই হোক তাকে দোকানে পৌঁছাতে হবে।
নগরীর ৪ নম্বর রুটের বাস চালক মোর্শেদ জানান, বাড়তি ভাড়ায় নতুন ব্রিজ থেকে বেশ কিছু বাস চলছে। যাত্রীদের দুর্ভোগের কারণে ডিউটিরত সার্জেন্টের অনুরোধে তিনি ১৫ টাকা করে মুরাদপুর পর্যন্ত যাত্রী নিয়েছেন। তবে তিনি মুরাদপুর পর্যন্ত আসতে পারেননি। পরিবহন শ্রমিকরা যাত্রী নামিয়ে গাড়ি আটকে রেখেছেন।
সকাল সাড়ে ৯টার দিকে টাইগারপাস এলাকায় পরিবহন শ্রমিকরা রাস্তায় অবস্থান নেন। এ সময় তাদের বিভিন্ন গণপরিবহন চলাচলে বাধা দিতে দেখা গেছে। শ্রমিকরা ব্যক্তিগত গাড়ি ও সিএনজি টেঙি আটকে দেন বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। পরে বেলা ১১টার দিকে পুলিশ তাদের সরিয়ে দেয়। এরপর সব ধরনের গাড়ি চলাচল শুরু হয়।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ট্রাফিক পুলিশ দক্ষিণ বিভাগের সহকারী কমিশনার (এসি) শরিফুল ইসলাম বলেন, সকালে ইপিজেড এলাকায় গার্মেন্টসকর্মীবাহী একটি বাস আটক করে যাত্রীদের নামিয়ে দিয়েছিল পরিবহন শ্রমিকরা। এতে গার্মেন্টসকর্মীরাও ক্ষোভের মুখে অন্যান্য গাড়ি চলাচল বন্ধ করে দেয়। গার্মেন্টসকর্মীদের দাবি, তারা যেতে না পারলে অন্যরাও যেতে পারবে না। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়।











