পৃথিবীতে সব মায়ের দুধের বর্ণ সাদা। সেই দুধ সব গুণে গুণান্বিত। সেইখানে কোন প্রকার বর্ণবৈষম্য নেই। মায়ের প্রথম দুধ যেটাকে ‘শাল’ দুধ বলা হয়, সেখানে ‘কলোস্ট্রাম’ থাকে যা এ্যান্টিক্যানসারাস অর্থাৎ ক্যানসারকে প্রতিরোধ করে। যারা জানে না তারা ঐ দুধ ফেলে দেয়। এটা ঠিক নয়। কোনও শিশু যখন দুধপান করার জন্য কান্না করতে থাকে কাছে যে মায়েরা থাকে তাদের মাতৃত্ববোধ জেগে ওঠে। আসল মা যেখানেই থাকুক দৌড়ে গিয়ে সন্তানকে দুধ খাওয়াইয়ে শান্ত করে। এটা জাগতিক নিয়ম। নবজাত শিশুর প্রথম খাদ্য মায়ের দুধ যা পান করে শিশু বেঁচে থাকবে পুষ্টি পাবে। যদি কোনও কারণে মাতৃদুদ্ধ বঞ্চিত হয় তবে নানারকম জটিলতা দেখা দেয়। তবে যুগের পরিবর্তনে নবজাতকের পুষ্টির জন্য অনেক প্রকার খাদ্যের প্রচলন আছে যে কাহিনিটা বলবো সেটা হলো সদ্য নবজাত এক শিশুর মায়ের দুধ না পেয়ে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে চলে যাওয়ার এক করুণ কাহিনি। এই শিশুটি গর্ভধারিণী মায়ের দুধ এক চুমুকও খেতে পায়নি। জন্ম দেওয়ার পরপরই মা মারা যান।
ভারতের মুম্বাই শহরের এক ধনাঢ্য পরিবারে যার অঢেল সম্পত্তি। ব্যবসা–বাণিজ্য, প্রতিপত্তি, অনেক নামকরা ব্যবসায়ীরা অংশীদার যাদের। শহরে অনেক নাম ডাক। সেই পরিবারটা গোড়া হিন্দু। বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় কুসংস্কারে নিমজ্জিত। সেই পরিবারে রয়েছে যেমন অনেক পুরুষ কর্মচারী তেমনি রয়েছে অনেক গৃহ পরিচারিকা বা নকরানি। আবার রয়েছে পরিচারিকাদের নজরদারীর জন্য একজন হেড পরিচারিকা। এমনি একটি পরিবারের একমাত্র ছেলে যাকে সবাই বড় সাহেব বলে ডাকে। বড় সাহেবের স্ত্রী এক সময় গর্ভবতী হয়। সেটা জেনে গোটা পরিবারে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। দিনে দিনে গর্ভের সন্তান বড় হতে থাকে। শহরের নামকরা স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞদের দ্বারা মাতৃকালীন চেকআপ শুরু হলো। ডাক্তারদের নির্দেশ মোতাবেক সবকিছু ঠিকঠাক ভাবে মানা হচ্ছে। কর্মচারী, গৃহপরিচারিকাদের অবহেলার সুযোগ নেই। যথাসময়ে প্রসব বেদনা শুরু হলো। গাইনোকোলজিস্টদের আদেশ ক্রমে শহরের সবচেয়ে উন্নতমানের নার্সিং হোমে বড় সাহেবের স্ত্রীকে ভর্তি করানো হলো এবং সর্বক্ষণ বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণে রাখা হলো। নার্স, ডাক্তার সবাই সর্বক্ষণ তৎপর যাতে ডেলিভারিকালীন কোনও প্রকার ত্রুটি না হয়। যথাসময়ে স্ত্রী এক পুত্র সন্তান প্রসব করলো কিন্তু বিধি বাম প্রসবের পরপরই মায়ের অবস্থা খুবই সংকটাপন্ন পর্যায়ে চলে গেল। চারিদিকে দৌড়ঝাপ শুরু হলো। আরও বিশেষজ্ঞ ডাক্তার আনা হলো। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। শেষ পর্যন্ত মাকে বাঁচানো গেল না। ঐ মুহূর্তে শিশুটি মাতৃদুগ্ধ থেকে বঞ্চিত হলো। সন্তানটাকে বাড়িতে আনার পর থেকে যা খাবার দেয় সব বমি করে দিতে লাগলো। পরিবারের সবাই চিন্তায় পড়ে গেল। শহরের বিশিষ্ট শিশু বিশেষজ্ঞদের ডাকা হলো। মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হলো। দামি দামি সব ওষুধ। পরীক্ষা–নিরীক্ষা করা হলো। কিছুতেই শিশুর বমি বন্ধ করতে পারছে না। দিন দিন স্বাস্থ্যের অবনতি হতে লাগলো। সর্বক্ষণ ডাক্তার নার্স সতর্ক অবস্থায় রইল। গোটা পরিবার দিশেহারা, ঠিক ঐ সময় তাদের এক গৃহপরিচারিকার সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার পরপরই মারা যায়। সদ্য সন্তান হারা ঐ গৃহ পরিচারিকা কয়েকদিন থেকে শিশুটির কান্না খেয়াল করছিল। শিশুটির কান্নাপেলে তার মধ্যে মাতৃস্নেহ জেগে ওঠে। তার ইচ্ছা হয় কাছে গিয়ে শিশুটিকে একটু দুধ খাওয়াতে। কিন্তু পরক্ষণে ভাবে সে তো নিম্নবর্ণের লোক। সে দলিত অস্পৃশ্য, তার ওপর অনেক বিধি নিষেধ আরোপ করা আছে। সে অচ্যুত অস্পৃশ্য সে বাচ্চাটাকে ছুঁতে পারবে না, স্পর্শ করলে কঠোর শাস্তি পেতে হবে। তার চলাফেরায়ও বিধি নিষেধ আছে। এই ঘৃণ্য কুসংস্কার একটা জাতিকে, ব্যক্তিকে, সমাজকে অমানবিক করে তোলে তার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। এদিকে শিশুটির অবস্থা আরো খারাপের দিকে যায়। এক রাতে শিশুটি যখন খুব কান্না করছিল ঐ গৃহপরিচারিকা সব বিধি নিষেধ, কুসংস্কারের বাঁধ ভেঙে শিশুটির কাছে যায় এবং দোলনা থেকে শিশুটিকে কোলে নিয়ে খুব সতর্কতার সাথে তার স্তন থেকে দুধ খাওয়াতে থাকে। আর শিশুটি দুধ পান করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ে। তার বমিও বন্ধ হয়ে গেল। এখানে কোনও চিকিৎসাই কাজে আসলো না। ঠিক সেই সময় বড় সাহেব কী মনে করে শিশুটির ঘরের দিকে আসলে দেখতে পেলো তার সন্তান ঐ পরিচারিকার কোলে দুধ খেতে খেতে ঘুমাচ্ছে। মায়ের বুকের দুধ একসঙ্গে দুটো কাজ করে, একটা হলো বুকের দুধ মায়ের সমস্ত শরীরে মাতৃত্ববোধ ও মাতৃস্নেহ জেগে ওঠে।
অন্যদিকে শিশু মায়ের স্পর্শে অনাবিল শান্তি ও ভরসা পায়। পরদিন সকালে পরিচারিকার এই ঘটনা জানাজানি হলে হেড পরিচারিকা ভর্ৎসনার সুরে তাকে জিজ্ঞেস করলো– তুমি একজন অস্পৃশ্য দলিত, নিম্নবর্ণের মেয়ে হয়ে শিশুটিকে স্পর্শ করলে কেন? তাকে শারীরিকভাবে নাজেহাল করলো এবং পুলিশে দেবার ভয় দেখালো। তার একমাত্র অপরাধ সে অস্পৃশ্য ও নিম্নবর্ণের লোক। ঘটনাটা বড় সাহেব ও তার পিতাকে বলা হলো। বড় সাহেব বাদে সবাই গৃহপরিচারিকার শাস্তির অভিমত প্রকাশ করলো। তাদের ব্যবসায়িক অংশীদাররা ব্যবসা বর্জন করার হুমকি দিল। কিন্তু তারা সবাই সমাজ ব্যবস্থা ও ঘৃণ্য কুসংস্কার নিয়ে এতই অন্ধ ছিল যে কেউ শিশুটি প্রাণে বেঁচে যাওয়ার কথা একবারও চিন্তা করলো না। কারণ ঐ সমস্ত সমাজে রন্ধ্রে রন্ধ্রে কুসংস্কারগুলো ঢুকে আছে। ধিক্কার জানাই এই সমাজ ব্যবস্থাকে। কোনো কোনো সম্প্রদায়ে যুগ যুগ ধরে অস্পৃশ্যতা, বর্ণবাদ চলে আসছে। এইগুলি ধর্ম নয়।
সব মনুষ্য স্পষ্ট, ব্রাহ্মণ্যবাদ। একটা নিষ্পাপ শিশুর জীবনের চেয়ে জাত, পাত অস্পৃশৃতা বড় হলো? তাদের মানবিক মূল্যবোধ বলতে কিছুই নেই। ঘুণে ধরা মধ্যযুগীয় সমাজ ব্যবস্থা তাদের কাছে বড় হলো? জিজ্ঞাসা আর কতদিন চলবে এই অবর্ণনীয় কুসংস্কার, নিষ্পেষিত হবে নিম্নবর্ণের মানুষেরা। এই ছুঁও না–ছুঁও না জাত যাবে আর কতদিন চলবে। ওরা তো একই ধর্মের মানুষ। একই মন্ত্রে দীক্ষিত, সবার মুখে হরে কৃষ্ণ হরে রাম। মন্দিরে পুজো দেয়। শুধু কর্মভেদে এত ভেদাভেদ। মহাত্মা গান্ধী অচ্যুত সম্প্রদায়কে হরিজন সম্বোধন করতেন। হরিজন মানে হরির জন। হরি হলো হিন্দুদের দেবতা। তারা হরির অংশ, গান্ধী সেই হরিজনদের সাথে এক পাতে বসে ভাত খেয়েছেন। ব্রিটিশ আমল বা তারও আগে থেকে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের অনেক সম্প্রদায়ের মধ্যে বেশ কুসংস্কার প্রচলিত ছিল যাহা এখন অনেকাংশে লোপ পেয়েছে।
এদিক থেকে পার্শ্ববর্তী দেশের চেয়ে আমরা ভালো আছি। বর্ণবৈষম্য, তুচ্ছ তাচ্ছিল্ল্য অনেক কমে গেছে। তখন এমনও ছিল নিম্নবর্ণের কোন ছাত্র শ্রেণি কক্ষে বেড়াতে হেলান দিয়ে বসলে সেই বেড়া অন্যেরা স্পর্শ করতো না। তখন নিম্নবর্ণের লোকদের শিক্ষা ও চাকরিতে বঞ্চিত করা হতো, তাই তারা পিছিয়ে পড়েছিল। আজ সেদিন নেই। তারাও অনেক এগিয়ে গেছে। পাশাপাশি মুসলিম সম্প্রদায়ের অবস্থাও একই রকম ছিল। তারাও অনেক পিছিয়েছিল। সেখানে একটা প্রধান কারণ ছিল, তাদের বেশির ভাগ পরিবার রক্ষণশীল ছিল। সেই আমল থেকে এই সামাজিক, ধর্মীয় কুসংস্কার তাড়ানোর জন্য ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, স্বামী বিবেকানন্দ, রাজা রামমোহন রায়, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখ আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। তারা পুরাপুরি সফল হতে পারেনি, কারণ সামাজিক কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা সমাজে পুঞ্জীভূত হয়ে আছে। এ দেশের যাদের তফশীল সম্প্রদায় বলতো তারা পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়। চাকরি, শিক্ষা ক্ষেত্রে তাদের জন্য কোটা প্রথাও স্টাইপেন চালু ছিল। স্বাধীনতার পর সেটা বন্ধ করে দেয়া হয়। থাকলে ভালো হতো। আমরা চাই বর্ণবৈষম্য বাদ, অস্পৃশ্যতা, শ্রেণিভেদ সব দেশ, সব সমাজ থেকে বিতাড়িত হোক। তবে বাংলাদেশে অস্পৃশ্যতা বলতে এখন কিছুই নেই। পরিশেষে বর্ণবৈষম্য, অস্পৃশ্যতা নিপাত যাক, মাতৃত্বের জয় হোক।
লেখক : প্রাক্তন চিফ অ্যানাসথেসিওলাজিস্ট, বাংলাদেশ রেলওয়ে হাসপাতাল– চট্টগ্রাম।












