বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে বেশি ফোকাস

চট্টগ্রামে দুর্যোগ ও ত্রাণমন্ত্রী বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের উদ্যোগগুলো তুলে ধরলেন

আজাদী প্রতিবেদন | বুধবার , ১৫ জুলাই, ২০২৬ at ৫:৩৫ পূর্বাহ্ণ

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে বেশি ‘ফোকাস’ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু। পুনর্বাসনের অংশ হিসেবে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরে আশার বাণী শোনান তিনি। সরকারি বরাদ্দ বিতরণে যেন কোনো দুর্নীতি না হয় সে ব্যাপারেও সতর্ক করেন তিনি।

গতকাল মঙ্গলবার রাত ৮টায় নগরের সার্কিট হাউসের সম্মেলন কক্ষে চট্টগ্রামের অতি বৃষ্টি ও বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশাসনের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের সাথে সভা করেন আসাদুল হাবিব দুলু। দুই ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চলা ওই সভায় বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের উদ্যোগগুলো তুলে ধরেন তিনি।

সভায় বক্তব্য রাখেন মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান ও সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন। বিভাগীয় কমিশনার ড. জিয়াউদ্দীনের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।

বন্যা চলাকালীন সরকারি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে জানিয়েছে আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, আমরা তাৎক্ষণিকভাবে বরাদ্দ পাঠিয়েছি। সেই বরাদ্দ হয়তো কোনো কোনো ক্ষেত্রে যোগাযোগের কারণে সঠিক সময়ে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। এখন তো পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে। তিনি বলেন, খেয়াল রাখতে হবে সরকারি বরাদ্দ যারা সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত, যারা সবচেয়ে দুর্গত এলাকার, তাদের জন্য। এখানে কোনো রাজনৈতিক বিবেচনা যেন করা না হয়। এটা সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত থাকতে হবে। অতীতে এই ত্রাণ নিয়ে নানান ধরনের অভিযোগ ছিল। আমাদের এই সরকার এ ব্যাপারে জিরো টলারেন্স। কোনো অবস্থাতেই, কোনো ক্ষেত্রে, কোনো স্তরে যদি এই ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ বা সম্পৃক্ততা থাকে, তাহলে অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে আমরা কঠিন ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

তিনি বলেন, এখন পুনর্বাসনই আমাদের মূল ফোকাস। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কৃষির ক্ষতিটাকে পুষিয়ে দেওয়া। মৎস্যতে আমি শুনেছি যে অনেক ঘের পানিতে ভেসে গেছে, অনেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সমাজকল্যাণ থেকেও ছোট ছোট আকারের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে বিনা সুদে টাকা দিবেন এবং কিছু আর্থিক সহায়তা এককালীন দিবেন।

কৃষিখাতে ক্ষতি কমাতে বীজ ও সার সরবরাহ করা হবে জানিয়ে ত্রাণমন্ত্রী বলেন, এই অঞ্চলে কৃষিতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। যেহেতু রোপা লাগানোর মুহূর্ত, রোপা চারা যেটা থাকে সেটার ক্ষতি হয়েছে। এজন্য আমরা বীজতলা আমরা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দিয়ে বলেন, বীজতলা করার ক্ষেত্রে আপনারা তাড়াতাড়ি অ্যাসেসমেন্ট নিবেন কোথায় উঁচু জায়গা রয়েছে, যেখানে আমাদের পক্ষে করা সম্ভব হবে। তাহলে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে বীজ সরবরাহ করা এবং তাৎক্ষণিক কিছু সার, অন্যান্য আনুষঙ্গিক আপনাদেরকে দেওয়া হবে। কারণ কৃষি ক্ষতি হয়ে গেলে অর্থনীতির উপর মারাত্মক চাপ তৈরি হবে।

মন্ত্রী বলেন, অনেকের ঘর ভেঙে গেছে, যাদের থাকার আশ্রয় নেই, আমি আগামীকালই চেষ্টা করব কিছু ঢেউটিন জেলায় বরাদ্দ দেওয়ার। অল্প সময়ের ভিতরে তাদের যাতে ঘরগুলো নির্মাণ করে দেওয়া যায়, তার পাশাপাশি গৃহনির্মাণ মঞ্জুরিও দেব।

তিনি বলেন, সবাই জানেন আমরা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার দিক থেকে তিন স্তরে কাজ করে থাকি। দুর্যোগ পূর্বে আগাম সতর্কবার্তা দিয়ে থাকি। দুর্যোগ চলাকালীন উদ্ধার কাজ করি, ত্রাণ কাজ পরিচালনা করি। দুর্যোগের পরে পুনর্বাসনের কাজ করে থাকি। তিনি বলেন, বিভিন্ন লোকালয়ে পানি প্রবেশ করেছে, এই পানি অনেকটা দূষিত পানি। এই পানি চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নানান ধরনের পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হবে।

ত্রাণমন্ত্রী বলেন, আজ আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা হয়েছে। সেখানে স্বাস্থ্যমন্ত্রীও ছিলেন। উনিও বলেছেন, তার স্বাস্থ্যকর্মীরা মাঠ লেভেলে কাজ করছেন। সেখানে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, এর বাইরে ডায়রিয়া ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগ মোকাবিলায় কতটুকু প্রস্তুতি রয়েছে, সেটা আপনারা উনাদেরকে বলবেন।

গোখাদ্য সরবরাহ করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, মানুষের খাদ্য তো আমরা দিতে পারছি। কিন্তু পশুর খাদ্য দিতে পারছি কি না সেটার অ্যাসেসমেন্ট আমাদের কাছে ও রকম নেই। আপনারা (সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা) তাৎক্ষণিকভাবে যদি এটার পরিসংখ্যান দিতে পারেন, আগামীকালই পশুর খাদ্য ক্রয়ের জন্য আমাদের মন্ত্রণালয় থেকে আপনাদের আর্থিক সহায়তা দিব। স্থানীয়ভাবে আপনারা কিনে যাদের যাদের মধ্যে বণ্টন করতে হবে সেটা আপনারা সঠিকভাবে বণ্টন করবেন। এখানে শিশুখাদ্যেরও প্রয়োজন হবে। কারণ বন্যায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশুরা, মায়েরা। আমরা শিশুখাদ্যের জন্য আপনাদেরকে টাকা বরাদ্দ দিব, সেটাও আপনারা দেখবেন।

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক সংস্কার প্রসঙ্গে আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, আমাদের প্রচুর রাস্তাঘাটের ক্ষতি হয়েছে। এটা অ্যাসেসমেন্ট হয়তো এখনো করতে পারেন নাই। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, জরুরি ভিত্তিতে আপনারা অ্যাসেসমেন্ট করে দিলে জরুরি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক মেরামত করবে। যদি সড়ক ও জনপথ বিভাগের সড়ক থাকে সেটা তারা করবে। একেবারে মাটির রাস্তা যেগুলো আমাদের মন্ত্রণালয় থেকে করে থাকি, সেগুলো আপনারা জরুরি ভিত্তিতে দিলে আমরা টিআর, কাবিখা, কাবিটার মাধ্যমে করে দেব।

মন্ত্রী আজ বুধবারও চট্টগ্রাম থাকবেন জানিয়ে বলেন, যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অ্যাসেসমেন্ট করে তার তালিকা আমার কাছে জমা দিতে পারেন। আমি ঢাকা ফিরে গিয়ে স্বস্ব মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করে সেখানে অর্থ বরাদ্দ যতটুকু লাগে ততটুকু দেওয়ার চেষ্টা করব।

মন্ত্রী বলেন, আজকে আমাদের দল থেকে একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেটি হচ্ছে দল থেকে কিছু সহযোগিতা দিবে। সেটা হয়তো দলের চ্যানেলের মাধ্যমে তারা বিতরণ করবে। কিন্তু আমাদের যে সরকারি বরাদ্দগুলো, এগুলো সরকারি চ্যানেলের মাধ্যমেই বিতরণ করব। সেখানে রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা হয়তো সহযোগিতা করবেন, আমাদের সংসদ সদস্যরা পরামর্শ দিবেন। উনারা নিজেরা উপস্থিত থাকেন, উনাদের অনেক বেশি দায়বদ্ধতাও রয়েছে এলাকাভিত্তিক। সেই কারণে সবাই ছুটে এসেছেন। প্রত্যেক সংসদ সদস্য এলাকায় এসেছিলেন এবং ব্যাপকভাবে তারা সহযোগিতা করেছেন।

আসাদুল হাবিব বলেন, সরকার এই দুর্গত মানুষের পাশে আছে এবং তাদের সার্বিক সহযোগিতার জন্য প্রধানমন্ত্রী আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, উনি সার্বক্ষণিকভাবে এটি মনিটরিং করছেন।

মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, চট্টগ্রামে যে রেকর্ড বৃষ্টিপাত হয়েছে, সেটি থেকে জানমালের ক্ষতি কমাতে সবগুলো সেবা সংস্থা যাতে মাঠপর্যায়ে কাজ করে, সেজন্য আমি একটি সমন্বয় সভার আয়োজন করি। সভার সিদ্ধান্তের আলোকে সবগুলো সেবা সংস্থাই মাঠপর্যায়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে যাতে জনগণকে রক্ষা করা যায়। আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে পাঁচ হাজার প্যাকেট ত্রাণ বিতরণ করেছি। এছাড়া সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকেও ত্রাণ ও খাদ্য সহায়তা বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া সিটি রেড ক্রিসেন্টের প্রেসিডেন্ট হিসেবে রেড ক্রিসেন্টকেও ত্রাণ বিতরণ এবং নানা মানবিক কাজে সংযুক্ত করেছি। এ সমন্বিত প্রচেষ্টার ফলে ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে।

সাইদ আল নোমান এমপি নগরের সংসদীয় আসনগুলোতে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা করতে স্থানীয় এমপিদের বরাদ্দ দেওয়ার প্রস্তাব করেন। সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, চট্টগ্রাম শহরে কিছু নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়, কিছু রাস্তাঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে আউটার রিং রোড, পতেঙ্গায় ডাইভাশন সড়ক ও অঙিজেনকুয়াইশ সড়ক। ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের পরিমাণ নির্ধারণ করা হচ্ছে।

সভায় সিভিল সার্জন জানান, সাপে কাটা রোগী বাড়ছে। এছাড়া বিভিন্ন উপজেলায় স্বাস্থ্য অবকাঠামো বা ৫৫টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জেলা প্রশাসক জানান, বন্যায় দক্ষিণ চট্টগ্রামের ৬টি উপজেলা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মারা গেছেন ১৫ জন, আহত হয়েছেন ১২ জন। কৃষি, প্রাণি ও সম্পদ খাতে ১৪৪ কোটি ৭৯ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধব্রাহ্মণবাড়িয়ায় চালককে কোপ, মীরসরাইয়ে পৌঁছার আগে মৃত্যু
পরবর্তী নিবন্ধসরকার সর্বোচ্চ দায়বদ্ধতা নিয়ে বন্যার্ত মানুষের পাশে রয়েছে