বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জন্ম শতবার্ষিকী আন্তর্জাতিক স্মারকগ্রন্থ

বিচিত্রা সেন

শুক্রবার , ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৫:৫৯ পূর্বাহ্ণ

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশত বার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে ভারতের ত্রিপুরার আগরতলা থেকে প্রকাশিত হলো ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জন্ম শতবার্ষিকী আন্তর্জাতিক স্মারকগ্রন্থ’। গ্রন্থটির প্রকাশক সুমন্ত সরকার, তুলসী পাবলিশিং হাউস আগরতলা, ত্রিপুরা,ভারত। প্রকাশকাল-১১ অক্টোবর ২০১৯। প্রচ্ছদ করেছেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী উত্তম সেন। চমৎকার প্রচ্ছদের এ গ্রন্থটির উপদেষ্টামণ্ডলীতে ছিলেন বাংলাদেশের সৈয়দ হাসান ইমাম ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের অধ্যাপক পবিত্র সরকার। প্রধান সম্পাদক হিসেবে রয়েছেন ড. আশিস বৈদ্য। সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন প্রখ্যাত গবেষক ও সংস্কৃতিজন ড. দেবব্রত দেবরায়।এ ছাড়াও ঢাকা, আগরতলা, কলকাতা, নয়াদিল্লী ও আসাম মিলিয়ে মোট একষট্টি জন সম্পাদকমণ্ডলীর দায়িত্ব পালন করেন।
গ্রন্থটির শুরুতেই রয়েছে ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরীর শুভেচ্ছাবার্তা। তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জন্ম শতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি, বাংলাদেশের প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এরপরই রয়েছে সম্পাদকের বক্তব্য, যার শিরোনাম দেওয়া হয়েছে ‘কেন এই বিনম্র প্রয়াস।’ সম্পাদকের কারণ ব্যাখ্যা পড়তে গিয়ে আবেগাপ্লুত হতে হয়, হতে হয় গর্বিত। আমাদের মাথাটি উঁচু হয়ে যায় যখন আমরা জানতে পারি আমাদের প্রাণের নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশের নেতাই নন, তিনি পৃথিবীর তাবৎ বাঙালির নেতা। তাই তো এ মহান নেতার জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের জন্য ২০১৯ সালের মার্চ মাসে ত্রিপুরাতে গঠিত হয় ‘দ্বি-বর্ষব্যাপী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জন্ম শতবর্ষ উদযাপন কমিটি ২০১৯-২১’। ২০১৯ সালের ১০ মার্চ আগরতলার সুকান্ত একাডেমিতে দ্বি-বর্ষব্যাপী কর্মসূচির সূচনা ঘটে। সে কর্মসূচি থেকেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় “বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক স্মারকগ্রন্থ” প্রকাশের। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে সারা বিশ্ব থেকে দুশোর অধিক কবি লেখক তাঁদের লেখা পাঠান। সেই লেখাগুলোই সংকলিত হয়েছে এ গ্রন্থে।
৩১২ পৃষ্ঠার লেখা এবং ০৩ পৃষ্ঠার ফটো অ্যালবামসহ মোট ৩১৫ পৃষ্ঠার এই বইটি বঙ্গবন্ধুকে বিশদভাবে জানার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে। এতে গল্প এবং প্রবন্ধ মিলিয়ে মোট বায়াত্তরটি গদ্য রচনা স্থান পেয়েছে। যার প্রতিটিই সুলিখিত এবং তথ্যজ্ঞান সমৃদ্ধ। এতে যেমন আছে তোফায়েল আহমেদ, মতিয়া চৌধুরী, আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী, রেজাউল হক চৌধুরী মোশতাকসহ প্রমুখ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের সুলিখিত ইতিহাসসমৃদ্ধ প্রবন্ধ, তেমনি আছে সেলিনা হোসেন, কামাল লোহানী, অনুপম সেন, আবুল মোমেন, কমলেশ দাশগুপ্ত, বুলবুল মহলানবীশসহ আরও অনেক সুলেখক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের লেখাও।
এর পাশাপাশি কলকাতা, আগরতলা, শান্তিনিকেতন, মগুরা, কুচবিহার, নৈহাটি, শিলিগুড়ি, বাইখোড়া, বিশালগড়, সাব্রুম, সুইডেন থেকে বিশিষ্ট লেখকরা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে নানামুখী তথ্যসমৃদ্ধ লেখা দিয়ে সংকলনটির উৎকর্ষতা বাড়িয়েছেন। এই লেখাগুলো পাঠে একদিকে যেমন বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের অনেক জানা অজানা তথ্য গোচরীভূত হয়, তেমনি ব্যক্তি শেখ মুজিবেরও অনেক অজানা তথ্য পাঠকমনকে শিহরিত ও আন্দোলিত করে দেয়। এক কথায় বলতে গেলে এ যেন এক বঙ্গবন্ধুর জীবনপঞ্জি।
বায়াত্তরটি গদ্য রচনার পাশাপাশি এই গ্রন্থে স্থান পেয়েছে একশ তেইশটি কবিতা। এতে যেমন আছে নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা, আসাদ চৌধুরী, অসীম সাহা, রাশেদ রউফ, বীথি চট্টোপাধ্যায়, আনসার উল হক, পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় প্রমুখের কবিতা তেমনি আছে দেশ বিদেশের নানা প্রান্ত থেকে পাঠানো মুজিবপ্রেমী অনেক খ্যাত-অখ্যাত কবির কবিতা। অনেক অনেক অসাধারণ কবিতার মাঝে কিছু কবিতা হয়তো শিল্পোত্তীর্ণ হতে পারেনি, তবে প্রতিটি কবিতার প্রতিটি চরণে রয়েছে বঙ্গবন্ধুর প্রতি গভীর ভালোবাসা। একজন নেতা কতটা সংগ্রাম, কতটা ত্যাগের বিনিময়ে একটি জাতির পিতা হয়ে উঠতে পারেন তারই যেন চিত্রময় রূপ পাই আমরা প্রতিটি কবিতার পংক্তিতে পংক্তিতে। এক কবি বলেন-
‘টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম নিল
এক যে বাঘের বাচ্চা
বড় হয়ে তিনিই হলেন
সাচ্চা নেতা সাচ্চা।
বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা
জাতির জনক তিনি
নিজের জীবন বাজি রাখলেন
মুছতে জাতির গ্লানি।’
(মুক্তিদাতা বঙ্গবন্ধু/ রুবীনা আজাদ)

কবিতার চরণে উঠে এসেছে পঁচাত্তরের সেই অভিশপ্ত রাতের বর্ণনাও-
‘একজন কর্নেল বঙ্গবন্ধুকে দেখেই
চমকে উঠলো,ভয়ে মাথা নিচু
করে রইলো সে।কিন্তু পরের জন
থামলো না। তার মেশিনগান গর্জে
উঠলে। আটাশটি বুলেটে বিধ্বস্ত
হলো গোটা বাংলাদেশ।
সিঁড়ির ওপর পড়ে রইলো
স্পার্টাকাসের নিস্তব্ধ ডেডবডি।’
(সেই দুঃসহ রাত্রি/ লুৎফর চৌধুরী)

কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেও খুনীরা বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে দিতে পারেনি এই বাংলার মাটি থেকে। তাই তো আরেক কবি উচ্চারণ করেছেন–
‘কিন্তু তোমার নেই মৃত্যু অমন
তোমাকে রেখেছে মনে এই জনগণ
পাখির কণ্ঠ থেকে ভেসে আসে সুর
জাতির জনক তুমি শেখ মুজিবুর।’
(বঙ্গবন্ধু তুমি অমর/ রাশেদ রউফ)

এভাবে বঙ্গবন্ধুর জীবনের নানা অধ্যায় উঠে এসেছে গ্রন্থটির পরতে পরতে। সবশেষে গ্রন্থটিতে সংযোজিত হয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সংক্ষিপ্ত জীবনী।এতে স্থান পেয়েছে জাতির পিতার জীবনের উল্লেখযোগ্য সব ঘটনা, যা সন তারিখসহ সন্নিবেশিত হয়েছে। সংকলনটিতে আরো কয়েকজন জাতীয় ব্যক্তিত্ব ও লেখকের লেখা থাকলে এটি আরো সমৃদ্ধ হতো নিঃসন্দেহে।
চমৎকার প্রচ্ছদ, তথ্যবহুল প্রবন্ধ, আবেগঘন গল্প, সরস স্মৃতিচারণ ও তীব্র অনুভূতির কবিতা সব মিলিয়ে গ্রন্থটি সংগ্রহে রাখার মতো একটি গ্রন্থ। বঙ্গবন্ধুকে যাঁরা ভালোবাসেন, যাঁরা তাঁকে প্রতিনিয়ত হৃদয়ে অনুভব করেন তাঁদের জন্য এ গ্রন্থ একটি অমূল্য উপহার, অতুলনীয় প্রাপ্তি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জন্ম শতবার্ষিকী আন্তর্জাতিক স্মারকগ্রন্থ সম্পাদনা পরিষদকে ধন্যবাদ এমন একটি চমৎকার গ্রন্থ প্রণয়নের জন্য। কামনা করি গ্রন্থটির বহুল প্রচার এবং সুলভ প্রাপ্তি।

x