ফ্যান্টাসি গল্পের খোঁজে

সাবিনা পারভীন লীনা | শুক্রবার , ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২২ at ৪:৫৭ পূর্বাহ্ণ

একটা অনলাইন সাহিত্য পত্রিকায় মাঝেমধ্যে আমার গল্প ছাপে, এবার নারী গল্পকারদের নিয়ে বিশেষ সংখ্যার জন্য একটা গল্প চাইলেন সম্পাদক। বললাম গল্প লেখা নাই, তখন সম্পাদক বললেন, সময় আছে লিখে দেন। আপনার গল্প ছাড়া বিশেষ সংখ্যা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। কেউ লিখে দেন বললেই লেখা হয়? এই কথা সম্পাদককে বলতে গিয়েও বলিনি, বলে লাভ হবে না, দুর্বলতা প্রকাশ ছাড়া। তারপর সম্পাদক বললেন, গল্প হবে ফ্যান্টাসি, মানে কাল্পনিক। বলতে চেয়েছি কল্পগল্প লিখতে পারি না, দুঃখিত, কিন্তু সংযত হলাম। সম্পাদকের সঙ্গে বিরোধ করে বিপদ ডেকে আনার মানে হয় না। বললাম শুধু- ‘চেষ্টা করব’
উত্তরে বলেন, চেষ্টার কিছু নাই, কলম ধরবেন হয়ে যাবে। গল্প দিচ্ছেন এইটাই ফাইনাল। বলতে ইচ্ছা হইছিল, কলম ধরলে হয়ে গেলে আপনি ধরছেন না কেন? বলিনি, নিজের ক্যারিয়ারের কথা ভেবে। গল্প লেখার বিষয় মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলি, মনে মনে ঠিক করি সময় হলে কিছু একটা বলে দুঃখ প্রকাশ করবো।
কয়েকদিন ভালোই কাটল, তারপর একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটল আমার মধ্যে, একটা ফ্যান্টাসিনির্ভর গল্প কী করে লেখা যায় সেই ভাবনা আমাকে পেয়ে বসে। ভাবতে ভাবতে কোনো কোনো দিন রাতের ঘুম হারাম হয়ে যাচ্ছে। এক রাতে ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে ঘুমালাম, পরদিন দুপুরে ঘুমঘুম চোখে বালিশে শরীর এলিয়ে দিতেই তন্দ্রার মতো এসে যায়।
একটা কায়ক্লিষ্ট মেয়ে, আমাদের গার্মেন্টসের মেয়েদের মতো, মেয়েটা এসে মাথা নিচু করে আমার সামনে এসে দাঁড়ায়, ম্যাডাম আমার নাম নুসরাত, আপনি গল্প লেখার চেষ্টা করছেন, আমার গল্পটা লেখেন, একেবারে কাল্পনিক।
তাহলে গল্পটা শুনেন বলে আমার সামনে বসে মেয়েটা, আমাকে পুলিশ যখন একটা ঘরে নিয়ে গেল জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তখন আমার মাথায় তীব্র যন্ত্রণা, সেই ঘরটা তেমন বড় নয়, কেমন গুমোট আবহাওয়া। মাথার ওপর বিশ্রি শব্দ করে একটা পাখা ঘুরছে, শব্দটা মাথার যন্ত্রণাকে বাড়িয়ে দেয়। বহু কষ্টে ঘাড় উঁচু করে অসহায় দৃষ্টিতে পাখার দিকে তাকিয়ে থাকি, কিছুক্ষণ পরে আমার মাথা ঘুরতে থাকে। মাথা নামিয়ে বহু কষ্টে গুমোট ঘরটাকে একবার এক নজরে দেখে নিয়ে টেবিলে হাতের কব্জিতে মাথা রাখি, কখন তন্দ্রার মতো এসে যায় বুঝতে পারি নি।
হঠাৎ পুলিশ কর্মকর্তার হুঙ্কার, নাম কি ?
আমি চমকে উঠে মাথা তুলে অফিসারের দিকে তাকাই।
বলছি, কি নাম?
টেবিলে আবার মাথা রেখে বলি, ‘নুসরাত।’
মেয়ের নাম কি?
কোন মেয়ে?
মেয়ে মানে, বাচ্চা, যে বাচ্চাটাকে গলা টিপে হত্যা করেছ, তার নাম।
আমি এবার টেবিল থেকে মাথা তুলি, তখন চোখ থেকে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।
‘জান্নাত, জান্নাতুল ফেরদৌস।’
কক্ষটা খুব বড় নয়, তবে উঁচু ছাদ, লোহার মোটা রড দেয়া বড় জানালা। একটা টেবিলের এক দিকে কাঠের চেয়ারে আমি, অপর দিকে থানার দারোগা, এক কোণে ফাইল হাতে একজন দাঁড়িয়ে, জবানবন্দি রেকর্ড কোজে নিয়োজিত সে। বাইরে দুইজন নারী কনস্টেবল।
মাথার ওপরের ফ্যানের ঘরঘর শব্দ হঠাৎ বেড়ে যায়। টেবিলের ঠিক মাঝ বরাবর একটা বাল্ব ঝুলছে লম্বা তারের মাথায়, মনে হচ্ছে এখনই ছিঁড়ে পড়ে যাবে। দিনে দুপুরে হলেও লাইটটা জ্বলছে।
তোমার স্বামী কোথায়?
স্বামী নাই।
নাই মানে?
ছিল, বাচ্চাসহ আমাকে ফেলে চলে গেছে।
স্বামী কি করতো?
গার্মেন্টসে কাজ করতো। একসঙ্গে কাজ করতাম, ছোট ভাইও করতো। পেটে বাচ্চা আসার পর চাকরি চলে যায়।
ডিভোর্স হয়েছে?
না।
তা হলে স্বামী আছে?
‘মনে করলে আছে, মনে না করলে নাই।’
আমার কথা শুনে পুলিশ কর্মকর্তা গলার স্বর চড়া করে জানতে চায়,স্বামীর নাম কি?
‘সাইফুল ইসলাম।’
পিতার নাম কি?
মোতালেব মিঞা
পিতা আছেন?
নাই,
নাই, মানে কতোদিন আগে মারা গেছেন?
মারা যান নি, এখনো জীবিত আছেন।
নাই বলছ কেন?
স্বামী ছেড়ে চলে যাওয়ার পর শিশু বাচ্চাসহ আব্বার কাছে যাই, আব্বা কুকুর বেড়ালের মতো বাড়ি থেকে বের করে দিলেন। বলেছেন ঝামেলা নিতে পারবো না। স্বামী চলে যাওয়ার জন্য আমাকে দায়ী করলেন, আমার দোষে নাকি স্বামী চলে গেছে, বললেন স্বামীকে খুঁজে নিতে। আম্মা বললেন, কষ্ট করে সবাই একসঙ্গে থাকি, আব্বা রাজি হলেন না।
আব্বা কি করেন?
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী
‘তুমি এই হাত দিয়ে জান্নাতের গলা টিপে ধরেছ?’ বলে দারোগা হাত দুটো দেখতে চায়। আমি দুটো হাতের তালু টেবিলের ওপর মেলে ধরি।
‘কোন হাত দিয়ে মেরেছ?’
আমি বাম হাতটা নামিয়ে নীরবে ডান হাতের তালুটা আরো একটু এগিয়ে দেই।
ক্ষীণ হলুদ আলোতে হাতের তালুটাকে পাঙ্গাস মাছের কানসার মতো দেখায়, নিজের হাত দেখে নিজেই চমকে উঠি, দেখি আমার মতো দারোগাও চমকে ওঠেন।
তোমার হাতের তালুর এই অবস্থা কেন?
ইট ভাঙ্গি।
দারোগা মধ্যমা আঙ্গুলটা টেনে হাতটা আরো কাছে নিয়ে কি যেন পরখ করে।
এই হাত খুনির হাত…
এই হাত দিয়ে একসময় ডলার কামাই হতো
ডলার কামাই হতো মানে?
বুঝলেন না, সহজ কথাটা বুঝলেন না? গারমেন্টে সেলাই মেশিন চালাতাম..
ছেড়ে দিলে কেন?
ওই যে বললাম পেটে বাচ্চা আসার পর ছাটাই করে দিল, এখন ইট ভাঙি, ঠিকাতে, ফুট বারো টাকা দরে। দুইশ ফুট না হলে ঠিকাদার টাকা দেয় না।
তুমি মা হয়ে এই কাজ কি করে করেছ?
কোন কাজ?
ওই যে, নিজের সন্তানকে গলা টিপে মেরেছ!
কে বলেছে আমার সন্তানকে মেরেছি?
কেন তুমি নিজের সন্তানের গলা টিপে ধরেছ?
আচ্ছা, সেই কথা, ক্ষুধার জন্য, ঠিকাদারের কাছে কতবার টাকা চেয়েছি দেয়নি, বলে দুইশ ফুট হলে তখন দেবে। তিনদিন কেবল একটা রুটি খেয়ে আছি, বাচ্চাটাকেও একটা রুটি খাইয়েছি। ক্ষুধার কষ্ট মেয়েটা সহ্য করতে পারেনি, কেবল কান্না করে গেছে। ক্ষুদার কষ্ট কি আমি জানি, আমিও সহ্য করতে পারি না। দুইশ ফুট করতে বেশি বাকি ছিল না, দাঁতের ওপর দাঁত চেপে ইট ভেঙে চলেছি, মেয়ের কান্না কিছুতেই থামছে না, মাথায় রক্ত উঠে যায়, রাগে মেয়ের গলা চেপে ধরি। তারপর দেখি চোখ উল্টে হাত-পা ছেড়ে দিয়েছে। এর আগে কতবার গলা টিপে ধরেছি, মরেনি, এবার মরে গেছে, ক্ষুধায় কাহিল ছিল তো..
তুমি স্বীকার করছ যে, নিজ হাতে নিজের সন্তানের গলা টিপে হত্যা করেছ?
আমি চুপ করে থাকি, আসলে আমার কি বলার আছে, যেভাবে হোক আমার হাতেই তো মেয়েটা মারা গেছে, আমি বলি, খুন করতে চাইনি গলা চেপে ধরেছি কেবল।
কথা একই হলো, এই খুনের জন্য তুমি দায়ী।
আমি দায়ী অস্বীকার করছি না, এই শিশু সন্তানের খুনের জন্য আমি কি একা দায়ী? যে ঠিকাদারের কাছে তিনদিন থেকে কাকুতি-মিনতি করেছি টাকার জন্য সে দায়ী নয়? আমার হাতের তালুটা আবার বাড়িয়ে দিয়ে বলি, যে কারখানার জন্য এই হাতে ডলার তৈরি হতো, পেটে বাচ্চা আসার পর সেই কারখানা তাড়িয়ে দিল, তারা কি দায়ী নয়? আমার স্বামী, পিতা কেউ দায়ী নয়?
না, কেউ দায়ী নয়, তুমি নিজ হাতে খুন করেছ, তুমিই দায়ী। তোমার কঠোর শাস্তি হবে।
তখন আমার কেমন যেন হাসি পেল, দারোগার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ, বড়ো করুণা হলো অফিসারটার জন্য। অফিসারের কপালে ঘাম, আমি চিন্তা করি অফিসার ঘামছে কেন?
তুমি হাসছ, তোমার ভয় হচ্ছে না?
হচ্ছে, আমার ভয় ক্ষুধাকে, মৃত্যুদণ্ডকে নয়। মৃত্যুদণ্ডের চাইতেও ক্ষুধা ভয়ানক। আমার বাচ্চাটা ক্ষুধার জন্যই দুনিয়া থেকে চলে গেল। চোখ ঝাপসা হয়ে অন্ধকার নেমে আসে। মৃত্যুদন্ড দিয়ে একজন দুইজন, দশ জনকে মারা যায়, আর ক্ষুধায় মরে হাজারে হাজার, লাখে লাখে।
পুলিশ কর্মকর্তা নির্বিকার। মনে হচ্ছে উনি কোনো কথা খুঁজে পাচ্ছেন না।
আপনারা এতো ভালো ব্যবহার করছেন, আমি মনে করেছি খুব খারাপ ব্যবহার করবেন, মারধর করবেন। আমি জানি পুলিশ অনেক খারাপ, আপনারা এতো ভালো কেন?
সত্য ঘটনা বের করার জন্য খারাপ ব্যবহার করতে হয়, তুমি তো সব বলে দিচ্ছ। তবে তুমি নিজ হাতে সন্তানকে হত্যা করেছ, তুমি অনেক জঘন্য মেয়ে, তোমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা দরকার। কিন্তু কেন যে খারাপ ব্যবহার করতে পারছি না, বুঝতে পারছি না।
তরুণ পুলিশ কর্মকর্তা হঠাৎ চেয়ার ছেড়ে দাঁড়ায়, ঘরে পায়চারি করে। বুটের শব্দটা অদ্ভুত লাগে, মনে হয় একজন মাতাল বিক্ষিপ্ত পায়ে হেঁটে চলেছে, এখনই টাল সামলাতে না পেরে হুমড়ি খেয়ে পড়বেন। পুলিশ কর্মকর্তার ইশারায় জবানবন্দী রেকর্ড করা পুলিশটা কক্ষ ত্যাগ করে।
আমার মনে হচ্ছে এই পুলিশ কর্মকর্তা যেকোনো সময় মাটিতে লুটিয়ে পড়বেন শরীরের টাল সামলাতে না পেরে, পতনের আগে আমার একটা প্রশ্নের উত্তর জানা দরকার। আমার কি মৃত্যুদণ্ড হবে, নাকি যাবজ্জীবন।
পুলিশ কর্মকর্তা টলতে টলতে বলেন, ‘সেটা আদালত বলতে পারে, আমরা কি করে বলবো? তবে মৃত্যুদণ্ড হতে পারে, আবার যাবজ্জীবনও হতে পারে।
বিশ্বাস করেন, আমি তখন আমার মৃত্যুদণ্ডের কথা ভেবে নয়, টলায়মান পুলিশ কর্মকর্তার কথা ভেবে চিন্তিত হয়ে পড়ি।
টিভির শব্দে তন্দ্রা কেটে যায়, কোন এক মন্ত্রীর বয়ান দিয়ে পরিপাটি নিউজকাস্টার, ‘দেশে অভাব বলে কিছু নাই, দেশটা একেবারে বেহেস্ত হয়ে গেছে–এই জাতীয় কথা বলছেন।
আমি ডান হাতের তালুতে চোখ রগড়ে নুসরাতকে খুঁজতে থাকি…নুসরাত..নুসরাত …