প্রবাহ

আহমদুল ইসলাম চৌধুরী

বুধবার , ২৫ মার্চ, ২০২০ at ৫:৩৫ পূর্বাহ্ণ
46

ইরাকে ঐতিহাসিক কুফার প্রাসাদ
ইরাকের রাজধানী বাগদাদ। বাগদাদ থেকে প্রায় ১৩০ কি.মি দূরত্বে ঐতিহাসিক কুফা নগরী। কুফা থেকে কারবালার দূরত্ব প্রায় ৩০ কি.মি। বিশ্বের ইতিহাসে আলোচিত ও বহু ঘটনাপ্রবাহের নীরব সাক্ষী প্রাসাদগুলোর মধ্যে কুফা’র প্রাসাদ অন্যতম একটি। আমিরুল মোমেনীন হযরত ওমর (রা.)’র আমলে মূলকে শাম ইরাক অঞ্চল বিজিত হয়। তাঁর নববিজিত অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণের সুবিধার্থে হযরত ওমর (রা.)’র নির্দেশে প্রখ্যাত সাহাবী ও সেনাপতি হযরত সাদ ইবনে আবী ওয়াক্কাস (রা.) এ প্রাসাদ নির্মাণ করেন। বর্তমানে প্রাসাদ নামকরণ করা হলেও মূলত তা কিল্লা হিসেবে নির্মাণ করা হয়েছিল। কিল্লার ভিতর যাবতীয় নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকত। যেমন: গভর্নর, সেনাপ্রধান, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাগণের অবস্থানের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ। সাথে সাথে মুসলিম মুজাহিদ তথা সেনাগণের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা। ইসলামের ইতিহাসে এ কিল্লাই প্রথম নির্মিত কিল্লা হিসেবে খ্যাত। ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে এ কিল্লার কাজ শুরু হয়। প্রথমদিকে সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গিতে এ কিল্লা নির্মাণ করা হলেও হযরত আমিরে মুয়াবিয়ার আমলে তাঁর নির্দেশে ৬৭০ খ্রিস্টাব্দে এ কিল্লাকে আরও বৃহত্তর পরিসরে মজবুত আকারে নির্মাণ করা হয়। তখনকার কুফার গভর্নর যিয়াদে এ প্রাসাদের নির্মাণ কাজ করান। এ প্রাসাদের নামকরণ করা হয় দার আল-ইমারা। একইবছর হযরত সাদ ইবনে আবী ওয়াক্কাস এ কুফাতে ঐতিহাসিক জামে মসজিদ নির্মাণ করেন এবং সাথে সাথে হযরত ওমর (রা.)’র অনুমতিক্রমে কুফা নগরীর ভিত্তি স্থাপন করেন। কুফার জামে মসজিদ নির্মাণে এ প্রখ্যাত সাহাবা মসজিদে নববীর অনুকরণে রাখতে সচেষ্ট ছিলেন। তারও আগে হযরত সাদ ইবনে আবী ওয়াক্কাস নির্মিত কিল্লা ব্যবহার করেছিলেন ইসলামের ৪র্থ খলিফা হযরত আলী (ক.)। তিনি ভৌগোলিক অবস্থান ও রাজনৈতিক নানাবিধ বিষয় চিন্তা করে মুসলিম জাহানের খেলাফতের রাজধানী পবিত্র মদিনা থেকে কুফায় স্থানান্তর করেছিলেন।
কুফার ঐতিহাসিক জামে মসজিদে ফজরের নামাজের জন্য যাত্রাকালীন তিনি জনৈক ঘাতকের আঘাতে মারাত্মকভাবে আহত হন। প্রায় তিনদিন পর তিনি শাহাদাত বরণ করেন। কুফার প্রায় দশ কি.মি দূরত্বে নজফে হযরত আলী (ক.) চিরনিদ্রায় শায়িত। তাঁর বিশাল মাজার। প্রায় এক কি.মি এরিয়া নিয়ে মাজার কমপ্লেঙ। আমিরুল মোমেনীন হযরত ওমরের নির্দেশে নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে দার আল-ইমারা ও জামে মসজিদ পাশাপাশি নির্মাণ করা হয়। দার-আল-ইমারার অভ্যন্তরে হযরত সাদ (র.) বাইতুলমাল বা রাষ্ট্রীয় ধনাগার প্রতিষ্ঠিতা করেন। দার আল ইমারা নির্মাণে মজবুতিকরণের উদ্দেশ্যে পারস্যের দখলে আসা চোখ ঝলসানো প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ এনে সংযোজন করা হয়েছিল। একজন পারসিক প্রকৌশলী দার আল-ইমারা নির্মাণ ও সম্প্রসারণ কাজ তদারক করেছিলেন। আমিরে মুয়াবিয়ার আমলে কুফার গভর্নর দার আল-ইমারার সাথে সাথে কুফার জামে মসজিদও ৬৭০ খ্রিস্টাব্দে পুনঃ নির্মাণ করেছিলেন। আমিরে মুয়াবিয়ার মৃত্যুর পর তাঁর কুখ্যাত পুত্র ইয়াজিদের আমলে কুফার গভর্নর ছিলেন হযরত নোমান ইবনে বশির (র.)। ঐ সময় কুফাবাসির আমন্ত্রণে হযরত ইমাম হোসেন (র.) আহলে বাইতের কাফেলা নিয়ে হেজাজ থেকে কুফার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন। কুফাবাসি হযরত ইমামকে স্বাগত জানাতে প্রতীক্ষারত। হযরত ইমাম হোসেনের অগ্রদূত হযরত মুসলিম বিন আকিল (র.) তখন অবস্থানরত। দামেস্কে বসে ইয়াজিদ সংবাদ পান তার কুফা গভর্নর হযরত নোমান ইবনে বশির (র.) হযরত ইমাম হোসেন (র.) ও আহলে বাইতের প্রতি দুর্বলতা প্রদর্শন করছে, পালন করছে নীরবতা। এখানে উল্লেখ্য, রাষ্ট্রীয় আনুগত্যের স্থলে আহলে বাইতের প্রতি শ্রদ্ধা ও মোহাব্বত বহুগুন উর্ধ্বে। শুধু তাই নয়, আহলে বাইয়েতর প্রতি মোহাব্বত ঈমানের অঙ্গ। কাজেই এক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় আনুগত্যের প্রশ্ন আসতে পারে না যদি মুসলমানিত্ব দাবি করা হয়। তখন বসরার গভর্নর ছিলেন অপর কুখ্যাত ওবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদ। এ নরাধম কুখ্যাত ইবনে যিয়াদকে ইয়াজিদ দামেস্ক থেকে কুফার গভর্নরের নিয়োগপত্র পাঠিয়ে দেন,সাথে হযরত নোমান ইবনে বশির (রহ.) কে বরখাস্তপত্র ও দামেস্ক রিপোর্ট করতে বলেন। এও বলেন হযরত ইমাম হোসেন কুফা পৌঁছার পূর্বে বসরা থেকে দ্রুত কুফায় এসে যেন গভর্নরের দায়িত্বভার গ্রহণ করে। ধূর্ত ওবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদ রাতের অন্ধকারে হেজাজের পথে হেজাজবাসির পোশাক পরে কুফার প্রাসাদে প্রবেশ করে। তৎক্ষণাৎ হযরত নোমান ইবনে বশির (র.) কে অব্যাহতি দেয়। হযরত ইমাম হোসেনের অগ্রদূত কুফায় অবস্থানরত হযরত মুসলিম ইবনে আকিল (র.)কে তাঁর পুত্রসহ হত্যা করে। কুফা থেকে প্রায় ৩০ কি.মি দূরত্বে ইয়াজিদ বাহিনী ইবনে যিয়াদের নির্দেশে মরুভূমি কারবালা অবরোধ করে। ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে হযরত ইমাম হোসেনসহ আহলে বাইতের সমস্ত পুরুষ (হযরত ইমাম জয়নুল আবেদীন বাদে) ও সক্ষম সমস্ত পুরুষগণকে শহীদ করে ইবনে যিয়াদের নির্দেশে হযরত ইমাম পরিবারের মহিলাগণকে কুফার প্রাসাদে ইবনে যিয়াদের দরবারে নিয়ে যাওয়া হয়। তথায় হযরত ইমাম পরিবারকে নানানভাবে হেয় করা হয়। ঐ সময় হযরত আলী (ক.)’র অপর কন্যা হযরত ছৈয়দা যয়নব (র.)’র দৃঢ় অবস্থানের কারণে ইমাম জয়নুল আবেদীন প্রাণে রক্ষা পায়। না হয় ঐ কুফার প্রাসাদে কুখ্যাত ইবনে যিয়াদ আহলে বাইতের একমাত্র জীবিত উজ্জ্বল নক্ষত্রকে তথায় শহীদ করে ফেলত। আহলে বাইতের মহিলা কাফেলাকে অত্যন্ত হেয় ব্যবস্থাপনায় কুফার প্রাসাদ থেকে দামেস্কে ইয়াজিদের দরবারে প্রেরণ করে ইবনে যিয়াদ। সাথে হযরত ইমাম হোসেন (র.)’র মস্তক মোবারকও। এখানে উল্লেখ্য, আমিরে মুয়াবিয়ার পিতা আবু সুফিয়ানের বাঁদীর ঘরের সন্তান হল যিয়াদ। ইসলামের প্রাথমিক যুগে তারও আগে কৃতদাসীকে বিবাহবহির্ভূত ব্যবহার বৈধ ছিল। আবু সুফিয়ান (র.)’র পুত্র আমির মুয়াবিয়া বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া যিয়াদকে কাজে টানতেন না। বাদীর বাচ্চা বলতেন। এ যিয়াদের কুখ্যাত সন্তান বাদীর ঘরের নাতী হল ওবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদ।
ঐতিহাসিক ও ইসলামের ইতিহাসের প্রথম কিল্লা দার আল-ইমারার আরও বহুবিধ ইতিহাস রয়েছে। ইচ্ছা করলে এই কিল্লাকে নিয়ে একটি বৃহদাকারের গ্রন্থ রচনা করা যাবে। আব্বাসীয় খলিফা আল মনসুর দজলা নদীর তীরে চোখ ঝলসানো বাগদাদ নগরী প্রতিষ্ঠা করে আব্বাসীয় খেলাফতের রাজধানী কুফা থেকে বাগদাদে স্থানান্তর করেন। তখন থেকে কুফার এ ঐতিহাসিক দার আল ইমারার গুরুত্ব হঠাৎ করে নীচে নেমে যায়। কালের আবর্তে পরিত্যক্ত হয়ে যায়। এই পরিত্যক্ত দার আল-ইমারাকে ইরাকী প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে নানাভাবে খনন করে পুনঃ আবিষ্কার করে এবং সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে। ১৯৫৩ ও ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে ঐতিহাসিক দার আল-ইমারা কে সংস্কার করা হয়। ইরাকের স্বাভাবিক অবস্থায় দৈনিক হাজার হাজার যেয়ারতকারী ও পর্যটক কুফা নগরীতে প্রবেশ করতেন। কুফাতে অনেক সাহাবা, তাবেয়ীন, ইমাম, অলি ও দরবেশের কবর রয়েছে। ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে সপ্তাহখানেকের জন্য ইরাক সফর করা হয়েছিল। সে সময় সারাদিনব্যাপী কারবালা,নজফ, কুফা যেয়ারতের পাশাপাশি এ ঐতিহাসিক প্রাসাদ দার আল-ইমারা দেখার সুযোগ হয়েছিল।
লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক ও কলাম লেখক