প্রবাহ

পবিত্র মদিনায় দুই দুষ্টের পরিণতি

আহমদুল ইসলাম চৌধুরী

বুধবার , ১৩ নভেম্বর, ২০১৯ at ৪:৩৮ পূর্বাহ্ণ
38

পবিত্র মদিনা মুনাওয়ারায় ইউরোপের দুই দুষ্ট দুর্বৃত্তের পরিণতির কথা সচেতন মুসলমানগণের মধ্যে অনেকের জানা থাকার কথা। তারপরেও মহান রবিউল আউয়াল মাসে পুনঃ পেশ করলাম।
ওফাতের পর থেকে পবিত্র মদিনায় শায়িত নবী পাক (স.)’র প্রতি মহব্বত ভক্তি ও শ্রদ্ধা প্রদর্শনপূর্বক অসংখ্য মুসলিম যেমন আবহমানকাল থেকে পেয়ে যাচ্ছেন অলৌকিক রেযাহমন্দিসমূহ, তেমনি চরম বেয়াদবীর ধৃষ্টতা দেখাতে গিয়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ভোগ করে দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে হয়েছে অনেককে। তন্মধ্যে রয়েছে দুই কাফিরের ধৃষ্টতা ও তার দৃষ্টান্তমূলক পরিণাম।
হিজরি ৫৭৭ সনের ঘটনা। তখন পবিত্র মদিনা মিসরের মতান্তরে মূলকে শামের অধীনে ছিল। সুলতান নুুরুদ্দিন মাহমুদ জঙ্গি শাসনকর্তা। তিনি ছিলেন নিতান্ত ধর্মপরায়ণ এবং আদর্শবান শাসক। একজন অমিততেজ শক্তি সম্পন্ন মহাবীর রূপেও ইতিহাসে কিংবদন্তী হয়ে রয়েছেন। এক রাতে সুলতান নুরুদ্দিন তাহাজ্জুদ পড়ার পর ঘুমিয়েছিলেন। স্বপ্নে দেখলেন, নবী পাক (স.) নীল বর্ণের চক্ষুবিশিষ্ট দু’ব্যক্তির প্রতি ইশারা করে বললেন, নুরুদ্দিন! এই দুই দুর্বৃত্তের দুরভিসন্ধি ও ধৃষ্টতা অনতিবিলম্বে বানচাল করে দাও। এরূপ স্বপ্ন দেখে ঘাবড়ে গেলেন। তাঁর চোখ খুলে গেল। উঠে ওযু করলেন এবং নফল নামাজ পড়ে পুনরায় শুয়ে পড়লেন। তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়লে পুনরায় তিনি একই স্বপ্ন দেখলেন। এবারও তিনি জেগে উঠলেন এবং ওযু করে পুনরায় নফল নামাজ পড়লেন অতঃপর শুয়ে পড়লেন। আশ্চর্যের বিষয় যে, তৃতীয়বারের মতও তিনি সেই একই স্বপ্ন দেখলেন। এবার সুলতান এই বলে শয্যাত্যাগ করলেন যে,আর কিছুতেই বিছানায় শুয়ে থাকা যায় না।
দুশ্চিন্তাগ্রস্ত অবস্থাতেই তিনি প্রধান উজির জামালুদ্দিনকে ডেকে পাঠালেন। উজির জামালুদ্দিন ছিলেন অত্যন্ত পরহেজগার এবং দূরদর্শি ব্যক্তি। স্বপ্নের বৃত্তান্ত শুনে তিনি বললেন, কাল বিলম্ব না করে এখনই আপনার পক্ষে পবিত্র মদিনা রওনা হয়ে যাওয়া প্রয়োজন। আর স্বপ্নের বিবরণ কারও কাছে প্রকাশ করবেন না। মনে হয় নবী পাক (স.) আপনাকে পবিত্র মদিনায় ডাকলেন। সেখানে বোধ হয় কোন মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে। পথে কোথাও বিশ্রাম না নিয়ে দিন-রাত একটানা সফর করে ষোল দিন পর তিনি পবিত্র মদিনা এসে পৌঁছলেন। পবিত্র মদিনার উপকন্ঠে পৌঁছে সুলতান গোসল করলেন এবং নিতান্ত বিনয়ের সাথে রওযা পাকে হাজিরা দিলেন। রিয়াযুল জান্নাতে নামাজ পড়ে গভীর ধ্যানমগ্ন অবস্থায় সেখানে বসে রইলেন।
অন্যদিকে উজির ঘোষণা করে দিলেন, হঠাৎ করেই সুলতান রওজা পাক যেয়ারত করতে পবিত্র মদিনায় এসেছেন। তিনি পবিত্র মদিনার সকল অধিবাসীকে সাক্ষাতদান করে তাদের মধ্যে কিছু উপহার সামগ্রী বিতরণ করতে চান। এতদসঙ্গে মসজিদে নববী প্রাঙ্গণে একটি দাওয়াতের ব্যবস্থা করা হল। পবিত্র মদিনার সকল অধিবাসীর প্রতিই নির্দেশ জারি করা হল, সবাই যেন অবশ্যই সুলতানের দাওয়াতে এসে শরীক হন। সুলতানের নির্দেশে পবিত্র মদিনার সকল অধিবাসীই দাওয়াতে হাজির হলেন। সকলের সাথে সুলতান ব্যক্তিগতভাবে হাত মিলালেন। কিন্তু যে দু’টি চেহারা তাঁর অনুসন্ধিৎসু দু’চোখ তালাশ করছিল সে দু’টি চেহারার সাক্ষাৎ তিনি পেলেন না। সুলতান জানতে চাইলেন এমন কেউ কি রয়ে গেছেন যিনি দাওয়াতে হাজির হননি বা সুলতানের উপহার গ্রহণ করতে আসেন নি।
পবিত্র মদিনাবাসীগণ বলল, না এমন কেউ নেই, যিনি এখানে হাজির হননি। তবে দু’জন পশ্চিমা দেশীয় দরবেশ রয়েছে, যারা দিন-রাত ইবাদত বন্দেগিতে মশগুল থাকেন। কোথাও যান না। কারও কাছ থেকে কিছু গ্রহণ করেন না; বরং পবিত্র মদিনায় অভাবীগণকে দান-খয়রাত করেন। দুনিয়ার কোন কিছুর সাথেই তাদের কোন সম্পর্ক নেই। এ কারণেই ওনারা এখানেও হাজির হননি। বিবরণ শোনার সাথে সাথে সুলতানের চেহারা বিবর্ণ হয়ে উঠল। নির্দেশ দিলেন: সে দু’ব্যক্তিকে এখানে হাজির কর। কেউ কেউ সুপারিশের সুরে বলতে লাগলেন: হুজুর এদের মত ভাল মানুষ আর হয় না। সংসার ত্যাগী এরূপ দরবেশ লোককে এভাবে ডেকে আনা কি ঠিক হবে? কিন্তু সুলতানের কঠোর নির্দেশ। তাই অগত্যা পশ্চিমা দেশীয় সেই দু’ব্যক্তিকেও ডেকে আনা হল। এদের চেহারার প্রতি দৃষ্টিপাত করার সাথে সাথেই সুলতানের দু’চক্ষু স্থির হয়ে গেল। এই ত সেই দুই দুরাত্না।
নবী পাক (স.) স্বপ্নে যাদেরকে পবিত্র হাতের ইশরায় দেখিয়েছিলেন। সুলতান জিজ্ঞেস করলেন: তোমরা কে? কোন দেশের অধিবাসী? এখানে তোমরা কি কর? ওরা জবাব দিল, আমরা পাশ্চাত্যের অধিবাসী। হজ্ব পালন করতে পবিত্র মক্কায় এসেছিলাম। হজ্ব সমাপন করার পর পবিত্র মদিনা যেয়ারতে এসেছি। এখানে পবিত্র রওযার আকর্ষণে রয়ে গেছি। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত রওযা পাকের ছায়াতেই পড়ে থাকতে চাই।
সুলতান ওদের বাসস্থান সম্পর্ক জিজ্ঞেস করে জানতে পারলেন, রওযাপাকের পাশেই একটি মুসাফিরখানার নিরিবিলি একটা কক্ষে ওরা থাকে। সুলতান নিজে গিয়ে ওদের বাসস্থান তল্লাশি শুরু করলেন। কিন্তু সেখানে নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু মামুলি আসবাবপত্র এবং কয়েকখানা কিতাব ছাড়া সন্দেহ করার মত কিছুই পাওয়া গেল না। সুলতান দারুণ দুশ্চিন্তায় পড়লেন। অন্যদিকে পবিত্র মদিনাবাসীগণ এসে সুলতানের নিকট এ দু’বিদেশির পক্ষে সুপারিশ করতে লাগলেন। তারা বললেন: এরা এত ভাল যে, এরূপ লোক পবিত্র মদিনায় নগণ্য। লোকজনের কথাবার্তা শুনে সুলতানের উদ্বেগ উৎকণ্ঠার আর শেষ রইল না। তাঁর সর্ব শরীর ঘর্মাক্ত হয়ে গেল। ভাবতে লাগলেন, তবে তিনি যে স্বপ্নে দেখেছেন সেটির অর্থ কি?
এমনি দুশ্চিন্তার মধ্যেই সুলতানের চোখ পড়ল ঘরের এক কোণে বিছানো একটি চাটাই এর উপর। যার উপর একটি নামাজের মুসাল্লা সুন্দরভাবে বিছানো আছে। সুলতান অগ্রসর হয়ে নিজ হাতেই চাটাইটা সরিয়ে ফেললেন। দেখলেন, চাটাই এর নিচে একটি বড় ধরনের মসৃণ পাথর বসানো। পাথরটি সরানোর পর দেখা গেল একটি গভীর সুড়ঙ্গ। পরীক্ষা করে দেখা গেল সুনিপুণভাবে খননকৃত সুড়ঙ্গটির শেষ মাথা রওযাপাকের কবর শরীফের নিকট পর্যন্ত চলে গেছে। সুলতান এবার ঠিকমত পাকড়াও করলেন। অনেক প্রকার চাপ প্রয়োগের ফলে তারা মুখ খুলতে বাধ্য হয়।
এ দু’ব্যক্তি ইউরোপীয় এলাকার অধিবাসী। জাতিতে খ্রিস্টান। ওরা বলল,ওদের দেশের খ্রিস্টান রাজন্যবর্গ এ মর্মে একটা পরিকল্পনা গ্রহণ করে যে,যে কোন উপায়ে রওযা শরীফ থেকে নবী পাক (স.) এর শরীর মুবারক অপহরণ করে নিয়ে আনতে হবে। অগত্যা তা সম্ভব না হলে রওযা শরীফের ভিতরেই শরীর মুবারক বিনষ্ট করে ফেলতে হবে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার জন্য বিপুল ধন সম্পদ দিয়ে দু’জনকে পাঠানো হয়েছে। ওরা ওখানে প্রথমে নিজেদেরকে নিষ্ঠাবান মুসলমান এবং উদার দানশীল ব্যক্তিরূপে পরিচিতি লাভ করেছে। এরপর পরিকল্পনা মতে সুড়ঙ্গ খনন শুরু করে। গভীর রাতে একটু একটু করে ওরা খনন করত, খননকৃত মাটি চামড়ার মশকের মধ্যে ভরে রাতারাতিই দূরে নিয়ে ফেলে দিত। এভাবে খনন করতে করতে রওযা শরীফের অভ্যন্তরস্থ দেওয়াল পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু এরই মধ্যে সুলতান এসে উপস্থিত হয়েছেন। ওদের জবানবন্দী শুনে সুলতানের মাথায় যেন আগুন ধরে গেল। সাথে সাথে এই দু’ষড়যন্ত্রকারী দুর্বৃত্তকে বন্দি করলেন। পরদিন প্রকাশ্যে এদের মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। ওদের অপবিত্র লাশ আগুন দিয়ে পুড়ে ফেলা হয়।
এরপর সুলতান রওযা শরীফের নিরাপত্তা ও মসজিদে নববী পুন: নির্মাণের বিরাট পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেন।
বস্তুতঃ শত বছরের আগ পর্যন্ত দীর্ঘ সময় পবিত্র মদিনা ছিল ছোট কলবরে শহর। ছিল ঐ অনুপাতে চারদিকে দেওয়ালব্যষ্টিত দুর্গ। হয়ত জান্নাতুল বাকি দেওয়ালের বাহিরে থাকতে পারে।
গত শত বছরে সেকালের খেজুর গাছের ভিমের সহায়তায় ৩/৪ তলা মাটির ঘরের স্থলে ৮/১০ তলা বিশিষ্ট পাকা দালান নির্মিত হলেও সেকালের ৩/৪ তলা বিশিষ্ট মাটির ঘর রয়েছিল।
১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দের আগে যারা যেয়ারতের উদ্দেশ্য পবিত্র মদিনা মুনাওয়ারা গমন করেছেন তারা এসব মাটির ঘরে থেকেছেন বা দেখেছেন। আমিরুল মোমেনীন হযরত আবু বকর (র.) ও হযরত ওমর (র.)’র উত্তর দিকের খেলাফত স্থানকে ভিতরে রেখে তুর্কি সুলতানরা রওজাপাক (স.) সহ মসজিদে নববীকে উত্তর দিকে সম্প্রসারণ করেছিলেন।
১৯৪০/৫০ এর দশকে বাদশাহ আবদুল আজিজ দক্ষিণের রওজাপাকসহ মূল মসজিদে নববীকে অক্ষত রেখে উত্তর দিকের সম্প্রসারিত অংশকে পুনঃ নির্মাণ করেন। ইস্তাম্বুলের তোপকাপি জাদুঘরে রক্ষিত তুর্কি সুলতানগণের মসজিদে নববীর মডেল দেখে তা অনায়াসে বুঝা যাচ্ছিল।
মসজিদে নববীর এ অংশের চতুর্দিকে ১৫/২০ ফুট প্রস্থের রাস্তা ছিল। ছোট ছোট গাড়ি চলাচল করত। রওজাপাকের দক্ষিণ দিকে মাত্র ১৫/২০ ফুট ব্যবধানে বহু মাটির ঘর ছিল। আরবীয়গণের পাশাপাশি যেয়ারতকারীগণও থাকত । এ সময় যেয়ারতের পাশাপাশি ৫০/৬০ হাজার নর-নারী নামাজ পড়ার মত ব্যবস্থা ছিল। ফলে হজ্বের সময় যেয়ারতের পাশাপাশি নামাজ পড়তে গিয়ে হজ্বযাত্রীগণ নানাবিধ প্রতিকূলতার সম্মুখীন হচ্ছিল। অর্থাৎ ওযু টয়লেট সীমাবদ্ধতাসহ রাস্তায়, দোকানে, বারান্দায়, দালানের দু’তলা তিন তলায় ওয়াক্তে ওয়াক্তে নামাজ পড়তে হচ্ছিল।
এমনি পরিস্থিতিতে মহান শাসক বাদশাহ ফাহাদ মসজিদে নববীর চতুর্দিকের মাটির ঘর, পাকা-দালান, ভেঙে ধুুলিসাৎ করে দেয়া হয়। মসজিদে নববী শরীফকে পূর্ব-পশ্চিম ও উত্তর দিকে বিশালভাবে সম্প্রসারণ করা হয়। যা বিশ্বের বুকে দৃষ্টিনন্দন ইমারত। যেখানে মাত্র ৫০/৬০ হাজার নর-নারী নামাজ পড়তে কষ্ট হত, সে স্থলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা,হাত বাড়ালে জমজমের পানি পাওয়া সমেত ৭/৮ লক্ষ নর-নারী যেয়ারতের পাশাপাশি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজসহ অতি আরামে এবাদাত বন্দেগি করতে পারছেন।
লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক ও কলাম লেখক

x