হালিশহরের হযরত হাফেজ মুনির উদ্দিন (রহ.)
চট্টগ্রাম মহানগরীর হালিশহরে শায়িত আছেন মহান অলিয়ে কামেল, সুফি–দরবেশ এবং আজমগড়ী হযরতের অন্যতম খলিফা হযরত আলহাজ্ব শাহ হাফেজ মুনির উদ্দিন নূরুল্লাহ (রহ.)। ১৯৫০–এর দশকে যখন তিনি ইন্তেকাল করেন, তখন চট্টগ্রাম মহানগরী আকারে বেশ ছোট ছিল। হালিশহর এলাকাটি ছিল সম্পূর্ণ গ্রামাঞ্চল। শৈশবে তিনি অত্যন্ত কষ্ট স্বীকার করে নিজের বাড়ি থেকে হেঁটে কদম মোবারক আসতেন কোরআন হেফজ করার জন্য। তাঁর বড় ভাই হযরত মাওলানা জমির উদ্দিন ছিলেন একজন ওয়ায়েজ (ধর্মীয় বক্তা)। সে আমলে সাগরপথে চট্টগ্রামের সঙ্গে আকিয়াব ও ইয়াঙ্গুনের নিয়মিত যাতায়াত ব্যবস্থা ছিল। বাণিজ্যিক সুবিধার কারণে চট্টগ্রামের মানুষের সঙ্গে আরাকান ও মায়ানমারের (তৎকালীন বার্মা) ব্যাপক ব্যবসায়িক যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল, যার সুবাদে হযরত হাফেজ ছাহেবের বড় ভাই হযরত মাওলানা জমির উদ্দিন প্রায়ই জাহাজে করে সেসব অঞ্চলে যাতায়াত করতেন।
অন্যদিকে, আজমগড়ী হযরতের পিতা, জমিদার সুফি–দরবেশ হযরত শেখ করিম বকশ (রহ.) ব্রিটিশ ভারতের জরিপ বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন। সরকারি কাজের সূত্রে তিনি প্রায়ই চট্টগ্রাম হয়ে আরাকানে যাতায়াত করতেন। ব্রিটিশ আমলে অবিভক্ত বাংলার পশ্চিমাঞ্চলে হুগলি নদীর তীরে কলকাতা এবং পূর্বাঞ্চলে কর্ণফুলী নদীর তীরে চট্টগ্রাম ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বন্দর শহর। সুফি মিয়া করিম বক্স (রহ.) চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আরাকান যাওয়া–আসার পথে চট্টগ্রামের বিখ্যাত আলেম মাওলানা জমির উদ্দিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। এই পরিচয়ের সূত্রে আজমগড়ী হযরতের পিতা চট্টগ্রাম এলে হালিশহরে হযরত হাফেজ ছাহেবের বড় ভাই মাওলানা জমির উদ্দিনের বাড়িতে অবস্থান করতেন। পরবর্তীতে আজমগড়ী হযরত প্রখ্যাত হাফেজ ও সুফি ব্যক্তিত্ব হিসেবে চট্টগ্রাম হয়ে আরাকান যাতায়াত করতেন। তিনিও পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে যাতায়াতের পথে হালিশহরের এই বাড়িতেই যাত্রাবিরতি নিতেন। ফলে শিশু বয়স থেকেই হালিশহরের হাফেজ ছাহেব হুজুর আজমগড়ী হযরতের সোহবত (সান্নিধ্য) লাভ করার সুযোগ পান, তাঁর কাছে তরিকতে দাখিল হন এবং খুব কম বয়সেই খেলাফত লাভ করেন।
দূর–দূরান্ত থেকে আসা তরিকতের মেহমানদের থাকার সুবিধার্থে হাফেজ ছাহেব হুজুর ১৯৪৫ সালে ‘তাবলীগ মঞ্জিল‘ নির্মাণ করেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় যখন সমগ্র ভারত ও পাকিস্তানে রাজনৈতিক পরিস্থিতি চরম উত্তপ্ত, তখনো তিনি তাঁর পবিত্র হজ সফর স্থগিত করেননি। এই প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেই তিনি বাড়ি থেকে বের হয়ে চট্টগ্রাম থেকে প্রথমে কলকাতা যান এবং সেখান থেকে ট্রেনে করে মুম্বাই পৌঁছান। অতঃপর মুম্বাই থেকে সমুদ্রপথে হজের উদ্দেশ্যে রওনা হন। তৎকালীন বাংলার প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন হাফেজ ছাহেব হুজুরের এই সফরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন।
বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে যাতায়াত ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্গম হওয়া সত্ত্বেও তিনি তরিকতের সফরকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতেন। এসব সফরে তৎকালীন সময়ের বড় বড় আলেম ও হাফেজগণ তাঁর সঙ্গী হতেন। তাঁর হাত ধরে অসংখ্য পথভ্রষ্ট ও পাপী মানুষ অপকর্ম ত্যাগ করে খাঁটি অন্তরে তওবা করে তরিকতের পথে ফিরে এসেছিলেন। হযরত হাফেজ মুনির উদ্দিন (রহ.) যৌবনকাল থেকেই নিজেকে কঠোর ইবাদত–বন্দেগিতে নিয়োজিত রেখেছিলেন এবং প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা আধ্যাত্মিক সাধনা বা মোরাকাবা করতেন।
তিনি নসিহত (উপদেশ) দেওয়ার সময় আক্ষেপ করে প্রায়ই বলতেন, ভবিষ্যতে মানুষের ইবাদত শুধু নামমাত্র বা লোক দেখানো হয়ে যাবে, অন্তরে সেই ইবাদতের আসল প্রভাব ও আমল থাকবে না। তিনি নিজে অত্যন্ত সাদাসিধে জীবনযাপন করতেন। বিলাসিতা ও জাঁকজমকপূর্ণ জীবনকে অপছন্দ করতেন। নারীদের পর্দার ব্যাপারে তিনি অত্যন্ত কঠোর ছিলেন; সামান্যতম বেপর্দা তিনি সহ্য করতেন না। হযরত হাফেজ ছাহেব (রহ.)-এর তরিকা গ্রহণ করার পর কেউ যেন তাঁর দৈনন্দিন ‘অজিফা‘ (নির্দিষ্ট জিকির ও দোয়া) পড়া ছেড়ে না দেয়, সে ব্যাপারে তিনি মুরিদদের সবসময় বিশেষভাবে সতর্ক করতেন।
এই মহান সুফি–দরবেশ ও সুলতানুল আউলিয়া হযরত শাহ হাফেজ মুনির উদ্দিন (রহ.) ৬ রবিউল আউয়াল, ৩ নভেম্বর ১৯৫৪ সালে ইন্তেকাল করেন।
তাঁর মহান পীর আজমগড়ী হযরত ১৯৪৩ এর দুর্ভিক্ষ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং ভারত–পাকিস্তান তথা উপমহাদেশ ভাগ নানাবিধ প্রতিকূলতায় ১৯৩৯ এর পর থেকে এতদাঞ্চলে আসতে পারেননি। হযরত হাফেজ ছাহেব (রহ.)’র ইন্তেকালের কয়েক মাস পর আজমগড়ী হযরত তরিকতের অতীব গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনে পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশে পৌঁছেন। তিনি ঢাকা থেকে ট্রেনে চট্টগ্রাম আসেন। ট্রেন স্টেশন থেকে কারযোগে হালিশহর হাফেজ ছাহেব হুজুরের বাড়িতে তশরীফ নেন। আজমগড়ী হযরত হালিশহর অবস্থানকালে লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়।
হাফেজ ছাহেব হুজুরের ছাহবেজাদা ছাবের ছাহেব বলেন, আজমগড়ী হযরত তথায় হালিশহর অবস্থানকালে তিনি সার্বক্ষণিক আজমগড়ী হযরতের সাথে সাথে থাকতেন। তাঁর বড় ভাই কাজী ছাহেব দূরে দূরে থাকতেন। ডাকলে আসতেন, আবার চলে যেতেন। কুতুবদিয়ার মালেক ছাহেব কয়েকজন সাথী নিয়ে হাফেজ ছাহেব হুজুরের বাড়ীর নিকটে অবস্থান নেন। ছাবের ছাহেব দুঃখ করে বলেন, গারাংগিয়ার বড় হুজুর তথা আমার হযরত পীর ছাহেব কেবলা (তখনকার সুপারিনটেনডেন্ট হুজুর) আজমগড়ী হযরতের সান্নিধ্য পেতে এখানে থেকে গিয়েছিলেন। আমি তাকে যথাযথ সম্মান আতিথেয়তা দেখাতে পারেনি বলে আমাকে দুঃখ প্রকাশ করেন। আজমগড়ী হযরত হালিশহর থেকে চাক্তাই হয়ে লঞ্চে কাপ্তাই যান। এক রাত অবস্থান করেন। কাপ্তাইতে রয়েছে আজমগড়ী হযরত পরবর্তীতে সাঈদ খান (রহ.)’র খানকাহ। আমারও এই খানকায় গমন করার সুযোগ হয়। কাপ্তাই বাঁধ ঠিকতেছে না বলে ঠিকাদারের আগ্রহে যান। পরদিন কাপ্তাই থেকে ফিরে এসে চন্দনপুরা প্রখ্যাত জমিদার পরবর্তীতে এমএনএ এয়ার আলী খানের জমিদার বাড়ীতে অবস্থান নেন। এখানে চট্টগ্রাম অঞ্চলের কয়েকজনকে খেলাফত দানে ভূষিত করেন। তৎমধ্যে গারাংগিয়া হযরত ছোট হুজুর কেবলা অন্যতম।
১৯৫৩ সালে হযরত সাঈদ খান (রহ.)’র মাধ্যমে আজমগড়ী হযরত একটি তালিমাত বের করেন। ঐ তালিমাতে আজমগড়ী হযরতের ঐ সময়কার খলিফাগণের তালিকা রয়েছে। ফলে অনেকে ভুলক্রমে আজমগড়ী হযরতের খলিফাগণের সংখ্যা বলতে বা লিখতে ভুল করে বসে। আজমগড়ী হযরতের ইন্তেকাল অবধি তাঁর খলিফার সংখ্যা হল ৪৪ জন। যে কেউ সঠিক যাচাই–বাছাই না করে না লিখা চাই।
১৯৬০–এর দশকে ছাত্রজীবনে, হযরত হাফেজ ছাহেব হুজুর ও হযরত কাজী ছাহেবের মুরিদদের বিশেষ আগ্রহে আমার প্রথম হালিশহরে যাওয়ার সুযোগ হয়। তখন চট্টগ্রাম বন্দরের পাশ দিয়ে এয়ারপোর্টের রাস্তা ধরে ‘ইসন্যা হাট‘ হয়ে হালিশহরে যেতে হতো। সে সময়ে হালিশহর ছিল সম্পূর্ণ গ্রামের পরিবেশ। হাফেজ ছাহেব হুজুরের বড় ছাহেবজাদা কাজী সিরাজুল মোস্তফা ছাহেবের সঙ্গে আমার বহুবার সাক্ষাৎ হয়েছিল। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে ছোট ছাহেবজাদা ছাবের ছাহেবের সঙ্গে প্রথম দিকে মোলাকাত হয়নি। পরবর্তীতে হালিশহর সিলসিলার মুরিদদের কাছ থেকে কাজী ছাহেবের ইন্তেকালের খবর পেয়ে আমি তাঁর জানাজায় অংশ নিতে যাই। বিস্তীর্ণ এক শুকনো ধানের জমিতে সেই বিশাল জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সম্ভবত এরপর থেকেই ছোট ছাহেবজাদা ছাবের ছাহেবের সঙ্গে আমার নিয়মিত মোলাকাত ও সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। তিনি আমাকে অত্যন্ত আপন করে নিয়েছিলেন এবং তাঁর মহান পিতার জীবন ও সাধনা সম্পর্কে নানাবিধ মূল্যবান তথ্য ও স্মৃতিকথা শোনাতেন।
তাঁর দালানের দোতলার বৈঠকখানায় বসে বহুবার আমি তাঁর আতিথেয়তা গ্রহণ করেছি। পরম আগ্রহে তাঁর দেওয়া তথ্যগুলো শুনতাম। পরবর্তীতে তাঁর ইন্তেকালে জানাজায় শরিক হওয়ার সুযোগও আমার হয়েছিল। হয়তো তিনি আগে থেকেই অনুমান করতে পেরেছিলেন যে, তাঁর মহান পিতাকে নিয়ে ভবিষ্যতে আমি লেখালেখি করব। তিনি ছিলেন আমার লেখার একজন অত্যন্ত গুণী পাঠক। তাঁর আব্বাজানের যেয়ারতে গেলে প্রথম সাক্ষাতেই চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় হেসে বলতেন– “অনে ইত্তিকিন খথা হডে পন?” অর্থাৎ, “আপনি এত তথ্য কোথা থেকে পান?”
হযরত হাফেজ ছাহেব (রহ.)’র ওফাত বার্ষিকীতে মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা, তিনি যেন এই মহান অলিকে পরকালে জান্নাতুল ফেরদাউসের সর্বোচ্চ মাকাম দান করেন। আমিন! লেখক : কলামিস্ট, প্রাবন্ধিক, গবেষক।












