তরিকত তথা তাসাউফ সুফি দরবেশ ইসলাম ধর্মের অঙ্গ হিসেবে মনে করা হয়ে থাকে। কামালিয়ত হাসিলের জন্য তথা অলৌকিক আধ্যাত্মিক জগতে বিচরণের জন্য অন্যতম সোপান। চার মাজহাবের মধ্যে হাম্বলী মাজহাবে তরিকত জগত নিয়ে রয়েছে অনেকটা মত পার্থক্য। কিন্তু আমাদের হানাফী মাজহাব সাথে শাফী ও মালেকী মাজহাবে তরিকত অতীব গুরুত্ব বহন করে।
বিশ্বকে নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন তুর্কি সুলতানেরা। তারা তরিকত প্রেমিক। আল্লামা জালাল উদ্দিন রুমি সাথে হযরত ইয়াহিয়া আফেন্দীর হয়ত প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে তুর্কি সালাতানাত তরিকত তাসাউফের প্রতি আসক্ত ছিলেন। একমাত্র তুর্কি সুলতানগণই বিশ্বকে নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন। বাকী ওমাইয়া, আব্বাসী, ফাতেমীরা অনেকটা অঞ্চল ভিত্তিক শাসক।
যেমন–সুলতানী শাসন, মোঘল শাসন ভারতবর্ষ কেন্দ্রিক। ইস্তাম্বুলে বসে তুর্কি সুলতানগণ আরব রাষ্ট্রসমূহসহ ইউরোপের অর্ধেকাংশ শাসন করে গেছেন। বিশ্বে নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন। তুর্কি সুলতানগণের পৃষ্টপোষকতায় বিশ্বব্যাপী তরিকত বিকশিত হয়। আজও ইউরোপ আমেরিকাসহ উন্নত বিশ্বে যারা তরিকতে আছেন তারা তুর্কি সুলতানগণের পৃষ্ঠপোষকতা হিসেবে মনে করা স্বাভাবিক।
ইসলামের প্রারম্ভ থেকে ইসলাম ধর্ম তথা শরীয়তের পাশাপাশি তরিকতও বিকশিত হতে থাকে। যেমন ইরানে শায়িত হযরত বায়েজিদ বোস্তামীর আধ্যাত্মিক পীর হচ্ছেন হযরত ইমাম জাফর সাদেক (র.)।
তরিকত তথা তাসাউফের উৎপত্তি নিয়ে একেক জনের একেক মত রয়েছে। একাধিক মতে হযরত আলী (ক.) থেকে উৎপত্তি বলে মনে করা হয়ে থাকে। ইমাম জাফর সাদেক থেকে উৎপত্তি বলে ব্যাপক মত রয়েছে।
সেকালে তরিকত তাসাউফ করতে গিয়ে ঘর–বাড়ি ছেড়ে মহান আল্লাহপাকের ধ্যানে নিজেকে নিজে উৎসর্গ করার ঘটনার ব্যাপকতা রয়েছে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী তরিকত তাসাউফে ব্যাপক প্রচার প্রসার ছিল। এর আগ পর্যন্ত মানবের দুনিয়া ভোগের তেমন চাহিদাও ছিল না।অপরদিকে তার্কি সালতানাতের ছিল বিশ্বব্যাপী পৃষ্ঠপোষকতা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্কের পরাজয় ঘটে। ফ্রান্স ব্রিটেন আরব রাষ্ট্রসমূহে ভাগ বাটোয়ারা বসায়। অবশ্য তারও আগে থেকে তুরস্কের দুর্বল শাসনের কারণে আরব রাষ্ট্রসমূহে ব্রিটেন সাথে ফ্রান্স প্রভাব বিস্তার করে আসছিল। যেমনটা–জজিরাতুল আরব তথা আরব উপদ্বীপ অন্যতম। ঐ সময় সউদ বংশের উত্থান ঘটে। তাদেরই নিকটাত্মীয় ও ধর্মীয় মুরব্বি মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহাব নজদীর আকিদা বিশ্বাসের ব্যাপক উত্থান ঘটে। তাদেরকে আহলে হাদীস তথা সালাফী মতাদর্শে বিশ্বাসী বলা হয়। আহলে হাদীস আর হাম্বলী মাজহাব এক বা অভিন্ন অথবা নিকটতম অবস্থানে বলা যায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর আরব রাষ্ট্রসমূহ থেকে তুরস্ক বিধায় নেয়। জজিরাতুল আরবে ৭টি রাষ্ট্রের উত্থান ঘটে। যথা–সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, বাহারাইন, আরব আমিরাত, ওমান, ইয়েমেন। অপরদিকে মূলকে শাম তৎ পার্শ্ববর্তী অঞ্চল ফিলিস্তিন, লেবানন, সিরিয়া, জর্ডান, ইরাক অঞ্চলে ব্রিটিশ ফ্রান্সের আধিপাত্য বিস্তার হয়। তেমনিভাবে মিশর সুদান লিবিয়া অঞ্চলেও। এসব বিশাল আরব রাষ্ট্রসমূহে আহলে হাদীস মতাদর্শ দ্রুততার সাথে প্রসার লাভ করে। সাথে শিয়া মতাদর্শ। তরিকত তাসাউফ ম্লান হতে থাকে।
পূর্ব ইউরোপে তুরস্কের ব্যাপক প্রভাব ছিল। যেমন–বুলগেরিয়া, যুগোস্লাভিয়া, সাথে সাথে দক্ষিণ রাশিয়া দাগেস্তান চেচনিয়া এসব অঞ্চলে তুরস্কের মাধ্যমে ইসলাম ব্যাপক বিকশিত হয়। সাথে সাথে বিকশিত তরিকত তাসাউফ। কিন্তু আরব রাষ্ট্রসমূহে আহলে হাদীস ব্যাপকতা লাভ করায় তার প্রভাবে বিশ্বব্যাপী প্রভাবিত বলা যাবে। অর্থাৎ তাবেয়ীগণের যুগ থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত তরিকত তাসাউফের বিশ্বব্যাপী যে ব্যাপকতা ছিল তা পর্যায়ক্রমে ম্লান হয়ে আসছে। সৌদি আরবের অভ্যন্তরে হেজাজ। হেজাজের প্রাণকেন্দ্র পবিত্র মক্কা ও পবিত্র মদিনা। যা ১৯২৪ সাল থেকে আহলে হাদীস মতাদর্শ ধারণকারী সৌদি আরবের নিয়ন্ত্রণে। যদিওবা বাদশাহ আবদুল আজিজ আরও ৮ বছর সময় নিয়ে বিশাল অঞ্চলকে সুসংগঠিত করে ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর রাজতন্ত্র ঘোষণা করে নিজেকে বাদশাহ ঘোষণা করেন। পবিত্র মক্কা ও পবিত্র মদিনা আহলে হাদীস মতাদর্শে বাদশাহ আবদুল আজিজ পরিবার সাথে সাথে ধর্মীয় গোষ্ঠী ও নিকট আত্মীয় মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহাব নজদীর মতাদর্শ একাত্ম হয়ে ধর্মীয় শিক্ষা দীক্ষা মতাদর্শ সৌদি আরবের অভ্যন্তরের পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী বিকশিত করাতে থাকে। এর প্রভাব বিশ্বের সর্বত্র বিকশিত হয়ে আসছে। যার অন্যতম প্রভাব এসে পড়ছে তরিকত তথা তাসাউফ জগতের উপর। সাথে সাথে মাজহাব ত আছেই।
তার বিপরীত দিকে বিশ্বে বিগত ২ শত বছর থেকে বিজ্ঞান প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হয়ে বিকশিত হয়ে আসছে। গত শতকে তা দ্রুততার সাথে বাড়তে থাকে।
গত মাত্র কয়েক দশকে বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্বে ব্যাপকতা লাভ করে। তার বিরূপ প্রভাব এসে পড়ে তরিকত তাসাউফের উপর। আগেকার আমলে তরিকত তাসাউফ ছিল অনেকটা দুনিয়া বিমুখ। বর্তমানকালে তা সম্পূর্ণ বিপরীত। বিজ্ঞান প্রযুক্তির মাধ্যমে জীবনযাত্রার উপর প্রভাব ফেলে। ফলে যারা তাসাউফ তরিকত করে তারাও তো মানুষ। মানুষ মনুষ্যত্বের উর্ধ্বে নয়। এতে তরিকত জগৎ আর দুনিয়ার চাহিদা একাকার হয়ে যায়। ফলে সাধারণ জনগণের কাছে তরিকত তাসাউফের উপর তাচ্ছিল্য বিরূপ ধারণায় প্রভাবিত হতে থাকে। তা শুধু ভারতবর্ষে নয় অনেকটা বিশ্বব্যাপী বলা যাবে। তবে কেন জানি বর্তমান ৭ লাখ ৮৩ হাজার বর্গকি.মি এর দেশ তুরস্ক তরিকত তাসাউফ অনেকটা বুকে ধারণ করে রয়েছে। ইউরোপ আমেরিকা উন্নত বিশ্বে তরিকত তাসাউফ অনেকটা সংকোচিত। এখানকার ধর্মীয় জগতে আরবের শেখদের ব্যাপক প্রভাব পড়ছে।
তরিকত তাসাউফের জন্য যেমিন রয়েছে খানকাহ তেমনি মসজিদের ভূমিকাও কম নয়। ফলে আরবের ধনীদের অর্থায়নে মসজিদ কেন্দ্রীক ইউরোপ আমেরিকা অস্ট্রেলিয়া জাপান তথা উন্নত বিশ্বে আহলে হাদীস ব্যাপকতা লাভ করে। তরিকত সাথে সাথে মাজহাব সংকোচিত হয়ে আসছে।
আফগানিস্তান থেকে মায়ানমার পর্যন্ত এই বিশাল ভারতবর্ষে ৭০/৮০ কোটি মুসলমানের বাস। অনেকটা এক তৃতীয়াংশ মানুষের বাস বলা যাবে। এই ভারতবর্ষ যেমনি হানাফী মাজহাবের প্রাণকেন্দ্র তেমনি তরিকত তাসাউফেরও অন্যতম জংশন বলা যাবে। যেহেতু এখানকার প্রায় সকল মতাদর্শ হানাফী মাজহাবের পাশাপাশি তরিকত তাসাউফের অনুসারী অথবা সমর্থক বলা যায়। ভারতবর্ষে ইসলাম ধর্ম সাথে তরিকত তাসাউফ প্রতিষ্ঠা করেন হযরত খাজা মঈন উদ্দিন চিশতি আজমিরী (রহ.)। অতঃপর বাদশাহ আকবর পরবর্তী বাদশাহ জাহাঙ্গীরের আমলে দ্বিনী–ই–ইলাহী নামে ইসলাম ধর্মকে ধ্বংস থেকে রক্ষা করেন ইমামে রব্বানী হযরত মুজাদ্দেদে আল ফেসানী। উভয়ে তরিকত তাসাউফের মহান ইমাম ছিলেন।
কিন্তু কয়েক দশকের ব্যবধানে এই বিশাল ভারতবর্ষে মাজহাব তরিকত তাসাউফের অবস্থান আগের মত আছে বলা যাবে না। আহলে হাদীস তথা সালাফী মতাদর্শ দ্রুততার সাথে প্রসার লাভ করছে। এর প্রতিফলনে সৌদি আরবের ধর্মীয় প্রভাবকে অস্বীকার করা যাবে না।
সৌদি আরবে পবিত্র মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়, পবিত্র মক্কা উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়সহ রিয়াদ, দাম্মাম এবং বড় বড় শহর গুলোতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে হাজার হাজার ছাত্র লেখাপড়া করছে। চলতি বছর বাংলাদেশ থেকে ৫ শত ছাত্রকে সৌদি অর্থায়নের বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়ার সুযোগ দিচ্ছে। তেমনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে হাজার হাজার ছাত্র বৃত্তি নিয়ে সৌদি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাচ্ছে। এই হাজার হাজার ছাত্র অনেকটা আহলে হাদীস মতাদর্শ নিয়ে বিশ্বকে প্রভাবিত করতে থাকবে। অপরদিকে, সৌদি আরবের বিশাল বিশাল তহবিল রয়েছে বিশ্ব শিরক বিদআত উচ্ছেদ করার নামে বাংলা উর্দু ইংরেজিসহ বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় কিতাবাদি ছাপিয়ে ফ্রি বিতরণ করার জন্য।
আমাদের ভারতবর্ষেও এসব কিতাবাদি পড়ে উঠতি বয়স্ক যুবকদের মন মানসিকতায় পরিবর্তন আসছে। অর্থাৎ মাজহাব সাথে সাথে তরিকত তাসাউফের উপর বিরূপ ধারণা আসছে এবং তা দ্রুততার সাথে বাড়ছে।
এতে আমাদেরও দুর্বলতা কম নয়। বিশাল ভারতবর্ষে তরিকত তাসাউফে শিরক বিদআত ব্যাপকতা লাভ করে। ইহাও মাজহাব তরিকত তাসাউফকে আঘাত করছে। করছে কলুষিত। তার বিপরীতে আহলে হাদীস তথা সালাফি মতাদর্শ দ্রুততার সাথে বাড়ছে।
অর্থাৎ আজকে থেকে ৫০/৬০ বছর আগে বা তারও আগে তরিকত তাসাউফে যে সুষ্ঠু সুন্দর অবস্থান ছিল তা পর্যায়ক্রমে নেমে আসতে আসতে এখন অনেকটা ক্লান্তিকাল বললে মনে হয় বাড়িয়ে বলা হবে না।
অপরদিকে আমাদের দেশে আহলে হাদীস মতাদর্শ আমাদের হানাফী মাজহাবের কিছু কিছু সুন্নত আমলকে বিদআত বলে আখ্যায়িত করছে। দীর্ঘ এক যুগ পার হয়ে গেলেও আজও কারও মুখ থেকে এর যথাযথ প্রতি উত্তর পাওয়া যাচ্ছে বলে মনে করি না। তরিকত তাসাউফের বর্তমানকালে এই অবস্থান আগামীতে না জানি কি অবস্থান এসে দাঁড়ায়।
লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক, কলামিস্ট।










