প্রবাহ

কাপ্তাই বাঁধের লাভ ক্ষতি ভাবতে হবে

আহমদুল ইসলাম চৌধুরী | বুধবার , ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ at ৬:২৭ পূর্বাহ্ণ

কাপ্তাই বাঁধ নির্মিত হয় আজ থেকে ৬৪ বছর আগে। নিজ বিবেচনায় সময়টা বেশি নয়। যেহেতু বিগত ১৫/২০ বছর বা তারও আগে থেকে সচেতন নাগরিকের কাছে আলোচনা পর্যালোচনা চলছে কাপ্তাই বাঁধ দেশের জন্য কতটুকু কল্যাণকর। অর্থাৎ কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ হয়ে ৩০/৩৫ বছর যেতে না যেতেই এই বাঁধের লাভক্ষতি নিয়ে প্রশ্ন আসছে।

কাপ্তাই বাঁধ নির্মিত হয়েছিল পানি বিদ্যুৎ উৎপাদন সাথে আরও ৬ টি উপকার চিন্তা করে। বাঁধের নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হয় ১৯৬১ সালে। এর দৈর্ঘ্য ৬৭০ মিটার, উচ্চতা ৪৫ মিটার। বাঁধের একপাশে ১৬ টি গেইট রয়েছে বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দেয়ার জন্য। বাঁধ নির্মিত হল উজানে হাজার হাজার একর ভূমি পানিতে তলিয়ে বিশাল কৃত্রিম লেক সৃষ্টি হল। এখান থেকে শত শত পরিবার উঠিয়ে নেয়া হল। সবকিছু দেশের কল্যাণ বিবেচনা করে। এতে পানি বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি আরও অতিরিক্ত ৬ টি সুফল বিবেচনায় আনা হয়েছিল। তৎমধ্যে ১. মৎস্য চাষ ও আহরণ

. দুর্গম এলাকায় নৌ চলাচলের সুযোগ।

. বন সম্পদ আহরণ পরিবহন

. পর্যটন শিল্পের বিকাশ সাধন

. কৃষি ও সেচ ব্যবস্থার সুযোগ সৃষ্টি করা।

. বৃহত্তর চট্টগ্রামে নিম্নাঞ্চল সমূহে বন্যা নিয়ন্ত্রণে রাখা।

উক্ত ৬টি বিষয় দেশের কল্যাণে অতিরিক্ত পাওনা বিবেচনায় আনা। মূল হল পানি বিদ্যুৎ উৎপাদন। এতে ১৯৬২ সালে মাত্র দু’টি ইউনিটে ৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। ১৯৮১ সালে ৫০ মেগাওয়াটের আরও একটি ইউনিট চালু করা হয়। ১৯৮৮ সালে প্রতিটি ৫০ মেগাওয়াট সম্পন্ন আরও দু’টি ইউনিট চালু করা হয়। এতে কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সর্বমোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা এসে দাঁড়ায় ২৩০ মেগাওয়াট।

সর্বমোট ২৩০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা থাকলেও বছরে তা চালু থাকে ২৩ মাস। বাকী ৮৯ মাস বিদ্যুৎ উৎপাদন ৫০১০০ মেগাওয়াটে নেমে আসে। অর্থাৎ কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎ উৎপাদন ২৩০ মেগাওয়াট হলেও বাস্তবতা নিরিখে উৎপাদন হয় ৫০১০০ মেগাওয়াট। দেশে দ্রুততার সাথে বিদ্যুৎ চাহিদা বেড়ে যায়। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ এর চাহিদা ১৬ হাজার থেকে ১৬ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। আর এই চাহিদা হয় গ্রীষ্মকালে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা ২৩ হাজার ৩৩৭ মেগাওয়াট সেখানে কাপ্তাই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন বাস্তবতা নিরিখে ৫০১০০ মেগাওয়াট।

অপরদিকে, কাপ্তাই বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এই বাঁধ নির্মাণের ফলে যে ৬টি অতিরিক্ত সুফল পাওয়ার কথা ছিল তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়।

. দুর্নীতির কারণে যথাযথভাবে মৎস্য পোনা অবমুক্ত করা হচ্ছে না সাথে সাথে নানান অব্যবস্থাপনার কারণে কাপ্তাই লেকে মৎস্যের অবস্থান খুবই নগণ্য বলা যেতে পারে।

. বর্ষাকালে ৩৪ মাস লেকের পানি পূর্ণ থাকায় নৌ চলাচল স্বাভাবিক থাকে মাত্র। বাকী ৮৯ মাস লেকের পানি ধারণাতীত কমে যাওয়ায় নৌ চলাচল তথা নৌপথে যাতায়াতে চরম বিঘ্ন ঘটে।

. বর্তমানকালে পাহাড় পর্বতে বন সম্পদ তেমন আছে বলা যাবে না। প্রাকৃতিকভাবে যা হয় তাও অনেকটা লুটপাটেই চলে। যেখানে ৮৯ মাস লেকে স্বাভাবিক পানি থাকে না সেখানে কাঠ আহরণ লেকের মাধ্যমে পরিবহনে প্রশ্ন আসছে না।

. বৎসরে ৮৯ মাস যথাযথ পানি না থাকায় পর্যটন শিল্পের বিকাশের আশা আছে বলে মনে হয় না।

. লেকে ৮৯ মাস যথাযথ পানি থাকে না। ফলে কৃষি ও সেচ ব্যবস্থায় এই লেক যথাযথ উপকারে আসছে না।

. কাপ্তাই বাঁধের দ্বারা সারা বছর প্রায় ১০/১১ মাস কর্ণফুলী নদীতে পানি প্রবাহ বন্ধ থাকে। এতে উজানে সাগরের লবণ পানি এসে যাওয়ায় চট্টগ্রাম ওয়াসা পানি শোধনাগার দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সাথে সাথে এই বাঁধের দ্বারা নিম্নাঞ্চলে কল্যাণের তেমন প্রশ্ন আসছে না।

অনেক সচেতন নাগরিক বারে বারে বলছেন কাপ্তাই বাঁধ ভেঙে দিলে দেশের জন্য কল্যাণকর হবে। তথা

. সারা বছর কর্ণফুলী নদীতে পানি প্রবাহ স্বাভাবিক থাকবে।

. পানি প্রবাহ স্বাভাবিক থাকলে ওয়াসা পানি শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।

. পানি প্রবাহ স্বাভাবিক থাকলে কর্ণফুলী নদীর গভীরতা স্বাভাবিকে এসে যাবে।

. পানি প্রবাহ স্বাভাবিক হলে চট্টগ্রাম বন্দর উপকৃত হবে।

. বাঁধ না থাকলে তথা উজানে লেক না থাকলে পানিতে তলিয়ে থাকা হাজার হাজার একর জমি উৎপাদনে চলে আসবে। যেহেতু আমাদের দেশের মাটি উর্বর।

. দেশে দ্বীপে উপদ্বীপে পাহাড়ে পর্বতে সড়ক নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। কাজেই লেক ব্যবহার করে নৌ চলাচলের তেমন প্রয়োজন আছে মনে করি না।

অতএব কাপ্তাই বাঁধ নিয়ে সরকারকে ভাবতে হবে যদি বাঁধ দেশের কল্যাণ না হয়ে অকল্যাণই বয়ে আনে তবে এই বাঁধ ভেঙে ফেলাই উত্তম হবে।

ব্রিটিশ সরকার এই বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছিল ১৯০৬ সালে। কিন্তু বাস্তবায়ন করেনি। পাকিস্তান সরকার ১৯৫১ সালে চূড়ান্তভাবে স্থান নির্ধারণসহ প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র এতে সহযোগিতা করে। ১৯৫৪/৫৫ সালে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হয়।

গত ১১ ফেব্রুয়ারি পুনঃ কাপ্তাই যাওয়া হয়। কাপ্তাই বাঁধ এলাকায় এসে পানির অবস্থান দেখে হতচকিত হই। যেহেতু পানির অবস্থান অনেক নিচে। বর্ষা আসতে আরও ৩/৪ মাস বাকী। এখন বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে একটি ইউনিটে মাত্র ৫০/৬০ মেগাওয়াট। আগামী ৩/৪ মাসে আরও কমে যাবে।

এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক যে, কাপ্তাই গমন করলে বাংলাদেশ আর্মির লজে রাত্রিযাপন করা হয়। কিন্তু তাদের লজের প্রত্যেক কক্ষে কাপল বেড। কাপ্তাইতে আর্মির দু’স্থানে দু’টি লজ রয়েছে। দু’টি লজের প্রত্যেক রুমে কাপল বেড। বাংলাদেশ আর্মির তথা সামরিক বাহিনীর রুচি বুঝে আসে না। এক বেডে দু’জন থাকতে পারবে শুধু স্বামীস্ত্রী। এক বেডে দু’জন মহিলা বা দু’জন পুরুষ থাকার ব্যাপারে ধর্মমতে নিরুৎসাহিত করা আছে। বাংলাদেশ আর্মির এই কাপল বেড সিস্টেম শুধু কাপ্তাইতে নয় বান্দরবানের নীলগীরি, রাঙ্গামাটিতে এবং সাজেকেও প্রত্যক্ষ করেছি। আর্মির উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বউ নিয়ে যাবে থাকবে এই জন্য করা হয়েছে কিনা!

বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের সারা দেশে ১৫/২০ টি মোটেল রয়েছে। অধিকাংশ কক্ষ টুইন সিট। প্রত্যেকটা জেলা সদরে সার্কিট হাউজ রয়েছে। ভি,ভি,আই,পি কক্ষ বাদে প্রায় প্রতি কক্ষ টুইন সিট। কাজেই বাংলাদেশ আর্মির প্রতি সুপারিশ থাকবে, একটি বা দু’টি কাপল বেড রেখে বাকী সব কক্ষ যাতে টুইন করা হয়।

লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক, কলামিস্ট

পূর্ববর্তী নিবন্ধমহান একুশে তাঁদের স্মরণ করতে হবে
পরবর্তী নিবন্ধরাঙ্গুনিয়ায় ছিনতাইয়ের শিকার সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা, গ্রেপ্তার ১