আশ্বিনী পূর্ণিমা বৌদ্ধবিশ্বে প্রবারণা পূর্ণিমা নামে পরিচিত। বৌদ্ধদের কাছে এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি ধর্মীয় ও নৈতিক উৎসব। প্রবারণা মানুষকে নিজের জীবন পর্যালোচনা করতে, নৈতিকতার চর্চা করতে এবং সুন্দর ও কল্যাণমুখী জীবন গঠনে অনুপ্রাণিত করে। বৌদ্ধধর্মে প্রবারণা পূর্ণিমার সঙ্গে তিন মাসের বর্ষাবাসের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত ভিক্ষুসংঘ সাধারণত একটি নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করে শীল, সমাধি, প্রজ্ঞা, ধ্যান ও ধর্মচর্চায় নিজেদের নিয়োজিত রাখেন। প্রাচীনকালে বর্ষাকালে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করা ছিল কষ্টসাধ্য। এ সময় চলাচলের ফলে উদ্ভিদ ও ক্ষুদ্র প্রাণীর অনিচ্ছাকৃত ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কাও থাকত। তাই ভগবান বুদ্ধ ভিক্ষুসংঘের জন্য বর্ষাকালে নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করে সাধনা ও বিনয় অনুশীলনের বিধান দেন। এই তিন মাসের সাধনাকাল বৌদ্ধ পরিভাষায় বর্ষাবাস নামে পরিচিত।
বুদ্ধের সময়কার একটি ঘটনার সঙ্গেও প্রবারণার ঐতিহ্য যুক্ত। বৌদ্ধ ঐতিহ্য অনুসারে, একদল ভিক্ষু বর্ষাবাসকালে পরস্পরের সঙ্গে কথা না বলে নীরবতা পালন করেছিলেন। তাঁদের ধারণা ছিল, কথা বললে অনর্থক বা অকুশল বাক্য উচ্চারিত হতে পারে এবং ধ্যান–সাধনায় বিঘ্ন ঘটতে পারে। বর্ষাবাস শেষে তাঁরা বুদ্ধের কাছে উপস্থিত হলে তিনি তাঁদের আচরণের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেন। শুধু নীরবতা পালনই সাধনার পূর্ণতা নয়; পারস্পরিক সৌহার্দ্য বজায় রাখা, ভুল হলে তা স্বীকার করা এবং সংশোধনের সুযোগ সৃষ্টি করাও ধর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই শিক্ষা প্রবারণার অন্তর্নিহিত তাৎপর্যকে আরও গভীর করেছে।
প্রবারণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো ভুল স্বীকার করার সাহস এবং ক্ষমা চাওয়ার মহত্ত্ব। মানুষমাত্রই ভুল করতে পারে। কিন্তু ভুল স্বীকার না করে অহংকারের আড়ালে তা লুকিয়ে রাখলে সত্য ও কল্যাণের পথ থেকে মানুষ ক্রমশ দূরে সরে যায়। নিজের ভুল স্বীকার করা দুর্বলতার পরিচয় নয়; বরং তা আত্মসচেতনতা, সততা ও নৈতিক সাহসের প্রকাশ। একইভাবে অন্যের ভুল ক্ষমা করতে পারাও উদারতা ও মহত্ত্বের লক্ষণ।
প্রবারণা পূর্ণিমার সঙ্গে বুদ্ধের ধর্মপ্রচার ও মানবকল্যাণের ইতিহাসও জড়িয়ে রয়েছে। বৌদ্ধ ঐতিহ্য অনুসারে, ভগবান বুদ্ধ মাতৃদেবী মহামায়ার উদ্দেশে অভিধর্ম দেশনা দেওয়ার জন্য তাবতিংস স্বর্গে অবস্থান করেন এবং পরে সাংকাশ্য নগরে মর্ত্যে অবতরণ করেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বৌদ্ধসমাজে গভীর শ্রদ্ধা ও ধর্মীয় স্মৃতিচারণের ঐতিহ্য রয়েছে। একই সঙ্গে অগ্রশ্রাবক সারিপুত্র মহাস্থবিরের প্রজ্ঞাশ্রেষ্ঠত্বও বৌদ্ধ ঐতিহ্যে বিশেষ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।
প্রবারণা পূর্ণিমার আরেকটি আকর্ষণীয় ঐতিহ্য হলো ফানুস উত্তোলন। বৌদ্ধসমাজে ফানুসের আলোকে প্রজ্ঞা, শুভবোধ ও আশার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। প্রবারণা একদিকে বৌদ্ধদের পবিত্র ধর্মীয় উৎসব, অন্যদিকে মানবজীবনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ জীবনদর্শন। এতে রয়েছে আত্মশুদ্ধি ও আত্মসংযমের শিক্ষা, ভুল স্বীকারের সাহস, ক্ষমা প্রার্থনার বিনয় এবং অন্যকে ক্ষমা করার উদারতা। রয়েছে সত্যকে গ্রহণ এবং অসত্য ও অকল্যাণকে বর্জনের অঙ্গীকার। সর্বোপরি, এতে রয়েছে মানুষে মানুষে মৈত্রী, ঐক্য ও সমপ্রীতির সেতুবন্ধন।












