জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, প্রতি বছর পাহাড় ধসে প্রাণহানির পুনরাবৃত্তি রোধে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসরত ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে পর্যায়ক্রমে নিরাপদ স্থানে স্থায়ীভাবে পুনর্বাসন করা হবে। এ বিষয়ে সরকার প্রয়োজনীয় জমি ও আবাসনের ব্যবস্থা করবে। গত শনিবার রাতে নগরের আকবরশাহ থানার ১ নম্বর ঝিলের উপরে বায়তুন নুর জামে মসজিদ সংলগ্ন ব্র্যাক প্রাক–প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্র পরিদর্শনকালে তিনি এসব কথা বলেন।
আকবরশাহ ১ নম্বর ঝিলে ব্র্যাক প্রাক–প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে ত্রাণ বিতরণকালে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণে চট্টগ্রামে গত কয়েক দশকের অন্যতম সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয়েছে। এত প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সমন্বিত উদ্যোগে দুর্যোগ মোকাবিলায় সর্বাত্মক চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তবে পাহাড় ধসে প্রাণহানির ঘটনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তিনি নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। তিনি বলেন, সরকারের প্রধান তারেক রহমান তাকে চট্টগ্রামে পাঠিয়েছেন ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র পর্যালোচনা করে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে। তিনি জানান, আশ্রয়কেন্দ্রে যতদিন প্রয়োজন হবে ততদিন খাদ্য, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা অব্যাহত থাকবে।
নগরীতে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাস করছে ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ। জানা যায়, পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করা মানুষগুলো তাদের ঘরের মালিক নয়। স্বল্প ভাড়ায় তারা সেখানে বসবাসের সুযোগ পায়। পাহাড়ে অবৈধভাবে গড়ে তোলা প্রতিটি বস্তি কোনো না কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। যারা নিয়মিত ভাড়া আদায় করে। এই চক্রটির কারণে প্রশাসন চেষ্টা করেও পাহাড়ে বসতি বন্ধ করতে পারছে না। আগে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্যোগ মোকাবিলা শুধু বৃষ্টি শুরু হওয়ার পর সতর্কবার্তা প্রচারে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে আগেভাগে সরিয়ে নেওয়া, পুনর্বাসন, পাহাড় সংরক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতিই প্রাণহানি কমানোর মূল উপায়। তাঁরা বলেন, প্রশাসন শুধু দুর্ঘটনার সময় সক্রিয় হয়। বৃষ্টি শুরু হলে মাইকিং করে মানুষকে সরে যেতে বলা হয়। কিন্তু শুধু মাইকিং করে মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব নয়। এটি কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না; বরং বৃষ্টি শুরুর আগেই ঝুঁকিপূর্ণ বসতি সরানো, পুনর্বাসন এবং পাহাড়কে নিরাপদ করার কাজ শেষ করতে হবে।
আসলে অপরিকল্পিত নগরীতে কোনো পরিকল্পনা নেই। যদি পরিকল্পনা থাকতো তাহলে তাদের কোথাও স্থায়ীভাবে সরিয়ে নেওয়া যেত। পাহাড়ধস বন্ধে বেশ কিছু পাহাড় সংরক্ষণ করে দেখা যেতে পারে বলে অভিজ্ঞমহল মত প্রকাশ করেছেন। তাঁরা বলেন, পাহাড়গুলো আমাদের সম্পদ, প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য। প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকা যায় না! ধারাবাহিকভাবে পাহাড়ের ক্ষতি করে চললে পাহাড়ও একসময় তার প্রতিশোধ নেবে। পাহাড়কে নিজেদের স্বার্থে কোনো গোষ্ঠী বা চক্র যেন ব্যবহার করতে না পারে, সেদিকে নজর দিতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রচলিত যেসব আইন আছে সেসব আইনে যে শাস্তির বিধান বর্ণিত আছে তা আরও বৃদ্ধি করে এর সুপ্রয়োগ জোরদার করতে হবে। পাহাড় দখলকারীদের উচ্ছেদ করতে হলে যতটুকু জনবল বন বিভাগের থাকা উচিত সেসব বৃদ্ধিতেও সরকারকে মনোযোগ দিতে হবে।
জলবায়ুু পরিবর্তানের বিরূপ প্রভাবের হাত থেকে ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে পাহাড় ও গাছ কাটা বন্ধে পদক্ষেপ নিতে হবে। বর্ষায় কোনো না কোনো সময় ভারি বর্ষণ হবেই। তবে তার সঙ্গে পাহাড় কাটা, বনের গাছপালা কেটে ফেলার ঘটনা যোগ হলেই এর খেসারত চরমভাবে দিতে হবে আমাদের। পাহাড়ে আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, ঝুঁকিপূর্ণ বসতি স্থাপন নিষিদ্ধ করে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করলে কিছুটা হলেও পাহাড় কাটা রোধ করা যাবে। বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে। পাহাড় ধ্বংসের কুফল সবাইকে বোঝাতে হবে। চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বেআইনিভাবে পাহাড় কাটা রোধে এবং পাহাড়ে বসবাসকারীদের সুরক্ষায় সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি শুধু আশ্রয়কেন্দ্র খোলা বা সতর্কবার্তা প্রচারে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের হালনাগাদ তালিকা, আগাম সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা, নিরাপদ পুনর্বাসন, পাহাড় সংরক্ষণ এবং নতুন করে অবৈধ বসতি গড়ে ওঠা ঠেকাতে সারা বছর সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
পাহাড়ে বসবাসকারীদের স্থায়ীভাবে পুনর্বাসন করার যে পরিকল্পনা সরকার গ্রহণ করেছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। যত দ্রুত সম্ভব, তার বাস্তবায়ন করতে হবে।






