পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের সৌন্দর্য বিনষ্ট হতে দেয়া যাবে না

| বুধবার , ৩ আগস্ট, ২০২২ at ৬:১০ পূর্বাহ্ণ

পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত চট্টগ্রাম শহরের একটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। ওপারে সুন্দর প্রকৃতি পরিবেষ্টিত মেরিন একাডেমি। কর্ণফুলী নদীর মোহনায় সৃষ্টি হয়েছে মায়ার এই পর্যটন কেন্দ্র। শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর ঘাঁটি বিএনএস ঈসা খান পতেঙ্গার একেবারে সন্নিকটে অবস্থিত। পতেঙ্গা সৈকতে যাওয়ার পথে নৌবাহিনীর গল্ফ ক্লাব ও পাশের বোট ক্লাব পর্যটকদের চাহিদা মেটায়। এছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরের অনেক জেটি এখানে অবস্থিত। এখানে বসে পর্যটকদের মিলনমেলা। ইতোমধ্যে এই সৈকত ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ফলে বিকেল নামার সঙ্গে সঙ্গে হাজার হাজার পর্যটক ভিড় জমায় এই সমুদ্র সৈকতে।

তেমন মনোমুগ্ধকর এক পর্যটন এলাকাটির সৌন্দর্য বিনষ্ট হতে চলেছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। দৈনিক আজাদীর ১ আগস্ট সংখ্যায় প্রকাশিত ‘রাতারাতি গড়ে উঠছে দোকান / নষ্ট হচ্ছে গ্রিন লনের ঘাস, হারাচ্ছে সৌন্দর্য’ শীর্ষক সংবাদে জানা যায়, পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে রাতারাতি গড়ে উঠছে দোকান। মাত্র দিনকয়েকের মধ্যে পতেঙ্গা বিচ থেকে নারিকেল তলা পর্যন্ত সাগরপাড়ে নির্মিত হয়েছে শতাধিক দোকান। এ সব অপরিকল্পিত দোকান পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের সৌন্দর্যহানি ঘটাচ্ছে। একই সাথে নানা ধরনের অসামাজিক কার্যকলাপের পাশাপাশি অবৈধ মাদক ব্যবসারও আস্তানা গড়ে উঠেছে। পুলিশ এবং স্থানীয় একটি চাঁদাবাজ চক্র দোকান নির্মাণে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ সব দোকান থেকে প্রতিদিনই মোটা অংকের চাঁদা আদায় করে নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করা হয় বলেও জানা গেছে। প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে পতেঙ্গা থেকে ফৌজদারহাট পর্যন্ত আউটার রিং রোড নির্মাণ করা হচ্ছে। এই রাস্তা নির্মাণে পতেঙ্গা এলাকায় রাস্তা কাম বাঁধ নির্মিত হয়। এই প্রকল্পের আওতায় পতেঙ্গা এলাকায় অন্তত পাঁচ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে তৈরি করা হয় অনন্য সৌন্দর্যের পতেঙ্গা বিচ। প্রকল্পটির কাজ এখনো শেষ হয়নি। অথচ বিচ এলাকায় যততত্র অবৈধভাবে দোকান নির্মাণ করতে গিয়ে সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য লাগানো গাছ ও ঘাস কেটে ফেলা হচ্ছে। বিচ এলাকায় সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য ঢিবি তৈরি করা হয়েছিল। প্রতিটি গ্রিন লনে লাগানো হয়েছিল গাছ এবং ঘাস। অবৈধ দোকান নির্মাণের জন্য সবগুলো গ্রিন লন দখল করে ঘাস এবং গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। বিচের উন্মুক্ত এলাকা ক্রমে সংকুচিত করে ফেলা হচ্ছে বলে উল্লেখ করে স্থানীয় সূত্রগুলো বলেছে, শহরের সবচেয়ে সুন্দর জায়গাটি সংঘবদ্ধ একটি চক্র নষ্ট করে ফেলছে।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, আউটার রিং রোডের বিশাল একটি অংশ জুড়ে রয়েছে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের অবস্থান। এর মধ্যে সড়কের অংশ হিসাবে পতেঙ্গায় তিন স্তরের একটি পর্যটন স্পট’ও তৈরি হয়ে গেছে। যার আকর্ষণে প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক ছুটে আসে এখানে। সিডিএ’র নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সৈকতের সৌন্দর্য ধরে রাখার কাজও চলছে। সিডিএ’র এতো জনবল নেই বলে এটা বেসরকারি খাতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী ২০২৩ সালের মধ্যে শেষ হবে পুরো প্রকল্পের কাজ। যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তাতে দেখা যায়, নৌ বাহিনীর ওয়েস্ট পয়েন্টের পার্শ্ববর্তী অংশ থেকে সাড়ে ৫ কিলোমিটার পর্যন্ত হবে প্রথম জোন এবং সেখান থেকে ইপিজেডের পেছনের অংশ হবে দ্বিতীয় জোন। প্রথম জোন থেকে দ্বিতীয় জোনে যাওয়ার পথে দর্শনার্থীদের জন্য থাকবে টয় ট্রেন এবং ক্যাবল কার। ওয়াটার ক্রুজে যাওয়ার জন্য থাকবে দর্শনীয় দু’টি জেটি। একাধিক থিম পার্কের ব্যবস্থাও থাকবে এখানে। দর্শনার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা প্রবেশমূল্য থেকে একটি অংশ পাবে সিডিএ।

পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন বিকেলে ১০ থেকে ১৫ হাজার দর্শনার্থীর ভিড় জমে এই সৈকতে। আর বন্ধের দিন কিংবা যে কোনো উৎসবে তা লাখ ছাড়িয়ে যায়। পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত এলাকায় দর্শনার্থীর বেশিরভাগই সাধারণ মানুষ। এ অবস্থায় বিশাল সৈকত এলাকাকে বাণিজ্যকরণ করে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হলে সাধারণ মানুষের বিনোদন বাধাগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে বলে অভিমত অনেকের। চট্টগ্রাম পরিবেশ আন্দোলনের কর্মীরা বলেন, পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত চট্টগ্রামের সর্বশেষ উম্মুক্ত বিনোদন কেন্দ্র, যেখানে মানুষ অবসর সময়ে গিয়ে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে পারে। প্রকৃতির দানে গড়ে ওঠা এই সম্পদ, কোনো ব্যক্তি বিশেষের তৈরি নয়। চট্টগ্রাম শহরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত যেসব স্থান ছিল উন্নয়নের নামে প্রায় সবগুলো একে একে ধ্বংস করা হয়েছে। ফয়েস লেককে বেসরকারি খাতে ইজারা দিয়ে তা সর্বসাধারণের জন্য অবরুদ্ধ করে ফেলা হয়েছে। তাঁরা বলেন, চট্টগ্রাম শহরে এখন মানুষের ঘুরে বেড়ানোর জন্য এক টুকরো উন্মুক্ত প্রান্তর আর অবশিষ্ট নেই। সন্তানদের খেলার কোনো জায়গা নেই। সর্বশেষ পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতও বেসরকারি খাতে দিয়ে অবরুদ্ধ করে ফেলার এ প্রক্রিয়া চট্টগ্রামবাসী কোনভাবেই মেনে নিতে পারে না। এরকম একটি পর্যটন কেন্দ্রের সৌন্দর্য যাতে কোনো ক্রমেই বিনষ্ট না হয়, তার দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।