পণ্যমূল্য বৃদ্ধির পাঁয়তারা রুখে দিতে হবে

| শনিবার , ২ জুলাই, ২০২২ at ৫:০৮ পূর্বাহ্ণ

পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষ করে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, ইতোমধ্যে কারসাজি করে প্রায় সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়ানো হয়েছে। যেমন-এক মাসের ব্যবধানে বাজারে সব ধরনের চাল, পেঁয়াজ, মসলাজাতীয় পণ্যসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সামগ্রীর দাম বেড়েছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশে ধর্মীয় কোনো উৎসব উপলক্ষে যেখানে পণ্যসামগ্রীর দাম কমানো হয়, সেখানে সম্পূর্ণ ভিন্নচিত্র পরিলক্ষিত হয় আমাদের দেশে। এখানে বাড়তি মুনাফা পকেটস্থ করার দুরভিসন্ধিতে ভোক্তাদের জিম্মি করে পণ্যের দাম বাড়ানো হয়, যা অনৈতিক ও অগ্রহণযোগ্য।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মানুষের আয় ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে একটা বড় ব্যবধান রচিত হয়েছে। একারণে দৃশ্যত বাজারে কোনো পণ্যের অভাব না থাকলেও মানুষ তা কিনতে পারছে না। সামর্থের অভাবই এখানে প্রধান। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির দৈশিক ও বৈশ্বিক কারণ যাই হোক, তা এতটা বাড়ার কথা নয়। বেড়েছে ও বাড়ছে এক শ্রেণীর অতিমুনাফালোভী ব্যবসায়ীর কারণে। বলা বাহুল্য, দ্রব্যমূল্যের অব্যাহত ঊর্ধ্বগতিতে নিম্নবিত্তের মানুষের অবস্থা অত্যন্ত করুণ। তা এতটাই শোচনীয় যে, ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। মধ্যবিত্তের মানুষও দিশাহারা অবস্থায় পতিত হয়েছে। করোনার কারণে আগে থেকেই দ্রব্যমূল্য ক্রয়সামর্থের বাইরে চলে গিয়েছিল অধিকাংশ মানুষের। তাছাড়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুুদ্ধ মূল্যপরিস্থিতিকে রীতিমত ভয়াবহ অবস্থায় নিয়ে গেছে। দেশের অধিকাংশ মানুষ নিত্যপণ্যের লাগাতার মূল্যবৃদ্ধিতে সম্পূর্ণ অসহায় হয়ে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পণ্যবাজারের ওপরই সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। নিয়ন্ত্রণ বরাবরই বলবৎ আছে ব্যবসায়ীদের। চাল, ডাল, চিনি, তেল, পিঁয়াজ থেকে শুরু করে এমন কোনো নিত্যপণ্য নেই, যার দাম সাধারণ মানুষের নাগালে আছে। সরকারের পক্ষ থেকে কিছু পণ্যের দামের ঊর্ধ্বমুখী রশি টেনে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু তার ইতিবাচক ফল পাওয়া যায়নি। সয়াবিন তেলের কথা এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায়। সয়াবিনের দাম ব্যবসায়ীরা ইচ্ছামত দফায় দফায় বাড়িয়েছে। সরকারের কথা, হুমকি-ধমকি তারা কেয়ার করেনি। শেষ পর্যন্ত সরকারই সয়াবিন তেলের আমদানি ভ্যাটমুক্ত করে দিয়েছে। বাজারে এরও প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। অনেক সময় বলা হয়, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না সরকার।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আবদুল লতিফ মাসুম তাঁর এক লেখায় লিখেছেন, সোজা কথায় বলতে গেলে বাজারে আগুন লেগেছে। সেই আগুনে আমাদের বিবেক, আমাদের প্রশাসন এবং আমাদের রাজনীতি, সবকিছুই যেন জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে ব্যবসায়ীদের লোভ সীমালঙ্ঘন করেছে। এ দেশের রাজনীতি আর রাজনীতিবিদরা পরিচালনা করছে না। রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন হয়েছে। সেই সাথে রাজনীতির বাণিজ্যিকীকরণ ঘটেছে। প্রমাণ হিসেবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা জাতীয় সংসদ সদস্যদের পেশার হিসাবনিকাশ দিয়েছেন। ১৯৭২ সালে যদি ২০ ভাগ ব্যবসায়ী সংসদ সদস্য হয়ে থাকেন তাহলে তা এখন ৮০ ভাগে দাঁড়িয়েছে। জাতীয় সংসদ যেহেতু দেশের শাসনব্যবস্থাকে পরিচালনা করে সুতরাং তাদের প্রভাব অবশ্যই একটি বিবেচ্য বিষয়। সেবার পরিবর্তে লাভ-লোকসানের হিসাব করবেন জাতীয় সংসদ সদস্যরা এটাই স্বাভাবিক। আসলে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঘোড়া বেপরোয়াভাবে তছনছ করে দিচ্ছে জীবনযাত্রা। সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। মানুষ অসহায় হয়ে পড়েছে। সময়ের সাথে সাথে স্বাভাবিকভাবে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি অস্বাভাবিক নয়। অস্বাভাবিক হচ্ছে ব্যবসায়ীদের অদম্য লোভ, সাধারণ মানুষকে জিম্মি করার সিন্ডিকেট এবং সংশ্লিষ্টদের নিষ্ঠুর নির্লিপ্ততা।

বিশ্বের অন্যান্য দেশে উৎসব-পার্বণ উপলক্ষে বিশেষ ছাড় দেওয়া হয় নিত্যপণ্যে ও অন্যান্য সামগ্রীতে। দাম কমানো হয় পণ্যসামগ্রীর। সেখানে আমাদের দেশে প্রত্যক্ষ করি বিপরীত চিত্র। উৎসব-পার্বণে দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে দেওয়া যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে নানা অপকৌশলে। ভোক্তাদের অধিকার হরণ করা হচ্ছে নির্দ্বিধায়, ঠকানো হচ্ছে অনবরত। আগামী ঈদুল আজহা উপলক্ষে অসাধু ব্যবসায়ীদের যে কারসাজি শুরু হয়েছে, তা নিতান্তই অন্যায় ও অযৌক্তিক। এই অপতৎপরতা অবশ্যই রুখে দিতে হবে। অসাধু ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে পরিস্থিতি সামলানো কঠিন হয়ে পড়বে।