পণ্ডিত

সাদিকুল নিয়োগী পন্নী

শুক্রবার , ১৫ নভেম্বর, ২০১৯ at ৩:২২ পূর্বাহ্ণ
50

এক.
শিবেন পেশায় একজন মুচি। কিশোরগঞ্জ শহরের আখড়াবাজার এলাকায় পরিবার নিয়ে থাকেন। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তিনি শহরের শিল্পকলার পাশে দোকান নিয়ে বসেন। ছেলে রাহুল আর স্ত্রী লক্ষ্মীকে নিয়ে তার পরিবার। এই পেশায় তার যে টাকা আয় হয় তা দিয়ে তার সরসার চালাতে খুই কষ্ট হয়। অভাব অনটনের কারণে তার স্ত্রী বার বার পেশা পরিবর্তণ করতে বলেছেন। কিন্তু পূর্বপুরুষের এই পেশা তিনি ছাড়তে রাজি নন। তাই শত বাধা বিপত্তিতেও তিনি পেশাটা ধরে রেখেছেন। তবে শিবেন তার ছেলে রাহুলকে এই পেশায় জড়াতে চান না। তার ইচ্ছে ছেলে পড়াশোনা করে ভালো কিছু করবে। বছরের পর বছর শিল্প কলার পাশে বসতে বসতে শিবেনের মনে শিল্প সাহিত্যের প্রতি অন্যরকম ভালোবাসা জন্ম নিয়েছে। তার একান্ত ইচ্ছে ছেলে পড়াশোনার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হবে। দেশ বিদেশে সন্তানের সুনাম ছড়িয়ে পড়বে। তাই শিবেন রাহুলকে স্কুলে ভর্তির করানোর পর পরই উদ্যোগ নিলেন ছেলেকে শিল্পকলায় দেয়ার জন্য।
একদিন তিনি রাহুলকে নিয়ে গেলেন শহরের শিল্পকলা একাডেমিতে।
শিল্পকলার শিক্ষক সুখেন তখন বাচ্চাদের হারমোনিয়াম শিখাচ্ছিলেন। শিবেনকে দেখে তিনি হারমোনিয়াম বাজানো বন্ধ করে বললেন, কী ব্যাপার শিবেন। কাজ রেখে হঠাৎ তুমি এখানে? কারও কাছে টাকা পাওনা আছে নাকি?
জি না স্যার। আমি একটা কথা বলতে এসেছিলাম।
বলো কি বিষয়?
স্যার আমার ছেলেকে আপনার কাছে দিতে চাই। আমার খুব ইচ্ছে ছেলে হারমোনিয়াম বাজানো শিখবে।
দেখ শিবেন। এতে আমার কোন আপত্তি নেই। কিন্তু তোমার তো অভাবের সংসার..
স্যার আমার খুব ইচ্ছে ছেলাটা হারমোনিয়াম বাজানো শিখবে। এখানে যা খরচ লাগে তা আমি দিবো। মুচির ছেলেকে ছাত্র হিসেবে গ্রহণ করতে আপনার যদি কোন আপত্তি না থাকে তাহলে কাল থেকেই ছেলেকে আপনার কাছে পাঠাবো।
কে মুচি আর কে জমিদার আমি তার বিচার করি না। এখানে যারা শিখতে আসে সবাই আমার ছাত্র। পেশা দিয়ে বিচার করলে কেউ সাংস্কৃতিক চর্চা করতে পারবে না। তুমি কাল থেকেই তোমার ছেলেকে পাঠিয়ে দিও।
অসংখ্য ধন্যবাদ স্যার। দোকানটা খালি রেখে এসেছি। আমি তাহলে আজ যাই। নমস্কার। এই বলে শিল্পকলা থেকে চলে আসলেন শিবেন।
দুই.
শিল্পকলায় রাহুলের আজ প্রথম ক্লাস। তার বাবা দোকান নিয়ে বসার আগে রাহুলকে ক্লাসে দিয়ে গেলেন। রাহুল চুপচাপ বসে আছে। সুখেন ক্লাসে ডুকতেই সবাই দাঁড়িয়ে সম্মান জানাল।
সুখেন বললেন, আজ ক্লাসে নতুন একজন ছাত্র এসেছে। আমি তাকে তোমাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি। রাহুল এদিকে আস।
রাহুল সুখেনের কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
এই হল রাহুল। আখড়া বাজারের শিবেনের ছেলে।
রাজেশ নামে এক শিক্ষার্থী দাঁড়িয়ে বলল, শিবেন মুচির ছেলে নাকি স্যার?
সুখেন ধমক দিয়ে বললেন, এখানে সবাই আমার ছাত্র। কার বাবা কী করে তা দেখার বিষয় না।
তারপর স্যার একজন মুচির ছেলে আমাদের সাথে ক্লাস করবে? তাকে অন্য ব্যাচের সাথে দেন স্যার। ওর বাবার কাছ থেকে আমি গতকাল জুতোয় কালি করিয়েছি। এই ব্যাচে সে থাকলে আমি থাকবো না। বলল রাজেশ।
রিসাদ নামে আরেকজন বলল, ওর বাবা জুতো সেলাই করে। ও হারমোনিয়াম শিখে কী করবে? আমিও এই ব্যাচে থাকবো না।
সুখেন ক্ষিপ্ত হয়ে বললেন, তোমাদের সাংস্কৃতিক চর্চার প্রয়োজন নেই। এই বয়সেই তোমাদের মন এতো কলুষিত? তোমাদের জানা উচিত শিক্ষার অধিকার সবার আছে। সে মুচির সন্তান হোক বা জমিদারের সন্তানই হোক। তোমাদের আচরণে আমি খুব কষ্ট পেয়েছি। তোমাদের আমি আর হারমোনিয়াম শেখাবো না। তোমরা অন্য শিক্ষকের কাছে যাও। এই বলে সুখেন যখন ক্লাস থেকে বের হয়ে যাচ্ছিলেন তখন অন্যান্য শিক্ষার্থীরা স্যার যাবেন না প্লিজ প্লিজ বলে চিৎকার করে উঠলো।
সুখেন আবার ঘুরে ক্লাসে ঢুকলেন। তিনি রাহুলকে বসতে বললেন।
ক্লাসের অন্যান্য শিক্ষার্থীদের অনুরোধে রাজেশ এবং রিসাদ স্যারের কাছে ক্ষমা চাইলেন। তবে ক্লাসের অন্যান্য শিক্ষার্থীরাও রাহুল মুচির ছেলে হওয়ার কারণে বিষয়টি ভালোভাবে নেয়নি।
তিন.
কিরে ক্লাস কেমন হল? রাহুল বাসায় ফেরার পর তার বাবা শিবেন জানতে চাইলেন।
বাবা ভালই?
কিন্তু তুই মুখ গোমড়া করে আছিস কেন? কেউ কিছু বলেছে?
বাবা মুচির কাজটা বাদ দিয়ে অন্য কিছু করা যায় না। আজ ক্লাসের সবাই তোমাকে নিয়ে বাজে মন্তব্য করেছে।
বাবারে এই বয়সে আর কী করবো? বাপ দাদার আমল থেকে সবাই আমরা এই কাজ করে আসছি। তবে তোকে কখনও এই কাজ করতে বলবো না। এজন্যই তো তোকে স্কুলে ভর্তি করালাম। শিল্পকলায় স্যারের কাছে দিয়ে আসলাম।
বাবা তাহলে তুমি আর শিল্পকলার পাশে বসো না। অন্য কোথাও বসলে আমাকে নিয়ে কেউ কিছু বলতে পারবে না।
ঠিক আছে বাবা। কাল থেকে আমি কালী বাড়ির মোড়ে বসবো। আর মানুষের কথায় কষ্ট পাবি না। একদিন তুই অনেক বড় হবি। চারদিকে তোর সুনাম ছড়িয়ে পড়বে।
শিবেনের কথায় রাহুলের মনের কষ্ট কিছুটা লাঘব হলো। সে হাতমুখ ধুয়ে বই নিয়ে পড়তে বসল।
চার.
দেখতে দেখতে কয়েক বছর পার হয়ে গেল। রাহুল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পার হয়ে উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলে পড়ে। তাছাড়া সে এখন অন্যান্যদের মতোই হারমোনিয়াম বাজাতে পারে। তার এই শেখার পেছনের পুরো কৃতিত্ব সুখেন স্যারের। কারণ তিনি প্রতিটি ক্লাসের পর রাহুলকে আলাদাভাবে ঘন্টাখানেক সময় দিয়েছেন। সামনে বিভাগীয় পর্যায়ে একটা প্রতিযোগীতা হবে। শিল্পকলা থেকে চার পাঁচজন শিক্ষার্থীকে প্রতিযোগিতায় পাঠানোর দায়িত্ব পড়েছে শিবেন স্যারের ওপর। তিনি রাহুলদের ব্যাচ থেকে তিন জন এবং অন্য ব্যাচ থেকে দুইজন শিক্ষার্থীকে নির্বাচন করলেন। প্রতিযোগিতার আগে তাদের জন্য আলাদা ক্লাসের ব্যবস্থা করলেন। নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের একদিন ডেকে শিবেন বললেন, আমার ধারণা তোমরা দেশ সেরা হবে। তাই তোমাদের আগের চেয়ে বেশি শ্রম দিতে হবে। সারা দেশ থেকে অসংখ্য মেধাবী শিক্ষার্থীরা আসবেন। তোমাদেরকে তাদের সাথে লড়াই করতে হবে। এখন থেকে শুধু শিল্পকলায় নয় বাসাতেও চর্চা করতে হবে।
সবাই একসাথে বলল, জি স্যার।
তোমাদের কার কার বাসায় হারমোনিয়াম আছে হাত তুল।
রাহুল ছাড়া সবাই হাত উঠালো।
রাহুল তোমার বাবাকে বলে একটা হারমোনিয়ামের ব্যবস্থা করতে পারবে?
রাহুল মাথা নিছু করে বলল, স্যার হারমোনিয়াম কেনার মতো টাকা বাবার নেই। আমাকে বরং এই প্রতিযোগিতা থেকে বাদ দেন।
আচ্ছা দেখি তোমার জন্য কী করা যায়। ক্লাস শেষে আমার রুমে এসে তুমি দেখা করবে।
ঠিক আছে স্যার। বলল রাহুল।
ওই দিন ক্লাস শেষে সবাই চলে গেল। রাহুল গেল সুখেন স্যারের রুমে।
সুখেন বললেন, টেবিলের ওপর যে হারমোনিয়ামটা দেখছো এটা আমার স্যার আমাকে খুশি হয়ে গিফট করেছিলেন। বছরের পর বছর আমি এটাকে আগলে রেখেছি। আজ এটা তোমাকে দিয়ে দিচ্ছি। আশা করি তুমি এটার মর্যাদা রাখবে। দেশ সেরা হয়ে প্রমাণ করবে জাত দিয়ে মানুষকে মূল্যায়ণ করা উচিত নয়। মানুষের আসল মূল্যায়ণ তার মেধা ও কর্মে।
রাহুল তার শিক্ষক সুখেনকে প্রণাম করে হারমোনিয়াম নিয়ে বাসায় ফিরে আসলো।
পাঁচ.
রাহুল প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সবার সেরা হল। তার সুনাম ছড়িয়ে পড়ল সারা দেশে। দেখতে দেখতে রাহুল এসএসসি পাস করে গুরুদয়াল সরকারি কলেজে ভর্তি হয়েছে। পড়াশোনার পাশাপাশি তার নিয়মিত পদচারণ রয়েছে শিল্পকলায়। সুখেন তাকে প্রতি শুক্রবার ক্লাস নেয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন। এতে যে কয় টাকা আয় হয় তা দিয়ে পড়াশোনার খরচের কিছুটা চাহিদা মিটে। তাছাড়া সুখেন প্রতি মাসে রাহুলকে বাড়তি কিছু টাকা দিয়ে থাকেন। এভাবে কলেজের পাঠ চুকিয়ে সুখেন ভর্তি হয় ঢাকায় একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগে। প্রথম বছরেই সে যুক্তরাজ্যের একটা স্কলারশিপ পেয়ে যায়। কিন্তু বিদেশ যাওয়ার টাকা পয়সা নিয়ে রাহুল পড়েন বিপাকে। তখনও আবার এগিয়ে আসেন সুখেন। তিনি তার সঞ্চিত টাকা থেকে সুখেনকে বিদেশে পাঠানো ব্যবস্থা করেন। বিদেশে যাওয়ার পর থেকেই রাহুলের মধ্যে পরিবর্তন আসতে থাকে। ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায় সুখেন স্যারের সাথে যোগাযোগ। একদিন রাহুলের খবর নিতে আখড়া বাজার তাদের বাড়িতে ছুটে যান সুখেন। কিন্তু ওই এলাকার লোকজন জানিয়ে দেন রাহুলের পরিবার ঢাকায় চলে গেছেন। এরপর থেকে রাহুলের আর কোন খবর পাননি সুখেন।
ছয়.
বেশ কিছু দিন হল সুখেন শিল্পকলা থেকে অবসর নিয়েছেন। কিন্তু তার মন পড়ে থাকে শিল্পকলায়। একটু সুযোগ পেলেই তিনি ছুটে যান শিল্পকলায়। দর্শক গ্যালারিতে বসে অনুষ্ঠান উপভোগ করেন। একদিন তিনি শিল্পকলায় গিয়ে দেখেন কড়া নিরাপত্তা। চারদিকে আইনশৃংখলা বাহিনীর লোকজন। গেটে টিকিট চেক করে সবাইকে প্রবেশ করানো হচ্ছে। হঠাৎ সুখেনের চোখ পড়ল একটা ডিজিটাল ব্যানারের দিকে। তিনি বেশ আনন্দিত হলেন। কারণ এই ব্যানারটা করা হয়েছে তার ছাত্র রাহুলকে নিয়ে। তিনি সিকিউরিটির একজনের কাছে জানতে চাইলেন, কখন অনুষ্ঠান শুরু হবে?
উত্তরে সিকিউরিটি গার্ড বললেন, রাহুল স্যার আসলেই শুরু হবে। আপনার টিকিট আছে?
সুখেন হাসি দিয়ে বললেন, আমার টিকিট লাগবে না। রাহুল আমার ছাত্র।
কিছু মনে করবেন না। পণ্ডিত রাহুলের অনুষ্ঠানে কাউকে টিকিট ছাড়া প্রবেশ করতে দেয়া যাবে না।
ঠিক আছে। আমি তাহলে এখানেই অপেক্ষা করছি। রাহুল আসলে তার সাথেই ঢুকবো।
সিকিউরিটি গার্ড আর কিছু বললেন না।
সুখেন ভাবলেন রাহুল তাকে দেখা মাত্রই পা ছুয়ে প্রণাম করবেন। তাকে জড়িয়ে ধরে মঞ্চে নিয়ে যাবেন। পরিচয় করিয়ে দিবেন সবার সাথে।
কিছুক্ষণ পর কয়েকটা মাইক্রো বাস এসে থামলো শিল্পকলার গেটের সামনে। একটা গাড়ি থেকে রাহুল নামল। সুখেন ছুটে গিয়ে আবেগে তাকে জড়িয়ে ধরলেন।
রাহুল আমি বলেছিলাম না তোমার অনেক সুনাম হবে। তোমাকে দেখে গর্বে আজ আমার বুক ভরে গেছে।
সুখেনের কাছ থেকে রাহুল নিজেকে সরিয়ে নিয়ে বললেন, আপনি আমাকে না চিনেই এভাবে জড়িয়ে ধরলেন? আজব দেশের মানুষ। এই সিকিউরিটি আপনি এখানে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছেন নাকি?
রাহুল আমি তোমার শিক্ষক। আমাকে চিনতে পারছো না? বললেন সুখেন।
যখন কারও খ্যাতি হয় তখন আপনাদের মতো এমন গাও গেরামের লোকজন নিজেকে তার শিক্ষক দাবি করেন। আপনাকে আমি চিনতে পারছি না। আর কথার বলার মতো সময় নাই। অনেক মানুষ আমার জন্য অপেক্ষা করছে। এই বলে শিল্পকলায় ঢুকে গেল রাহুল।
সুখেন হতভম্ব হয়ে গেলেন। তার চোখ দিয়ে অজোরে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। তিনি অশ্রুভেজা চোখে গেটের সামনে দাড়িয়ে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন ‘পণ্ডিত রাহুলের সংবর্ধণা’ লেখা সম্বলিত ব্যানারের দিকে।

x