কর্ণফুলী নদী ও শিকলবাহা–মুরালি খালের জোয়ারের পানি থেকে কৃষিজমি, বসতবাড়ি ও শিল্পাঞ্চল রক্ষায় পটিয়া ও কর্ণফুলী উপজেলায় ১০ দশমিক ৪৫ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ দেয়াল (ফ্লাড ওয়াল) নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। সংশ্লিষ্ট এলাকায় প্রতিদিন জোয়ারের পানিতে প্রায় ১৫০ হেক্টর জমি প্লাবিত হচ্ছে। এতে ব্যাহত হচ্ছে কৃষিকাজ, ঝুঁকিতে রয়েছে বসতি ও শিল্পকারখানা।
প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় পটিয়া উপজেলার কৈয়গ্রাম ব্রিজ থেকে শিকলবাহা–মুরালি খালের উৎসমুখ পর্যন্ত ৬ দশমিক ৪৫ কিলোমিটার এবং কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহা ইউনিয়নের কালারপোল ব্রিজ থেকে ভেল্লাপাড়া ব্রিজ পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার এলাকায় ফ্লাড ওয়াল নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
পাউবোর প্রাথমিক কারিগরি প্রতিবেদন অনুযায়ী, কর্ণফুলী নদীর বাম তীরসংলগ্ন শিকলবাহা–মুরালি খাল কর্ণফুলী ও সাঙ্গু নদীর মধ্যে সংযোগ তৈরি করেছে। আনোয়ারার বারখাইন ইউনিয়নে গিয়ে খালটি সাঙ্গু নদীতে মিলেছে। খালটিতে জোয়ার–ভাটার প্রভাব থাকায় পানি দুই পাশের নিচু এলাকায় প্রবেশ করে। বিশেষ করে শিকলবাহা ইউনিয়নের ৪ ও ৫ নম্বর ওয়ার্ডে কালারপোল থেকে ভেল্লাপাড়া পর্যন্ত এলাকায় প্রায় ১৫০ হেক্টর জমি নিয়মিত প্লাবিত হচ্ছে। এতে কৃষিজমির ব্যবহার ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিল্পকারখানা ও বেসরকারি বিনিয়োগের সম্ভাবনাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
অন্যদিকে, পটিয়ার কৈয়গ্রাম ব্রিজ থেকে শিকলবাহা–মুরালি খালের উৎসমুখ পর্যন্ত ৬ দশমিক ৪৫ কিলোমিটার এলাকায় প্রয়োজনীয় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ না থাকায় কৃষিজমি ও বসতবাড়ি জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
পাউবো সূত্র জানায়, পটিয়ার কৈয়গ্রাম থেকে ধলঘাট পর্যন্ত বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের আওতায় বাঁধ নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। তবে কৈয়গ্রাম থেকে শিকলবাহা–মুরালি খালের উৎসমুখ পর্যন্ত অংশটি ওই অবকাঠামোর বাইরে থেকে গেছে। প্রস্তাবিত ফ্লাড ওয়াল নির্মাণের মাধ্যমে এই ঘাটতি পূরণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
প্রাথমিক কারিগরি প্রস্তাবে ১০ দশমিক ৪৫০ কিলোমিটার ফ্লাড ওয়ালের পাশাপাশি দুটি ভেন্টবিশিষ্ট একটি রেগুলেটর নির্মাণ এবং ৮ দশমিক ৩৬ হেক্টর জমি অধিগ্রহণের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। প্রকল্পের কারিগরি ও প্রশাসনিক দিক যাচাইয়ের জন্য প্রস্তাবটি পাউবোর পরিকল্পনা–১ পরিদপ্তরে পাঠানো হয়।
এর আগে ২০২৫ সালের জেলা প্রশাসক সম্মেলনেও কর্ণফুলীর শিকলবাহা ইউনিয়নের কালারপোল থেকে ভেল্লাপাড়া কোল্ডরোল স্টিল ফ্যাক্টরি পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকায় বাঁধ নির্মাণের বিষয়টি আলোচনায় আসে। শিল্পকারখানাবেষ্টিত ওই এলাকায় প্রচলিত মাটির বাঁধের পরিবর্তে ফ্লাড ওয়াল নির্মাণের বিষয়টি বিবেচনা করে পাউবো। তবে পরবর্তী সময়ে বৃহত্তর ১০ দশমিক ৪৫ কিলোমিটার এলাকার পরিকল্পনা নিয়ে সম্ভাব্যতা সমীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পাউবোর প্রধান প্রকৌশলী, পরিকল্পনা দপ্তর থেকে ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে শিকলবাহা–মুরালি খালের বন্যা ব্যবস্থাপনা ও নিষ্কাশন উন্নয়নের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রকল্পের প্রস্তাব দেওয়া হয়। ‘শেরপুর জেলার সমন্বিত নদী, বন্যা ও পানি ব্যবস্থাপনা এবং চট্টগ্রাম জেলার শিকলবাহা/মুরালি খালের বন্যা ব্যবস্থাপনা ও নিষ্কাশন উন্নয়ন পরিকল্পনার নিমিত্ত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা’ শীর্ষক প্রকল্পটির প্রস্তাবিত মেয়াদ জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০২৯ পর্যন্ত। তবে এই সমীক্ষা প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন, মাঠপর্যায়ে কাজ শুরুর কিংবা মূল ফ্লাড ওয়াল নির্মাণ প্রকল্পের অনুমোদনের বিষয়ে এখনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে জোয়ারের পানি থেকে এলাকাকে সুরক্ষার উদ্যোগটি আপাতত সমীক্ষা ও প্রশাসনিক অনুমোদনের পর্যায়েই রয়েছে।
এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের চট্টগ্রাম ডিভিশন–১–এর নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে সাহীদ বলেন, পটিয়া উপজেলার শিকলবাহা–মুরালি খালের বন্যা ব্যবস্থাপনা ও নিষ্কাশন উন্নয়নসহ ভবিষ্যতে স্থায়ী প্রকল্প গ্রহণের লক্ষ্যে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রকল্প (পিএফএস) প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রকল্পটি জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০২৯ মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য বর্তমানে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তিনি বলেন, সমীক্ষা শেষ হলে এর সুপারিশের ভিত্তিতে পটিয়া উপজেলায় সেচব্যবস্থা ও বেড়িবাঁধ নির্মাণে নতুন টেকসই প্রকল্প গ্রহণ করা হবে।












