ন ডরাই

শৈবাল চৌধূরী

মঙ্গলবার , ১৪ জানুয়ারি, ২০২০ at ৫:৩৯ পূর্বাহ্ণ

খুবই হতাশার সঙ্গে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের আরো একটি বছর পার হয়ে গেল। গত বছরের থেকে কয়েকটি ছবি বেশি মুক্তি পেলেও বন্ধ হয়ে গেছে আরো অনেক সিনেমা হল। বিভাগীয় শহর রাজশাহীসহ আরো কয়েকটি শহর প্রেক্ষাগৃহ শূন্য হয়ে পড়েছে। সারা বছরে মাত্র দু’তিনটে উল্লেখযোগ্য ছবি মুক্তি পেয়েছে কিন্তু দর্শকানুকূল্য পায় নি সিনেমা হলের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে। একই ছবি যখন সিনেপ্লেক্সে চলেছে তখন দর্শকেরা চড়া দামে টিকেট কিনে সে ছবি দেখেছেন যা সাধারণ দর্শকের পক্ষে আয়াসসাধ্য নয়। সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এবং যে ক’টা আছে সেগুলোও হয়তো বন্ধ হয়ে যাবে, কাজেই হা হুতাশ করে আর লাভ নেই। বাস্তবভিত্তিক কাজ হবে, যেসব সিনেমা হল অবশিষ্ট আছে সেগুলোর আকার ছোট এবং মেরামত করে সিনেমা দেখার উপযোগী করে তোলা। পাশাপাশি সিনেপ্লেক্স নির্মাণ। দেশের প্রতিটি শহরে। তবে সিনেপ্লেক্সের টিকেটের দাম দর্শকদের সাধ্যের মধ্যে রাখা বাঞ্ছনীয়। বিত্তবান দর্শকের কথা মাথায় রাখলে লাভের কিছু হবে না। আশার কথা, সরকার এ বছরের শেষের দিকে বিষয়টি নিয়ে ভেবেছেন এবং বিভিন্ন জেলা শহরে সরকারি উদ্যোগে সিনেপ্লেক্স নির্মাণের প্রকল্প হাতে নিয়েছেন। তবে প্রকল্প এবং উদ্যোগ যত দ্রুত বাস্তবায়িত হয় ততই মঙ্গল।
এত কিছুর পরে বছরের শেষ প্রান্তে একটি তরতাজা ছবি দেখার সুযোগ হলো। তানিম রহমান অংশু পরিচালিত ‘ন ডরাই’। ছবিটির বিষয় বৈচিত্র্য ভিন্নরকম, বিশ্বের বৃহত্তম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারের গড়ে ওঠা সার্ফিং সংস্কৃতি এ ছবির উপজীব্য। একটি সত্যি ঘটনাকে অবলম্বন করে গড়ে উঠেছে এ ছবির কাহিনী কাঠামো। আয়েশা নামের এক সাগর কন্যা যার শৈশব কৈশোর কেটেছে বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউয়ের দোলায়। সার্ফিং যার নেশা। তার স্বপ্ন সার্ফিংয়ের মাধ্যমে সে দেশের জন্যে বিজয়ের সম্মান বয়ে আনবে। রক্ষণশীল পরিবার ও ঈর্ষাপরায়ণ সহোদর ভাইয়ের কঠোর বিরোধিতায় সে আর এগুতে পারে না। জোর করে তার বিয়ে দেওয়া হয় বয়সে ঢের বড় আরেক কুলাঙ্গারের সঙ্গে। শেষ পর্যন্ত স্বামী কর্তৃক পরিত্যক্তা হয়ে নিজের পরিবারেও একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়। শেষ পর্যন্ত তার পাশে এসে দাঁড়ায় তার প্রতি শৈশব থেকে অনুরক্ত সেই বন্ধু। বন্ধুটিও সার্ফিং-এর দক্ষ একজন খেলোয়াড় এবং যে ইতোমধ্যে ইন্দোনেশিয়ায় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বিজয়ী। দু’জন আবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়ায়।
একরৈখিক এই গল্পে স্বাভাবিকভাবেই এসেছে আনুষঙ্গিক বিভিন্ন ঘটনা ও চরিত্র। যা গল্প এবং মূল চরিত্র আয়েশাকে নানাভাবে উপস্থাপন করেছে। তবে সব ছাপিয়ে ছবির মূল চরিত্র হয়ে উঠতে পেরেছে সার্ফিং। এখানেই ছবিটির বিশেষত্ব। কক্সবাজার সৈকতের বিস্তৃতি সার্ফিং-এর পক্ষে খুবই উপযুক্ত। ক্রীড়াটি এতদিন বিদেশিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন স্থানীয়দের মধ্যেও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এর ফলে সৃষ্টি হয়েছে পর্যটনের এক বড় সম্ভাবনা। যদিও এর জন্যে এখনো গড়ে ওঠেনি প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা। বিদেশি সার্ফারদের উৎসাহ ও প্রশিক্ষণেই এর যতটুকু বিকাশ। ‘ন ডরাই’ ছবিতে এসব বিষয়ও উঠে এসেছে। উঠে এসেছে কক্সবাজারের বিপুল পর্যটন সম্ভাবনার দিকটিও। সব মিলে ছবিটি যথেষ্ট প্রাণবন্ত ও উপভোগ্য।
‘ন ডরাই’ ছবির বড় বিশেষত্ব তার ভাষা। ছবিতে চট্টগ্রামের ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে। এই ভাষাটি ইতোমধ্যে ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃতি পেয়েছে বিশ্বের ৬৯তম ভাষা হিসেবে যার ব্যাপ্তি বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিভাগ, মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশ, ভারতের মিজোরাম, ত্রিপুরা ও অরুণাচল প্রদেশ জুড়ে। ভারতের অসম রাজ্যের ভাষার সঙ্গে চট্টগ্রামের ভাষার ধ্বনি ও শব্দগত মিল লক্ষ্যণীয়। ২ কোটির ওপর মানুষ এ ভাষায় কথা বলে। কিন্তু এই ভাষাটিকে অবলম্বন করে এ পর্যন্ত যে কয়টি ছবি বাংলাদেশে নির্মিত হয়েছে, প্রতিটি ছবিতে ভাষাটিকে বিকৃত ও হাস্যকর করে তোলা হয়েছে। চট্টগ্রামের ভাষা অন্য ভাষীদের পক্ষে আত্মস্থ করা যথেষ্ট কষ্টসাধ্য।
তাছাড়া অন্য ভাষীদের কাছে এই ভাষাটি অনেকটাই দুর্বোধ্যও বটে। ফলে এ পর্যন্ত যে’কটি ছবি চট্টগ্রামের ভাষায় তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে প্রতিটিতেই আপসের ব্যাপারটি দেখা যায়। অন্যান্য জেলার অধিবাসীদের কাছে বোধগম্য করে তোলার উদ্দেশ্যে হয়তো কাজটি করা হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিষয়টি হয়ে দাঁড়িয়েছে কেবলই হাস্যকর। বিশুদ্ধ চট্টগ্রামীণ ভাষার ব্যবহার করে বাংলা এবং ইংরেজিতে সাবটাইটেল সংযুক্ত করার মাধ্যমে এই সমস্যার সহজ সমাধান সম্ভব। ‘ন ডরাই’ ছবিতে চট্টগ্রামের ভাষার প্রয়োগ তুলনামূলকভাবে অনেক ভালো। প্রধান চরিত্রের অভিনয় শিল্পীরা যতটুকু সম্ভব ভালো বলেছেন এবং যথাযথ বলেছেন চট্টগ্রামের অভিনয় শিল্পীরা। তবে এখানেও ভাষাগত দুর্বোধ্যতার ব্যাপারটি রয়ে গেছে।
আন্তর্জাতিকতার বিষয় মাথায় রেখে পুরো ছবিটির সংলাপ ইংরেজিতে (বেশ কিছু ইংরেজি সংলাপ রয়েছে বিদেশি চরিত্রগুলোর মুখে) সাবটাইটেল করা হয়েছে বটে, বাংলাদেশের অন্যান্য জেলার দর্শকদের কথা ভেবে চট্টগ্রামীণ সংলাপগুলো বাংলাতে সাবটাইটেল করে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি ছিল।
এ ছবির অভিনয়াংশ যথেষ্ট প্রাণবন্ত। স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয় করেছেন প্রায় সবাই। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য মেন্টর আমির চরিত্রে সাইদ বাবু যে চরিত্রটি পুরো ছবির ভরকেন্দ্র। সোহেল চরিত্রে শরিফুল রাজ, সোহেলের বাবার চরিত্রে হিন্দোল রায়, আয়েশার স্বামীর চরিত্রে নাসির উদ্দিন খান এবং আয়েশার মায়ের চরিত্রে কংকন দাশ যথেষ্ট সাবলীল। তবে মুখ্য চরিত্র আয়েশার অভিনয়ে সুনেরা বিনতে কামালের অভিনয়ে আরো স্বতঃস্ফূর্ততা প্রয়োজন ছিল। তবে শেষার্ধে তার অভিনয় যথেষ্ট ভালো।
ন ডরাই-এর চিত্রগ্রহণ যথেষ্ট পরিশ্রমী। কক্সবাজারের বিস্তৃত ল্যান্ডস্কেপ ও সিলুয়েট ফটোগ্রাফির সমন্বয়ে দৃষ্টিনন্দন সিনেমাটোগ্রাফি উপহার দিয়েছেন সুমন সরকার। অমিত ইশানের সুপ্রযুক্ত সঙ্গীতও এই ছবির মেরিট বাড়াতে যথেষ্ট সহযোগিতা করেছে। সম্পাদনা করেছেন পরিচালক নিজে। সম্পাদনা গতিশীল হলেও ছবির দৈর্ঘ্য কি আরেকটু কমানো যেত? আয়েশাকে মারার দৃশ্যগুলো একটু দীর্ঘ এবং ভায়োলেন্ট মনে হয়েছে। তেমনি একটু দীর্ঘ মনে হয়েছে আয়েশার শ্বশুর বাড়ির সিকোয়েন্সগুলোও। কিশোরদের সার্ফিং-এর দৃশ্যগুলো আরেকটু ডিটেলসে করার প্রয়োজন ছিল। একটা প্রজন্ম কিভাবে সার্ফিং-এর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে উঠছে এই বিষয়টি আরো একটু প্রতিষ্ঠার দাবি করে।
ছবির চিত্রনাট্য লিখেছেন ভারতের স্বনামখ্যাত চিত্র নাট্যকার শ্যামল সেনগুপ্ত। যিনি পিংক, বুনো হাঁসসহ আরো কয়েকটি সফল ছবির চিত্রনাট্যকার। ন ডরাই-এর চিত্রনাট্যও বেশ টান টান। পরিচালক তানিম রহমান অংশু এই চিত্রনাট্যে প্রাণ দিয়েছেন। টিম লিডার হিসেবে যথেষ্ট দক্ষতার পরিচয় রেখেছেন তিনি। তেমনি প্রযোজক মাহবুব রহমান রুহেলের জন্যেও অভিনন্দন যিনি ন ডরাই ছবির কাহিনীকার। এ ধরনের একটি কাহিনীর চলচ্চিত্রায়নে লগ্নী করতে যাওয়াটা যথেষ্ট সাহসের ব্যাপার। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র প্রদর্শন ও পরিবেশনায় রুহেলের অবদান ইতোমধ্যেই প্রশংসিত। আশা করব তিনি তার নিজের শহরেও চলচ্চিত্রের মানসম্পন্ন প্রদর্শনের বিষয়টি নিয়ে ভাববেন। চলচ্চিত্র প্রযোজনার নতুন ভূমিকায় তাকে স্বাগতম। টিম ন-ডরাই-এর প্রতি আমাদের শুভ কামনা।
ন-ডরাই দেখলাম সিনেমা প্যালেসে। প্রজেকশন ও সাউন্ড আলমাসের চাইতে ভালো হলেও আসনের অবস্থা রীতিমত ভীতিকর। ভীতিকর পুরো প্রেক্ষাগৃহের পরিবেশ। ফলে ফাঁকা হলে ছবিটি দেখার অভিজ্ঞতা হলো। অথচ সিনেপ্লেক্সে চড়া দামের টিকেট কেটে ভালো পরিবেশে সারি বেঁধে দর্শকেরা ছবিটি দেখছেন। কাজেই যে তিনটি হল এ শহরে অবশিষ্ট আছে সেসবের মেরামত আশু দরকার। এবং দরকার বেশ কয়েকটি সিনেপ্লেক্সের। তবে টিকেটের দামের ব্যাপারেও ভাবনা চিন্তা প্রয়োজন।

x