বিগত কয়েক বছর ধরে আমাদের সমাজে নৈতিক শিক্ষার অভাব ও যৌনশিক্ষার ঘাটতি এক অরণ্যসদৃশ সংকট সৃষ্টি করেছে। পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতা, অনভিজ্ঞতা ও ট্যাবু, অনিয়ন্ত্রিত সোশ্যাল মিডিয়া এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা মিলিয়ে শিশু ও কিশোর–কিশোরীদের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
নৈতিকতা কোনো সমাজের মর্যাদা ও সংহতির ভিত্তি। বর্তমানে পারিবারিক বন্ধন কমে যাওয়া, দ্রুত পরিবর্তনশীল বিনোদন কন্টেন্টের প্রাধান্য এবং মূল্যবোধহীন নানা উৎস শুধু শিশু কিশোর কোমলমতিকে বিপথগামী করছে না, বরং যুবক ও বয়স্কদের সামাজিক নৈতিক অবস্থানকেও স্খলিত করছে। পরিবারই শিশুর আচার–ব্যবহার, শালীনতা ও সৎচরিত্র গঠনের প্রথম প্রতিষ্ঠান। যদি এখানেই সঠিক দৃষ্টান্ত তৈরি না হয়, তবে স্কুল বা অন্য কোথাও তা পূরণ করা কঠিন। তাই নৈতিক শিক্ষাকে পরিবারের নিত্যনৈমিত্তিক ব্যবহার ও কথোপকথনের মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত করা জরুরি।
যৌনতা বা শারীরিক শিষ্টাচার সম্পর্কে পরিবারে খোলামেলা আলোচনা না হওয়া একটি বড় সমস্যা। বহু পরিবারে এই বিষয়গুলো নানা বিশ্বাস ও লজ্জার আড়ালে লুকিয়ে রাখা হয়। আবার অন্যদিকে মিডিয়ার যৌন আবেদনময় কন্টেন্ট বড় ছোট অনেকেই একসঙ্গে উপভোগ করছে। এর ফলে শিশুরা নিরাপদ আচরণ, আনন্দ ও হামলার পার্থক্য, নিজেদের সীমানা চেনা বা ঝুঁকি বোঝার শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়। অভিভাবকদের উচিত সহজ ভাষায় ও বয়স উপযোগীভাবে এসব বিষয়ে কথোপকথন শুরু করা এবং শিশুকে প্রশ্ন করতে উৎসাহ দেওয়া। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, অধিকাংশ শিশুর বিরুদ্ধে যৌন অপরাধ ঘটে তাদের পরিচিত মানুষের হাতেই–আত্মীয়, প্রতিবেশী, শিক্ষক বা পরিচিতকর্মী। ২০২১ সালে, যখন করোনা মহামারীর প্রভাব পুরোপুরি কাটেনি, তখনও বাংলাদেশে ৮১৮ জন শিশুর ধর্ষণের রিপোর্ট নথিভুক্ত হয়েছে।
ফেসবুকে একজন ম্যাজিস্ট্রেটের ভাষ্যে জানা যায়, শিশু ধর্ষকদের জবানবন্দী নিতে গিয়ে একটি ভয়ঙ্কর মিল দেখা গেছে–তাদের মধ্যে লজ্জা, অনুতাপ বা দ্বিধা নেই; বরং এক ধরনের নির্লিপ্ততা। ১৩ মাস বয়সী শিশু থেকে ১৪ বছরের ছেলেমেয়ে পর্যন্ত ছিল শিকার।
একজন আসামি জানায়, মাত্র দুই মাস আগে তার বিয়ে হয়েছে। ঘটনার সময় তার স্ত্রী রান্নাঘরে রান্না করছিল। শিশুটি জামা প্যান্ট পরা ছিল, তবুও হঠাৎ তার “মাথা কাজ করেনি”। আরেকজন আসামি, যিনি শিশুটির দাদার বন্ধু, বলেন–ছেলেটিকে নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে বাঁশঝাড় দেখে তার “মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি” আসে। এই অভিজ্ঞতা থেকে ম্যাজিস্ট্রেট সতর্ক করেছেন–সন্তানের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কাউকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করা যায় না। অপরাধীরা প্রায়ই ভিকটিমের কাছাকাছি অবস্থান তৈরি করে, বিশ্বাস অর্জন করে এবং সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। তাই পরিচিত মানেই নিরাপদ–এ ধারণা ভুল প্রমাণিত হচ্ছে। স্কুল কলেজের পাঠ্যক্রমে যৌনশিক্ষার অভাব তরুণদের সঠিক তথ্য থেকে বঞ্চিত করে। এমনকি বিজ্ঞানের পাঠ্যবইয়ে শরীর সম্পর্কিত বিষয় থাকলেও অনেক শিক্ষক শিক্ষার্থীদের বাসায় পড়ে নিতে বলেন। কারণ এসব বিষয় পড়ানোর সময় শিক্ষার্থীরা বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করে, যা সামলাতে অনেক শিক্ষকের প্রশিক্ষণেরও ঘাটতি রয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে পর্নোগ্রাফি তরুণদের যৌন শিক্ষার প্রধান তথ্যসূত্র হয়ে উঠছে। এতে বিকৃত ধারণা ও অবাস্তব প্রত্যাশা তৈরি হয়। সম্মতি, সম্মানজনক আচরণ, সংক্রমণ বা বাস্তব সম্পর্কের বিষয়গুলো অজ্ঞাত থেকে যায়। ফলে যৌনতা সম্পর্কে বিভ্রান্তি ও আকাঙক্ষা বাড়ে এবং কখনো কখনো তা সহিংস আচরণে রূপ নেয়। যেখানে সুষম যৌনশিক্ষা দেওয়া হয়, সেখানে সহিংসতার হার তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়।
শিশুদের নিজেদের শরীর ও শারীরিক শিষ্টাচার সম্পর্কে জানানো, ঝুঁকি চিহ্নিত করা এবং আত্মরক্ষার মৌলিক দক্ষতা শেখানো অত্যন্ত জরুরি। স্কুলে বয়স উপযোগী কর্মশালা ও অনুশীলন চালু করলে শিশুদের আত্মবিশ্বাস বাড়ে এবং বিপদের সময় তারা সঠিক প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে। পাশাপাশি হটলাইন ও স্থানীয় সহায়তা ব্যবস্থা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করলে দ্রুত সাহায্য পাওয়া সম্ভব হয়। যে পদক্ষেপগুলো নেওয়া যেতে পারে–
১. প্রাতিষ্ঠানিক যৌনশিক্ষা অন্তর্ভুক্তি
সরকার ও শিক্ষাবোর্ড শিশুদের জন্য যুগোপযোগী ও বয়স উপযোগী যৌনশিক্ষা পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে। শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যাতে তারা শ্রেণিকক্ষে সংবেদনশীলভাবে এসব বিষয় পড়াতে পারেন।
২. অভিভাবকদের জন্য নির্দেশনা ও কমিউনিটি সাপোর্ট
অভিভাবকদের জন্য সহজ গাইডলাইন, কর্মশালা ও কমিউনিটি সাপোর্ট চালু করা প্রয়োজন। কীভাবে বয়ঃসন্ধি, সম্মতি ও ব্যক্তিগত সীমানা নিয়ে সন্তানের সঙ্গে কথা বলতে হবে–সে বিষয়ে তাদের প্রস্তুত করা দরকার।
৩. আইন প্রয়োগ ও বিশেষায়িত তদন্ত ইউনিট
শিশু নির্যাতন মামলার দ্রুত ও সংবেদনশীল তদন্তের জন্য প্রশিক্ষিত, লিঙ্গ সংবেদনশীল পুলিশ ও প্রসিকিউটর টিম গঠন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দ্রুত বিচার ও ভিকটিমবান্ধব প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে।
৪. শিশুসুরক্ষা কেন্দ্র
স্থানীয় পর্যায়ে শিশু সুরক্ষা কেন্দ্র গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে শিক্ষক, সমাজকর্মী, স্থানীয় নেতা ও স্বেচ্ছাসেবীরা একসঙ্গে কাজ করবেন। এসব কেন্দ্রে ঝুঁকি চিহ্নিত করা, সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা এবং ভুক্তভোগী শিশু ও পরিবারের জন্য দ্রুত সহায়তা ও মনস্তাত্ত্বিক পরামর্শের ব্যবস্থা থাকতে হবে। পাশাপাশি জাতীয় হেল্পলাইন আরও শক্তিশালী ও সহজপ্রাপ্য করা জরুরি।
৫. মিডিয়া ও নৈতিক প্রতিবেদনের নীতি
শিশু নির্যাতন বা যৌন সহিংসতার ঘটনা প্রকাশের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমকে সর্বোচ্চ সংবেদনশীলতা ও নৈতিকতা বজায় রাখতে হবে। কোনো অবস্থাতেই ভুক্তভোগীর পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না এবং উত্তেজনামূলক শিরোনাম পরিহার করতে হবে। একই সঙ্গে ভিকটিম ব্লেমিং সংস্কৃতি কমাতে দায়িত্বশীল ও তথ্যভিত্তিক সাংবাদিকতা জরুরি। পাশাপাশি নৈতিক মূল্যবোধহীন বা বিকৃত মানসিকতা তৈরি করতে পারে এমন কন্টেন্ট সম্পর্কে সমাজকে সচেতন হতে হবে। শুধু শিশুদের মোবাইল বা ডিজিটাল স্ক্রিন থেকে দূরে রাখলেই সমস্যার সমাধান হবে না; বরং তাদের জন্য সুস্থ বিনোদন, মানবিক মূল্যবোধ ও ইতিবাচক শিক্ষা দেয় এমন কন্টেন্টের দিকে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে হবে।
৬. স্কুলে আত্মরক্ষা ও সচেতনতা পাঠক্রম
বিদ্যালয়ে নিয়মিত আত্মরক্ষা ও সচেতনতাভিত্তিক পাঠ্যক্রম চালু করা জরুরি। এর মাধ্যমে শিশুদের ব্যক্তিগত সীমানা, ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ চেনা এবং বিপদের সময় কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে তা শেখানো যায়। পাশাপাশি শিশুদের মধ্যে নির্ভয়ে কথা বলার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা কোনো অনাকাঙিক্ষত ঘটনার শিকার হলে দ্রুত শিক্ষক, অভিভাবক বা বিশ্বস্ত কারও কাছে জানাতে পারে।
শুধু শাস্তি দিয়ে সমস্যা দমন করলে স্থায়ী পরিবর্তন আসবে না। শিক্ষা, সচেতনতা ও সম্মানভিত্তিক সাংস্কৃতিক রূপান্তরের মাধ্যমে একটি নিরাপদ সমাজ গড়ে উঠতে পারে।
নৈতিক শিক্ষাকে পরিবারের পরিসরে ফিরিয়ে আনতে হবে, যৌনশিক্ষাকে ট্যাবুমুক্তভাবে শিশুদের স্বাভাবিক শিক্ষার অংশ করতে হবে এবং পরিচিতদের দ্বারা সংঘটিত অপরাধ প্রতিরোধে সমাজ ও আইনি ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। এসব উদ্যোগ একসঙ্গে কার্যকর হলে আগামী প্রজন্মকে সহিংসতার হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে এবং এটাই আমাদের সবার নৈতিক দায়বদ্ধতা।












