মি. আনাস, মি. মেহেদী আর মি. স্কট এসেছেন এক ঝাঁক নারী সাংবাদিকদের সাথে অভিজ্ঞতা বিনিময় করবেন এবং আসন্ন নির্বাচনে নারী সাংবাদিকরা কিভাবে নিজেদের নিরাপদ রাখবেন এবং সঠিক তথ্য তুলে আনবেন এই বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে। আমাদের এই নগর চট্টগ্রাম। বরাবরই অবহেলিত রাজধানী ঢাকা থেকে। আর সাংবাদিকদের আন্তর্জাতিক অঙ্গনের সাথে সম্পৃক্ততা, সে তো অধরা মাধুরী! অন্যদিকে চট্টগ্রামে নারী সাংবাদিক সংস্কৃতি এখনো অনেক অনেক পিছিয়ে। বিগত চার দশক আগে আমি যখন দৈনিক পূর্বকোণে ১৯৮৬ সালে সাংবাদিকতা শুরু করেছি, তখন নারী সাংবাদিকদের মাঠটি ছিল একদম খালি। তো এই খালি মাঠে গোল দিতে গিয়ে একদিকে যেমন পেয়েছি অসীম আনন্দ, একইভাবে বঞ্চিতও হয়েছিলাম নানাভাবে। এরপর মেঘেরোদে কেটে গেলো বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ। নারী সাংবাদিকরা আসেন না। আসতে চাইলেও কাজের ক্ষেত্র নেই। এই মেঘ ধীরে ধীরে কেটেছে ইলেকট্রনিক মিডিয়া আসার পর থেকেই। এখন সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে অনলাইন সাংবাদিকতার যেনো গণ জোয়ার। ফলে নারীরা কতজন কত জায়গায় কাজ করছে, তার হিসাব নেই। তবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ চালুর পর থেকে আমরা একাডেমিক শিক্ষায় শিক্ষিত নারী সাংবাদিক পেতে শুরু করেছি। যাই হোক শিক্ষা আর নিষ্ঠার সমীকরণ, নানান প্রতিকূলতা আর সীমাবদ্ধতার মাঝেও এখন নারী সাংবাদিক পাচ্ছি। ফলে পাহাড়ের চূড়া থেকে নেমে সমতট পেরিয়ে সাগরের উপকূল হয়ে বিশাল বালুচরেও বিচরণ করছে নারী সাংবাদিকরা। আর এই চিত্রকে দৃশ্যমান করে তুললো জাতিসংঘের ইউএন ব্যালট প্রকল্প আর সমষ্টি। তারা বৃহত্তর চট্টগ্রামের ৫০ জন নারী সাংবাদিককে একই ছাদের নীচে নিয়ে এসে রচনা করলেন পারস্পরিক এক সেতুবন্ধন। আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে তারা নারী সাংবাদিকদের জন্য তিন দিনব্যাপী এক আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণের আয়োজন করেন। বিষয় ছিল আসন্ন নির্বাচনে নারী সাংবাদিকরা নিজেদের সুরক্ষিত রেখে কিভাবে সঠিক তথ্য পরিবেশন করবেন। মূল বিষয় সেটি হলেও এই বিষয়ের সাথে জড়িত বহুমাত্রিক বিষয় আলোচনায় আসে। আধুনিক সাংবাদিকতার রীতিনীতি, পদ্ধতি, প্রযুক্তিগত নানাবিধ বিষয়, প্রতিটি বিষয়ের আইন এবং আন্তর্জাতিক বিধান এই প্রশিক্ষণে প্রাধান্য পায়। নির্বাচন প্রেক্ষাপটে মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, বিভ্রান্তিকর তথ্য ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকি ও সম্ভাবনা, তথ্য যাচাই কৌশল, নির্বাচন ও রাজনৈতিক রিপোর্টিং–এর আইনগত কারণ ও কাঠামো এবং নারী সাংবাদিকদের শারীরিক, অনলাইন ও মানসিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করা হয়। প্রশিক্ষণে মত প্রকাশের স্বাধীনতা, তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশিক্ষণ পরিচালনা করেন ইউনেস্কোর কর্মকর্তা মেহেদী বেঞ্চেলাহ। ডিজিটাল মিডিয়া, বিভ্রান্তিকর তথ্য ও আইন সংক্রান্ত অধিবেশন পরিচালনা করেন আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষক আনাজ বেনদ্রিফ। সাংবাদিকদের শারীরিক ও ডিজিটাল নিরাপত্তা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করেন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ স্কট হোয়ার। বিদেশি বিশেষজ্ঞ ছাড়াও তিন দিনব্যাপী এই প্রশিক্ষণে ঢাকার সিনিয়র সাংবাদিকরা বিভিন্ন সেশন পরিচালনা করেন। লক্ষনীয় বিষয় হলো জানা এবং শেখার সেকি অসীম আগ্রহ প্রতিটি নারী সাংবাদিকদের। এত এত চমৎকার বিষয় আলোচিত হচ্ছিল অত্যন্ত প্রাণবন্ত এবং সাবলীলভাবেই প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন উনারা। কিন্তু অভিজ্ঞতা শেয়ারের সুযোগ অবারিত করেন নারী সাংবাদিকদের জন্য। ফলে যার যার কাহিনি প্রায় সাংবাদিকই অত্যন্ত চমৎকারভাবেই বর্ণনা করেছিলেন। যাতে ক্লাসরুম হয়ে না যায়, সে জন্য গান, নাচ, কৌতুক সবকিছুই ছিল তিন দিনের আয়োজনে। লামার পাহাড় থেকে নারী সাংবাদিক যেভাবে এসেছেন, একইভাবে নোয়াখালী, ফেনী থেকেও নারীরা এসেছেন। ঠিক একইভাবে নগরের নারী সাংবাদিকদের সাথে এসে মফস্বলের নারী সাংবাদিকরা যুক্ত হয়ে রচনা করেছেন এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন। বেশীরভাগই বয়সে নবীন, অভিজ্ঞতায় তো আরো ঘাটতি। এরপরেও ছিল সরস আর প্রাণবন্ত। আমার মতো ৪০ বছর আগেই সাংবাদিকতায় প্রবেশকারী নারী এদের সাথে যুক্ত হয়েছি! এ যেনো আমার এক অন্যরকম প্রাপ্তি, তাদের কাছেও মনে হলো পরিচয়ে, আচারে ব্যবহারে শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার ডালি যেনো তারা মেলে ধরেছিল। আমি লক্ষ্য করেছি, প্রত্যেকেরই মনোযোগ অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্ত। ভিনদেশী প্রশিক্ষকরা দারুণ আর সাবলীল আলোচনায় প্রতিটি বিষয়কে চেতনায় আর মননে যেনো গেথে দিয়েছিলেন। তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহারে পেয়েছি নতুন নতুন ধারণা আর আইডিয়া। প্রতিটি বিষয় কিন্তু সরস আলোচনায় বোধগম্য হয়ে উঠে। ধন্যবাদ এই প্রজেক্টের কো–অর্ডিনেটর মাসুমা আপাকে। ধন্যবাদ সমষ্টির মুনাব্বির ভাইকে। আমি অনেক প্রশিক্ষণ নিয়েছি. এখন আমার প্রশিক্ষণ দেয়ার সময়। কিন্তু নারী সাংবাদিকতায় এই অঞ্চলের প্রথম দিকের হওয়ায় আয়োজকদের কাছে আমি অতি প্রত্যাশিত। ঢাকার আয়োজকরা তো বটেই, বিদেশিরাও এত আন্তরিক ও ইতিবাচক হিসেবে নিয়েছে, সেটিই পরমানন্দের। সাধুবাদ আয়োজকদের। অবারিত ভালোবাসা অংশগ্রহণকারীদের জন্য।












